দুদকের গণশুনানি

রাজউকের বিরুদ্ধে নগরবাসীর যত অভিযোগ

ওমর ফারুক
২৭ জানুয়ারি ২০১৬, ২১:৪৭আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০১৬, ০০:০১

দুদকের গণশুনানি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—রাজউকের বিরুদ্ধে নগরবাসীর অভিযোগের অন্ত নেই। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ সেবাপ্রার্থীদের। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—প্লটের দখল বুঝে না পাওয়া, এক জনের প্লট আরেক জনকে দিয়ে দেওয়া, আবেদন করলেও অবৈধ নির্মাণ কাজ বন্ধ না হওয়া। পাশপাশি অন্যের জমিতে ভবন নির্মাণের নকশার অনুমোদন দেওয়ার মতো অভিযোগ নিয়ে সেবাপ্রার্থীরা যুগের পর যুগ পার হওয়ার পরও নিষ্পত্তি না হওয়ার মতো বিষয়ও রয়েছে। এতদিন এই অভিযোগগুলো বিচ্ছিন্নভাবে উত্থাপিত হলেও এবার আনুষ্ঠানিকভাবে তোলা হলো দুর্নীতি দমন কমিশন আয়োজিত গণশুনানিতে। বুধবার ওসমানী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে রাজউকের কর্মকর্তাদের সামনেই অভিযোগগুলো তুলে ধরেন রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা সেবাপ্রার্থীরা।
গণশুনানিতে দেখা গেছে, অনেকেই এত দিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ প্রকাশ করেছে রাজউকের বিরুদ্ধে। এ সময়  কাঠগড়ায় থাকা রাজউক কর্মকর্তারা এসব শোনেন। একইসঙ্গে কী ধরনের সমস্যা কত দিনে সমাধান করা হবে, সে বিষয়ে অঙ্গীকারও করেন।
এভাবে প্রায় তিন ঘণ্টায় অভিযোগ উত্থাপন করেন ত্রিশজন সেবাপ্রার্থী। আরও অনেকে অভিযোগ জানাতে না পেরে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ফলে দুদক কমিশনার আগামী মে মাসে আবারও গণশুনানির আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দেন।
জাপানি সাহায্য সংস্থা জাইকার সহযোগিতায় বুধবার সকালে রাজধানীর ওসমান স্মৃতি মিলনায়তনে গণশুনানির আয়োজন করে দুদক। শুনানির সুবিধার্থে মিলনায়তন মঞ্চে অভিযোগকারী ও রাজউক কর্মকর্তাদের মুখোমুখী বসানো হয়। সঞ্চালক হিসেবে মাঝখানে থাকেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আকতার হোসেন ভূইয়া। দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার, রাজউক চেয়ারম্যান এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতনরা বসেন দর্শক সারিতে।
গণশুনানিতে প্রথমেই অভিযোগ উত্থাপন করেন সরকারের অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রশিদ। তিনি বলেন, ১৯৯৮ সালে আমি উত্তরা তৃতীয় পর্বে প্লটের জন্য দরখাস্ত করি। আমার রশিদ নম্বর-১৭৩৩। ২০০৩ সালে আমি একটা প্লট বরাদ্দ পাই। এ জন্য টাকাও জমা দিয়েছি। কিন্তু প্লট আমাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। প্লট বুঝে পেতে রাজউকে গিয়ে আমাকে এক জনের পর এক জনের কাছে ধর্ণা দিতে হচ্ছে। কারও নাম উল্লেখ না করে তিনি তার কাছ থেকে ঘুষ দাবি করার অভিযোগও করেন।
সঞ্চালক এ বিষয়ে রাজউকের বক্তব্য জানতে চাইলে সদস্য এস্টেট মো. আবদুল হাই বলেন, যতটা বুঝতে পারছি, উনার প্লট এখনও উন্নয়ন হয়নি। আমরা কথা দিচ্ছি, আগামী ছয় মাসের মধ্যে প্লটটি রেডি করে তাকে দখল বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

দ্বিতীয় অভিযোগকারী প্রবাসী ডা. রেজাউল ইসলাম বলেন, ২০১৪ সালে দেশে এসে দেখতে পাই উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৭ নম্বর সড়কের ৪৩ নম্বর প্লটের মালিক আমার ৪১ নম্বর প্লটি দখল করে ভবন নির্মাণ করেছেন। অথচ এই প্লটের নম্বরে আমি লিজ ডিড করেছি, নামজারিও হয়েছে। এ ব্যাপারে রাজউকের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলি। তারা এটা স্বীকার করলেও আমার প্লট আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে না। এবার এক মাসের ছুটি নিয়ে দেশে এসেছি প্লটটি উদ্ধার করার জন্য।

