গত বছর জুনের প্রথম সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন ঢাকা সফর করেছিলেন, তখন দুই দেশের পক্ষ থেকে ঘোষিত যৌথ বিবৃতিটির নামকরণ করা হয়েছিল ‘নতুন প্রজন্ম –নঈ দিশা’। বিবৃতির নামে প্রথম অংশটা ছিল বাংলায়, পরেরটা হিন্দিতে। মোট পঁয়ষট্টিটা পয়েন্ট ধরে সেই ঐতিহাসিক বিবৃতিতে ধাপে ধাপে বর্ণনা করা হয়েছিল—ঢাকা-দিল্লি কিভাবে সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে কিভাবে এগোবে।
সেই সফরের ঠিক সাত মাসের মাথায় এদিন দিল্লিতে পৌঁছেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক। সোমবার তিনি ভারতের পররাষ্ট্রসচিব এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন, আলোচনা করবেন ‘নতুন প্রজন্ম–নঈ দিশা’র বাস্তবায়নে ঠিক কতটা অগ্রগতি হলো। দিল্লিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের এক উচ্চপদস্থ সূত্রের কথায়, ‘এটা হবে ওই রোডম্যাপেরই একটা রিভিউ মিটিং!’
দিল্লিতে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নবনির্মিত জহরলাল নেহরু ভবনে সোমবার সন্ধ্যায় দুই সচিবের বৈঠক নির্ধারিত আছে, তারপর সেখানেই তার বাংলাদেশি কাউন্টারপার্টকে নৈশভোজে আপ্যায়িত করবেন মি. জয়শঙ্কর। এর আগে সকালে ভারতের জলসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব শশী শেখরের সঙ্গেও বৈঠকে বসবেন শহীদুল হক, সফরে তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ হবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালেরও।
কিন্তু দুই সচিবের আলোচনার যেটা মূল প্রতিপাদ্য, সেই ‘নতুন প্রজন্ম-নঈ দিশা’ এখন ঠিক কোন অবস্থায়? যৌথ অঙ্গীকারের সেই সনদ কি ঠিকঠাক বাস্তবায়ন হচ্ছে, না কি তা কয়েক মাসের মধ্যেই পথ হারিয়ে দিশাহীন? বাংলা ট্রিবিউন ওই বিবৃতির কয়েকটি মূল পয়েন্ট ধরে দেখার চেষ্টা করেছে— দুই প্রধানমন্ত্রীর মুখের কথায় আর বাস্তবে ঠিক কতটা মিল!
১) তিস্তা : বিবৃতিতে বলা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী হাসিনা নরেন্দ্র মোদিকে অনুরোধ করেছেন, তিস্তার পানি ভাগাভাগি নিয়ে দুদেশের মধ্যে যে অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা আছে অবিলম্বে তা যৌক্তিক পরিণতিতে এগিয়ে নিতে (অর্থাৎ চুক্তি করতে)। জবাবে মোদি জানান ভারতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ঐকমত্যে পৌঁছনোর চেষ্টা চলছে।
সেই বক্তব্যের সাত মাসের মাথায়ও ওই আলোচনা এখনও চলছে। এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল নেত্রী তিস্তা চুক্তি নিয়ে এখনও সম্মতি জানাননি। সে রাজ্যে ভোট হবে মাত্র আড়াই তিন মাসের মধ্যেই—আর সেই ভোটের আগে তিস্তা নিয়ে অগ্রগতির কোনও সম্ভাবনাও নেই। তবে মমতা আবার জিতে ক্ষমতায় আসলে তিস্তা নিয়ে জটিলতার অবসান হতে পারে, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সে ব্যাপারে খুবই আশাবাদী। শহীদুল হককেও জানানো হবে সেটাই।
২) সীমান্ত হত্যা: আবার ‘নতুন প্রজন্ম- নঈ দিশা’ উদ্ধৃত করেই বলা যায় সীমান্তে ‘প্রাণহানির সংখ্যা যেন শূন্যে নামিয়ে আনা যায়’ সে জন্য দুই প্রধানমন্ত্রীই তাদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রায় প্রতি সপ্তাহেই সীমান্তের এখানে-ওখানে বিএসএফের হাতে বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। যদিও প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিএসএফ দাবি করেছে, নিহতরা ছিলেন গরু বা মাদকের চোরাকারবারি।
এর প্রতিকারেও কিন্তু ভারত কিন্তু জোর দিচ্ছে কোঅর্ডিনেটেড বর্ডার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান বা যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ওপরেই। অর্থাৎ বিএসএফ ও বিজিবি একসঙ্গে বা নিজেদের মধ্যে সমন্বয় রেখে সীমান্তে টহল দিলে চোরাকারবারিদের ঠেকানো সম্ভব। তাতে মৃত্যুও এড়ানো যায় বলে ভারতের বক্তব্য। সোজা কথায়, প্রাণহানি এড়ানোর দায় তারা কিছুটা বিজিবির দিকেও ঠেলে দিচ্ছেন। তারা যদি বাংলাদেশি নাগরিকদের অবৈধভাবে সীমান্তে আসা ঠেকাতে পারেন, তাহলে গুলি চালানোরও দরকারও হয় না বলে ভারত বলছে। ‘একান্ত আত্মরক্ষার প্রয়োজন ছাড়া বিএসএফ গুলি চালায় না’—এই বক্তব্যেও অটল থাকছে দিল্লি।
৩) যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক: দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের ৩৮তম বৈঠকটি এবার হওয়ার কথা ঢাকায়। বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, খুব তাড়াতাড়ি বৈঠকের দিনক্ষণ স্থির করে ফেলা হবে। এর মাঝে বাংলাদেশের পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ দিল্লির সফরকালে তার কাউন্টারপার্ট উমা ভারতীকে বৈঠকে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণও জানিয়েছেন। সেই আমন্ত্রণ গৃহীতও হয়েছে। কিন্তু বৈঠকের তারিখ আজও স্থির করে ওঠা যায়নি। কেন যে যাচ্ছে না, সেটা এখনও একটা রহস্য!
৪) বিদ্যুৎ সহযোগিতা: বিদ্যুৎ খাতে যে দুদেশের মধ্যে জোরদার সহযোগিতা শুরু হয়েছিল, তাতেও যেন ইদানীং একটা স্থবিরতা এসেছে। ত্রিপুরার পালাটানা থেকে বাংলাদেশে যে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসবে বলে বহু আগেই স্থির হয়েছিল, তার দাম নিয়েও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দরকষাকষি চলেছে। রামপালে ভারতের এনটিপিসি-র সহায়তায় নির্মীয়মান তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজও আশানুরূপ গতিতে এগোচ্ছে না। বাংলাদেশের বড়পুকুরিয়া হয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিমে মুজফফরনগর পর্যন্ত ডিসি গ্রিড লাইনের কাজও এখনও বিশ বাঁও জলে।
৫) ইন্দো-বাংলা এনার্জি ডায়ালগ: কথা ছিল ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের সচিব আর বাংলাদেশের বিদ্যুৎ বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে দুদেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে এনার্জি ডায়ালগ। যেখানে কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস, এলএনজি, পুনঃনবায়নযোগ্য শক্তি বা তেল-গ্যাসের পাইপলাইনে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে। এখনও অনুষ্ঠিত হয়নি সেই ডায়ালগ।
৬) কোস্টাল শিপিং: দুদেশের উপকূল ঘেঁষে জাহাজ চলাচল শুরু করার ক্ষেত্রে অবশ্য বড়সড়ো অগ্রগতি হয়েছে ইতোমধ্যেই। নভেম্বরে দুদেশের জাহাজ মন্ত্রণালয়ের সচিবরা দিল্লিতে সই করেছেন এই সংক্রান্ত প্রোটোকল, যার ফলে অচিরেই হয়তো চেন্নাই বা বিশাখাপতনম থেকে পণ্যবাহী জাহাজ পাড়ি দেবে সরাসরি মংলা-চট্টগ্রামে। এমনকি, ভারত থেকে ক্রুজ শিপে চেপে সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপে যাওয়ার স্বপ্নও সত্যি হতে চলল বলে।
৭) রেল ও বাস সংযোগ: বাংলাদেশ প্রস্তাব দিয়েছিল খুলনা থেকে কলকাতা পর্যন্ত চালু করা হোক একটি দ্বিতীয় মৈত্রী এক্সপ্রেস। প্রধানমন্ত্রী মোদির আশ্বাস সত্ত্বেও তা এখনও দিনের আলো দেখেনি। আখাউড়া-আগরতলা রেল সংযোগ তৈরি করে পুরনো একটি রেল সংযোগ পুনরুজ্জীবিত করার স্বপ্ন এখনও সত্যি হয়ে ওঠার বাকি। যদিও আগরতলা-ঢাকা-কলকাতা রুটে বাস চলাচল শুরু হওয়া একটি দারুণ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশের অনুরোধ মেনে খুলনা-কলকাতা ও যশোর-কলকাতা রুটে বাস সার্ভিস কিন্তু এখনও চালু করা যায়নি। এমনকি, কোনও ট্রায়াল রানও হয়নি এই দুটো সম্ভাবনাময় রুটে।
৮) ভারতে বিটিভি: ‘নতুন প্রজন্ম-নঈ দিশা’ বলেছিল ভারতের দূরদর্শন আর বাংলাদেশের বিটিভি শিগগিরই নিজেদের মধ্যে একটি সমঝোতা করবে, যাতে ভারতে প্রসার ভারতীর ডাইরেক্ট টু হোম (ডিটিএইচ) প্ল্যাটফর্মে বিটিভি-ও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এই ব্যবস্থা চালু হলে ভারতের দর্শকরাও অতি সহজে বিটিভির অনুষ্ঠান দেখতে পারবেন (এককালে, বিশেষত আশির দশকে যা ভারতের বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলে খুবই জনপ্রিয় ছিল)। কিন্তু গত সাত মাসে সেই সমঝোতার কাজ মোটেও এগোয়নি।
এভাবেই প্রতিটি সেক্টর ধরে বিচার করলে দেখা যাবে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার ছবিটা কোথাও আশার, কোথাও বা নিরাশার। এই আলো-আঁধারির আবহেই ‘নতুন প্রজন্ম-নঈ দিশা’র ‘প্রোগ্রেস রিপোর্ট’ লেখার দায়িত্ব এখন দুই পররাষ্ট্রসচিবের কাঁধে।
/এমএনএইচ/








