শিরোনামে বিস্ময়! কিন্তু একই সঙ্গে এটা প্রশ্নও যে একজন মা কেন তার নবজাতককে ফেলে দেবেন? কী এমন গভীর লজ্জা বা বিপন্নতা যা এক মাকে তার সদ্যজাত সন্তানকে জানালা দিয়ে ফেলে দিতে বাধ্য করেছে। এর দায় কার?
মায়ের, সমাজের না অন্য কোনও অপরাধীর? রাজধানীর রমনা এলাকায় সোমবার একটি ভবনের সানসেট থেকে এক নবজাতককে উদ্ধারের পর জানা গেছে তার মা-ই তাকে ফেলে দিয়েছেন। তাই বাংলা ট্রিবিউন এর কারণ জানার চেষ্টা করেছে মনোবিশ্লেষক ও অপরাধ বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে।
মা বিউটি আক্তার রমনার বেইলী রোডের ২৬ নম্বর প্রোপার্টিজ ম্যানশনের ছয়তলার একটি ফ্ল্যাটে গৃহকর্মীর কাজ করেন। বাসার বয়স্ক দম্পতির দেখাশোনাই তার কাজ। ওই দম্পতি অসুস্থ। বিউটি আক্তারের সঙ্গে আরও একজন গৃহকর্মী আছেন। আর বিউটি আক্তারের কথা তিনি তার এক আত্মীয়ের (দুলাভাই) ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। যা আগে প্রকাশ করেননি।
সোমবার তার সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার সময় বাসার আরেক গৃহকর্মী তাকে সহায়তা করেন। এসময় গৃহকর্ত্রী বাসায় ছিলেন না। এরপর তারা দু’জনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নবজাতকে ব্যালকনি থেকে ফেলে দেন। কিন্তু দ্বিতীয় তলার সানসেটে আটকা পড়ায় নবজাতকটি মারাত্মক আহতাবস্থায় বেঁচে যায়। পুলিশ নবজাতককে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। মাকেও চিহ্নিত করার পর চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশে বা রাজধানী ঢাকায় এধরনের ঘটনা নতুন নয়। এর আগে ডাস্টবিন থেকেও নবজাতক উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। আর বিশ্লেষকরা এর জন্য মাকে দায়ী না করে আমাদের সমাজের নির্মমতা এবং অসাম্যকে দায়ী করেছেন। তারা বলছেন বিউটি আক্তারকে সামাজিক অসাম্য, দারিদ্রতা এবং বিচারহীনতা মানসিকভাবে চরম বিপন্ন করেছে। তাই সে নিজের সন্তানকে ফেলে দিয়ে বাঁচতে চেষ্টা করেছে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন,‘ তিনি কুমারী মা হয়েছেন তাঁর দুলাভাইয়ের ধর্ষণের শিকার হয়ে। তারপর সন্তান ভূমিষ্ট হয়েছে। আর তিনি দরিদ্র। তার বোনের সংসারের কথা চিন্তা করে দুলাভাইয়ের অপরাধ প্রকাশ করেননি। এক মানসিক পীড়নের মধ্য দিয়ে তার সময় কেটেছে। আর যখন কুমারী মা হলেন, তখন নিজের অস্তিত্বই বিপন্ন ভেবেছেন তিনি। কারণ, আমাদের সামাজিক অবস্থা তাকে কোনওভাবেই গ্রহণ করবে না। বাসার কাজও হারাবেন। থাকা আর খাওয়াও হয়তো জুটবে না। সন্তানের পিতৃপরিচয় কী হবে। এসবকিছু তাঁর ভেতর থেকে মানবিকতা বিদায় করে দেয়- শূন্যতা সৃষ্টি করে। যা তাকে নিজ সন্তানকে ফেলে দেওয়ার পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেয়।’
তাজুল ইসলাম বলেন, ‘তিনি যদি শিক্ষিত হতেন, আর্থিকভাবে সচ্ছল হতেন তাহলে হয়তো এই করুণ ঘটনাটি ঘটতো না। আগেই বিচারের মুখোমুখি হতেন তার দুলাভাই।’
আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞানের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘ এখানে এই নারীর অপরাধ প্রবণতা কাজ করেনি। তাঁর ভেতরে কাজ করেছে এই সমাজে টিকে থাকার চেষ্টা। তার অবস্থান এমনই ছিল যে, সে কোন বিকল্প পথ খুঁজে পায়নি। তার সামনে একটি পথই ছিল। আর তা হল নবজাতককে অস্বীকার করা। নিজের সঙ্গে কোনওভাবে যুক্ত না করা। আর সেটা করতে গিয়েই তিনি তার নবজাতককে ফেলে দিয়েছেন। হয়তো নবজাতকটি মারাও যেতে পারতো। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে কী এমন বিপন্নতা; যা মাকে তার সন্তানের জীবন বিপন্ন করতে বাধ্য করে।’
তারা দু’জনই বলেন,‘এই সংকট উন্নত বিশ্বেও আছে। কিন্তু সেখানে আর্থিক স্বচ্ছলতা, শিক্ষা , সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আইন সংকট উত্তরণে কাজ করছে। নানা প্রতিষ্ঠান এধরনের মা এবং সন্তানের সুরক্ষায় এগিয়ে আসছে। ফলে মা সুরক্ষা পাচ্ছেন। নবজাতককে বোঝা ভাবছেন না। সে বেড়ে উঠছে তার অধিকার নিয়ে।’
ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘এই মা এখন যে মানসিক পীড়ন, কষ্ট আর অপরাধবোধে ভুগছেন তা শুধু তিনিই জানেন। আমাদের উচিৎ হবে এখন তাকে এবং তার সন্তানকে রক্ষা করা। সেটা সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় দু’ভাবেই হতে পারে। আমাদের মানবিক এবং সহানুভূতিশীল হতে হবে।’
অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন,‘ মূল অপরাধী হল তাকে যে ধর্ষণ করেছে সে। তাকে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। আর এই নারী ও তার নবজাতককে দেওয়া প্রয়োজন নতুন জীবনের নিশ্চয়তা।
এইচইউআর/এপিএইচ/টিএন/








