বাংলাদেশে তিনি ‘বোমা মিজান’ নামেই পরিচিত। আর ভারতীয় গোয়েন্দাদের কাছে তার নাম ‘কাওসার’। ময়মনসিংহের ত্রিশালে ২০১৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি পুলিশ ভ্যানে হামলা চালিয়ে জেএমবির জঙ্গিরা তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। জেএমবির এই জঙ্গি মিজান ওরফে জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমা মিজানই বাংলাদেশে বহু নাশকতার হোতা।
বর্ধমানের খাগড়াগড় বিস্ফোরণ মামলায় অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত, জামাতুল মুজাহিদিনের সেই সন্ত্রাসী বোমা মিজান ওরফে কাওসার কলকাতার আশপাশেই ঘাপটি মেরে আছেন বলে নিশ্চিত হয়েছে ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)। গোয়েন্দাদের একাংশের দাবি, তাদের জালে কাওসারের ধরা পড়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। মিজানকে ধরতে গত দু’দিন ধরে কলকাতার পাশের একটি জেলায় চিরুনি অভিযান চালিয়েছে এনআইএ।
পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার খাগড়াগড়ে ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর একটি বিস্ফোরণে দু’জন নিহত হয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে, ওই বিস্ফোরণস্থলটি আসলে জামাতুল মুজাহিদিনের আস্তানা এবং বোমা ও অস্ত্র তৈরির কারখানা। প্রথম দিন থেকে জেএমবির যে ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়, তিনি হলেন কাওসার। ঘটনাস্থল থেকে গ্রেফতার হওয়া জেএমবির দুই নারী সদস্য ও আরেক ব্যক্তি জানায়, কাওসারই মোটরবাইকে করে এসে ওই আস্তানায় তৈরি করা বোমা নিয়ে যেতেন। কী পরিমাণ দেশি গ্রেনেড বানাতে হবে, সেটাও আগেভাগে বলে দিতেন তিনি। এমনকি, জঙ্গি আশ্রয়স্থল হিসেবে খাগড়াগড়ের ওই বাড়িটি নির্বাচনেও কাওসারের ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের সহযোগিতায় পরবর্তী সময়ে এনআইএ জানতে পেরেছে, বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালে পুলিশ ভ্যান থেকে ছিনতাই হওয়া জেএমবির জঙ্গি মিজান ওরফে জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমা মিজানই হচ্ছে এই কাওসার। গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ত্রিশালের সাইনবোর্ড এলাকায় প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে পুলিশ হত্যা করে দুই সহযোগীসহ বোমা ‘বিশেষজ্ঞ’ মিজানকে ছিনিয়ে নিয়েছিল জঙ্গিরা।
খাগড়াগড়ের ঘটনায় ২০ জনের বেশি ধরা পড়লেও বোমা মিজান এখনও পলাতক।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, খাগড়াগড় থেকে ব্যাগে ভরে গ্রেনেড নিয়ে একটি লাল রঙের নম্বর প্লেটহীন মোটরবাইকে করে কাওসার মঙ্গলকোট, বাহাদুরপুর, কুলি, মোড়গ্রাম, ওমরপুর হয়ে লালগোলা পৌঁছাতেন। সেখান থেকে সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশের মাটিতে যেত ওইসব প্রাণঘাতী বিস্ফোরক।
ভারতের এক শীর্ষ গোয়েন্দা অফিসার বলেন, ‘জেএমবি পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে শেকড় গেড়েছে অন্তত ১৭ বছর আগে। তখন তাদের তৎপরতা কম ছিল। ২০০৫ সালের পর কাওসার এসে হাল ধরার পর সংগঠনটি চাঙ্গা হয়। কাওসার হলেন অলরাউন্ডার, আমাদের ক্রিকেট দলের যুবরাজ সিংয়ের মতো। সে জন্যই কাওসারকে হাতে পাওয়া জরুরি।’
গত ডিসেম্বরেই খাগড়াগড় মামলায় চার্জশিট দিয়েছে এনআইএ। তাই বিচার শুরু হওয়ার আগেই গোয়েন্দারা কাওসারকে ধরতে চান। এর প্রথম কারণ, ভারতের মাটি ব্যবহার করে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করতে জেএমবির চক্রান্ত সম্পর্কে তার কাছ থেকেই বিস্তারিত জানা যাবে। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে জেএমবির পুনর্গঠিত হওয়ার চেষ্টা মাঝপথেই বানচাল করে দেওয়া যাবে, এড়ানো যাবে নতুন নাশকতার ঝুঁকিও।
কাওসার ছাড়া আরও চার সন্দেহভাজন বাংলাদেশি নাগরিক ও জেএমবি জঙ্গি তালহা শেখ, হাতকাটা নাসিরুল্লা ওরফে সোহেল শেখ, রফিক ওরফে রফিকুল ইসলাম এবং জাহিদুল ইসলামকে খাগড়াগড় মামলায় খুঁজছে এনআইএ। এই পাঁচ জনের নামেই হুলিয়া জারি করে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়েছে গত সপ্তাহে।
তবে তাদের মধ্যে বোমা মিজান ওরফে কাওসারকে গ্রেফতারে সর্বত্র জাল ছড়িয়েছে গোয়েন্দারা।
/এপিএইচ/এজে/আপ-এআর/