সঞ্চালকের আহ্বানে রাজউকের উত্তরা এলাকার উপ-পরিচালক (এস্টেট) বলেন, ১৭ নম্বর সেক্টরের ওই এলাকাটির লে-আউট প্ল্যান সংশোধন করায় একটা প্লট কমেছে। ডা. রেজাউলের প্লটের নম্বর ছিল ৪১ নম্বরে। তার যাওয়ার কথা ছিল ৪৩ নম্বরে। কিন্তু অন্যরা বদল করায় তার প্লট চলে গেছে। এ অবস্থায় নতুন প্লট সৃজন করে তাকে দেওয়া হবে।

ডা. রেজাউল ইসলাম বলেন, লে-আউট সংশোধন হওয়ায় ৪৩ নম্বর প্লটের মালিক যদি ৪৩ নম্বরেই বাড়ি করেন, তাহলে আমি কেন আমার ৪১ নম্বর প্লটটি পেলাম না? এ সময় দর্শক সারি থেকে রাজউকের বিরুদ্ধে বিদ্রূপাত্মক ধ্বনি ওঠে। রাজউকের সদস্য এস্টেট আবদুল হাই বলেন, বিষয়টা সম্প্রতি আমার নজরে এসেছে। আজ কথা দিতে পারি আগামী দুই মাসের মধ্যে আপনার সমস্যার সমাধান করা হবে।

শাজাহানপুরের শহীদবাগের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রশীদ বলেন, ৭০৬ শহীদবাগে আমার পৈতৃক সম্পত্তিতে আরেকজন ভবন নির্মাণ করছে। ২০০১ সালে আমি মামলা করি। এই মামলা চলাকালে ২০১১ সালে রাজউক সেখানে ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে। বিষয়টা রাজউককে জানাই। বলা হলো, ভবনটি ভেঙে দেওয়া হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। জবাবে রাজউকের সদস্য-উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ আসমাউল হোসেন বলেন, আপনি কাগজপত্র নিয়ে আসুন। আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তওহিদা ফারুকি অভিযোগ করেন, আদাবর এলাকায় তার ৩৯ শতাংশ জমিতে রাজউক ভবন নির্মাণের ছাড়পত্র দিচ্ছে না। এ জন্য ড্যাপের কারণ দেখানো হচ্ছে। জবাবে রাজউকের টাউন প্লানার সিরাজুল ইসলাম বলেন, ড্যাপ বিষয়ে আমাদের একটা কমিটি রয়েছে। আমি দরখাস্ত দিন। আপনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

এভাবে প্রায় তিন ঘণ্টা চলে দুদকে প্রাণবন্ত এই গণশুনানি। এরই এক পর্যায়ে সঞ্চালক অনুষ্ঠান সমাপ্তির ঘোষণা দেন। তখন আরও অর্ধশতাধিক সেবাপ্রার্থী অপেক্ষায় ছিলেন তাদের অভিযোগ জানানোর। সঞ্চালকের ঘোষণায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। সঞ্চালক এ ধরনের আরেকটি গণশুনানির সুপারিশ করে দুদক কর্মকর্তাদের কাছে।

দুদক কমিশনার মো. নাসিরউদ্দিন আহমেদ বলেন, দুর্নীতি কমানোর উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা এই গণশুনানির আয়োজন করেছি। আশা করি, সেবাপ্রার্থীরা এতে উপকার পাবেন। তিনি বলেন, আগামী মে মাসে রাজউক ভবনে এ ধরনের আরেকটি গণশুনানির আয়োজন করা হবে। এ ছাড়া আজ রাজউক কর্মকর্তারা যে অঙ্গীকার করলেন, সেগুলো সময় মতো বাস্তবায়ন হয় কি না—সেটা আমরা মনিটরিং করব। আপনাদের আরও যাদের অভিযোগ রয়েছে সেগুলো আমাদের লিখিতভাবে জানান, সমস্যা সমাধানে আমরা রাজউককে সুপারিশ করব। তিনি বলেন, গণশুনানির মাধ্যমে আমরা সরকরি অফিসগুলোর ইমেজ বিল্ড-আপের চেষ্টা করছি।

/এমএনএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম