বাংলাদেশে সোনার ব্যবসা এখন জমজমাট। প্রায় প্রতিদিনই দেশে অবৈধ পথে আসছে সোনা। প্রতিদিনই কেজি কেজি সোনা জব্দও হচ্ছে। আবার বিপুল পরিমাণ সোনা পাচারও হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে সোনার কোনও বৈধ আমদানি না থাকা সত্ত্বেও আট হাজার স্বর্ণের দোকানদার ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত অবৈধ উপায়ে আসা প্রায় চার হাজার ৪৮৭ কেজি বা ১১২ মণেরও বেশি সোনা জব্দ করা হয়েছে। শুল্ক বিভাগ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে ৭৬ মণ সোনা আটক করেছে সরকারের শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এর মধ্যে একদিনে ৩ মণের বেশি সোনা আটক করা হয়েছিল ২০১৩ সালে। ওই বছরের ২৩ জুলাই নেপাল থেকে আসা একটি বিমান থেকে ১২৪ কেজি ২১৬ গ্রাম সোনা আটক করা হয়। এর বাইরে ২০১৫ সালেই জব্দ করা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ মণ সোনা। ২০১৪ সালে জব্দ করা হয় প্রায় ৫ মণ সোনা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চোরাচালানটি ধরা পড়ে ২০১৪ সালের ২৬ এপ্রিল। দুবাই থেকে আসা একটি বিমানের টয়লেট থেকে ১০৬ কেজি সোনা আটক করে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। এই সাত বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে জমা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার কেজি সোনা।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের হিসাবে ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১৪ মাসে আটক সোনার পরিমাণ সর্বমোট ৬০২ কেজি ৮৭৪ গ্রাম বা ১৫ মণ ২ কেজি ৮৭৪ গ্রাম। এর মূল্য ২৭৪ কোটি ২০ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আশির দশকে এ দেশে চোরাচালানের মধ্যমে সোনা আসা শুরু হয়। ১৯৮৫ সালে চোরাচালানের ৯৬ কেজি ৫২৫ গ্রাম সোনা উদ্ধার করা হয়। ১৯৮৬ সালে উদ্ধার হয় ১২০ কেজি ২২৫ গ্রাম সোনা। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯ সালে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার হাতে চোরাচালানের পৌনে ১২ কেজি সোনা ধরা পড়ে। ২০১০ সালে ৯ কেজি, ২০১১ সালে ৪ কেজি, ২০১২ সালে প্রায় ২৪ কেজি। ২০১৩ সালে সাড়ে ৫০০ কেজি সোনা আটক করা হয়েছে। অর্থাৎ ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১৩ সালে ৪৫ গুণ বেশি সোনা ধরা পড়েছে। ২০১০ সালের তুলনায় ৬১ গুণ, ২০১১ সালের তুলনায় ১৩৭ গুণ, ২০১২ সালের তুলনায় ২৩ গুণ বেশি সোনা ধরা পড়ে ২০১৩ সালে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ১৫ কেজি সোনা আদালতের নির্দেশে শুল্ক পরিশোধ সাপেক্ষে মালিক দাবিদারদের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে। আর কিছু বিক্রি করা হয়েছে নিলামের মাধ্যমে। ওজন করা হয়নি এমন ১ হাজার ৬৯৩টি সোনার বার ও ৬৮টি চেইন উধাও হয়ে গেছে, যা জমা দেওয়া হয়নি বাংলাদেশ ব্যাংকে।
বাংলাদেশ সোনা চোরাচালানের রুটে পরিণত হচ্ছে কিনা- তা খতিয়ে দেখতে শুল্ক গোয়েন্দাদের পরামর্শ দিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেছেন, বিমান বন্দরগুলোতে সোনার যেসব চোরাচালান ধরা পড়ছে তাতে কোনও কৃতিত্ব না দেখে বরং চোরাচালান বেড়ে যাওয়ার কারণ খুঁজে বের করতে হবে।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাবেক মন্ত্রী এ আহ্বান জানান। রাজধানীর বেইলি রোডে অফিসার্স ক্লাবে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘প্রায়ই সোনার চালান ধরা পড়ছে। ৬০০ কেজি ধরেছেন-এটা ফলাও করে বলা হচ্ছে। আমি মনে করি এতে কোনও কৃতিত্ব নেই।
কারও ৬০০ কেজি ধরা পড়ছে, কারও ছয় হাজার কেজিধরা পড়ছে না- উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা কি সোনা চোরাচালানের রুটে পরিণত হয়েছি? এই সোনার চোরাচালান ধরা পড়ায় জাতির গায়ে কালিমা লেপন হচ্ছে; এটা বন্ধ করতে হবে।’
সর্বশেষ ২০১৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিনেছে ২৪৩ কেজি বা ছয় মণের সামান্য বেশি স্বর্ণ। এর আগে ওই বছরের ২৯ জুন কেনা হয়েছিল ২৫ কেজি স্বর্ণ। রিজার্ভে নেওয়া সোনার বারের বাইরে এখন প্রায় ৩০ মণ সোনা বাংলাদেশ ব্যাংকের অস্থায়ী খাতে জমা আছে। আদালতে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় এই পরিমাণ সোনার মালিক কে হবে, তা নির্ধারিত হয়নি। আর ৮৩৯ কেজি বা প্রায় ২১ মণ সোনা বিভিন্ন সময়ে নিলামে বিক্রি করা হয়েছে। তবে আটক স্বর্ণালঙ্কারের মধ্যে এ পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হয়েছে ২৫২ কেজি বা সাত মণ ১৫ কেজি। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের স্থায়ী খাতে ১২ কেজি ও অস্থায়ী খাতে ২২ কেজি জমা আছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সোনার কাস্টডিয়ান হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশ ব্যাংকে কেবলমাত্র সোনা জমা রাখা হয়। মামলা নিষ্পত্তির পর আদালত নির্দেশ দিলে যে কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সোনা জমা রেখে যায়, সেই কর্তৃপক্ষকে ফেরত দেওয়া হয়। আর আদালত বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিলে রিজার্ভে যোগ করে বাজারে টাকা ছাড়া হয়। গত ৬ বছরেও সোনার কোনও নিলাম হয়নি বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে সোনা পাচার কেন্দ্রিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। সিন্ডিকেটের সঙ্গে বাংলাদেশের কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গোয়েন্দা সংস্থার কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত আটক করা সোনার মধ্যে প্রায় ১০০ মণ হলো বার। বাকি ১২ মণ স্বর্ণালঙ্কার। এসব বারের মধ্যে দুই হাজার ১১২ কেজি বা প্রায় ৫৩ মণ সোনা কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিনে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নিয়েছে।
এদিকে, সোনা পাচার সংক্রান্ত মামলা সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৯৯৫ দশমিক ৭৮ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়। এর বাইরে ওজন করা হয়নি এমন ১ হাজার ৬৯৩টি সোনার বার ও ৬৮টি সোনার চেইন উদ্ধার করা হয়। এই পরিমাণ সোনা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা নেই।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০০৩ সালে ঢাকা মহানগরীতে উদ্ধার হওয়া ৮৫টি সোনার বার ও ২০ কেজি ৯ গ্রাম ৫২০ তোলা সোনার মধ্যে মালিকের জিম্মায় ৮৫টি সোনার বার আদালতের নির্দেশে দেওয়া হয়। একইভাবে ২০১২ সালে চট্টগ্রাম রেঞ্জে উদ্ধার হওয়া ১৫ ভরি ৮ আনা ২ দশমিক ৫০ রতি সোনা মালিকের জিম্মায় জমা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে ১০ গ্রাম সোনা আমদানির জন্য ১৫০ টাকা আর সমপরিমাণ সোনার জন্য ভারতে ৪ হাজার ২০০ টাকা শুল্ক গুনতে হয়। বিমানবন্দরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কাস্টমস কর্মকর্তা জানান, ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশকে সোনা চোরাচালানের জন্য নিরাপদ মনে করেন। কারণ বাংলাদেশের বিমানবন্দরে সোনার চালান আটক করলে আসামির বিরুদ্ধে শুধু কাস্টমস বিভাগ ব্যবস্থা নেয়। অপর দিকে ভারতে অবৈধভাবে সোনা প্রবেশ করলে ওই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে বিমানবন্দর কাস্টমস বিভাগের পাশাপাশি সিবিআই (সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন), দুর্নীতি দমন কমিশন ও আয়কর বিভাগ একযোগে ব্যবস্থা নেয়। শুধু সোনার চালান নয়, ব্যবসায়ীদের সব সম্পদ জব্দ করে নেওয়ার দৃষ্টান্তও রয়েছে ভারতে।
শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে সোনা পাচার কেন্দ্রিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। সিন্ডিকেটের সঙ্গে বাংলাদেশের কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গোয়েন্দা সংস্থার কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে। সিভিল অ্যাভিয়েশনের নিরাপত্তা বিভাগ, কাস্টমস ও বাংলাদেশ বিমানের শতাধিক কর্মী টাকার বিনিময়ে পাচারকারীদের সহায়তা করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, বিমানবন্দর দিয়ে প্রবেশ করে অধিকাংশ সোনা হিলি, বেনাপোল, আখাউড়া ও সোনা মসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে পাচার হয়ে যায়। বাংলাদেশ দিয়ে সোনা চোরাচালান বেড়ে যাওয়ার জন্য তিনটি কারণ খুঁজে পেয়েছেন দেশের শুল্ক গোয়েন্দারা। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত আড়াই বছরে প্রায় ২৮ মণ সোনা শুল্ক বিভাগ আটক করেছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশ থেকে চোরাচালান হয়ে বাংলাদেশে এসে এই সোনা আবার ভারতে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের জন্যও সোনার লেনদেন হতে পারে। পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে ব্যাংকের যে কোনও সন্দেহজনক লেনদেন ঝুঁকিপূর্ণ। এ জন্য সন্ত্রাসীরা লেনদেনের ক্ষেত্রে অর্থের পরিবর্তে সোনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে বেশি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দিলদার আহমেদ সেলিম বলেন, সোনা আমদানিতে ভারত সরকার কড়াকড়ি আরোপ করায় ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ দিয়ে অবৈধভাবে সোনা তাদের দেশে নিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে যত সোনা ধরা পড়ছে তার অধিকাংশই ভারতে পাচারের জন্য। তারা বাংলাদেশকে রুট হিসেবে ব্যবহার করছে মাত্র।
৭ বছরে রিজার্ভ ১০ মণ
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, গত ৭ বছরে প্রায় ৩ হাজার কেজি বা ৭৬ মণ সোনা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ মণ চোরাই স্বর্ণ রিজার্ভে যোগ হয়েছে। বাকি সোনা ব্যাংকের ভল্টে অস্থায়ী খাতে জমা আছে।
এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্থায়ী খাতে ১০ মণের মতো সোনা রয়েছে। বাকি সব সোনা রয়েছে অস্থায়ী খাতে। শুল্ক বিভাগ সম্প্রতি ৫০ কেজি সোনা জমা দিয়ে গেছে। আরও প্রায় ৬০ কেজি সোনা জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। রবি-সোমবারের মধ্যে এই সোনাগুলো জমা হবে।’
তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশনায় সরকারের বিভিন্ন দফতর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রেখে যায়। আবার আদালতের রায় অনুযায়ী, স্থায়ী খাতে অথবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সোনা ফেরত দেওয়া হয়।
/এসটি/








