বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ কর দিয়ে বৈধ করার সুযোগের সমালোচনা করলেন সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। রবিবার (১২ জুন) সংসদে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিষয়টির কঠোর সমালোচনা করেন তারা।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
এ বাজেটের বিশাল ব্যয় মেটানোর জন্য অর্থ সংগ্রহে অর্থমন্ত্রী নতুন একটি পথ খুঁজে বের করেছেন। এতে ১৫ থেকে ৭ শতাংশ কর দিয়ে বিদেশে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি দেশে সরকারের খাতায় বৈধ আয়ের তালিকায় যুক্ত করা যাবে, সেই অর্থ দেশেও আনা যাবে। ওই আয়ের উৎসব জানতে চাওয়া হবে না।
পাচার করা টাকা কর দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রস্তাবের বিরোধিতা করে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান বিদেশে টাকা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
তিনি বলেন, ‘যারা লুটপাট করে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করে বিদেশে পাচার করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। না হলে অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনের কোনও প্রয়োজন ছিল না।’
পীর ফজলুর রহমান বলেন, ‘বিদেশে অর্থপাচারও বেড়েছে। অর্থমন্ত্রী এই করোনাকালীন সময়ে মানুষের জীবন রক্ষার যে বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন, সেখানে একদিকে মানুষকে রক্ষার চেষ্টা করেছেন। অপরদিকে হাজার হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে, সেটা রোধ করতে পারেননি।’
পাচার করা অর্থ কর দিয়ে বাংলাদেশে ফেরত আনার সুযোগের প্রস্তাবের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘যারা অর্থ চুরি করলেন, অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করে দিলেন, তাদের দায়মুক্তির উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এটি সমর্থনযোগ্য নয়। তার (অর্থমন্ত্রী) উচিত ছিল—যারা এই করোনাকালে মানুষের ক্রান্তিকালের সময় অবৈধ টাকা অর্জন করে বিদেশে পাচার করেছে, এই টাকা যাতে পাচার না হয়, সেটা প্রতিরোধ করা বা আটকানো। কিন্তু সেখানে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘মানুষ সন্দেহ করছে, একটা বিশাল গোষ্ঠী অবৈধভাবে টাকা আয় করে বিদেশে পাচার করার জন্য বসে আছেন। এটি বাস্তবায়ন হলে তাদের সেই উদ্দেশ্য সফল হবে। যারা অবৈধভাবে টাকা লুটপাট করে, সেটা বৈধ করার জন্য এটি নিয়ে আসছেন। এটির দায়মুক্তি দিলে মানুষ উৎসাহী হবে অবৈধভাবে টাকা উপার্জনে।’
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘ব্যাংক ডাকাতি করে টাকা বিদেশে নিয়ে গেলে কী হবে? ডাকাতির মামলা হবে না? দুর্নীতি করলে মামলা হবে না? যদি কারও বিরুদ্ধে মামলা চলমান থাকে, এ সময় তিনি যদি টাকা ফিরিয়ে আনেন, তাহলে কি মামলা চলবে না?’
তিনি বলেন, ‘এমন একটি বিধান রাখা উচিত— সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে এই সুযোগটি নেওয়া যাবে না। ভারতেও এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সফলতা আসেনি।’
শামীম হায়দার বলেন, ‘চলতি অর্থবছরে সরকার অনুমোদিত বাজেটের চেয়ে ১১ হাজার কোটি টাকা বেশি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংসদের আগাম অনুমতি নেওয়া হয়নি। সব টাকা যদি সরকারই ঋণ নিয়ে নেয়, তাহলে জনগণ কী নেবে? এ কারণেই অনেক উন্নয়ন হলেও মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়েনি।’
একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এক ডজন শীর্ষ দুর্নীতিবাজকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার দাবি জানান গণফোরামের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান।
তিনি বলেন, এটি করা হলে একদিনে দুর্নীতি ৫০ শতাংশ কমে যাবে। আর যদি দুর্নীতি না কমে তাহলে তিনি সংসদ থেকে ইস্তফা দেবেন।
মোকাব্বির খান বলেন, ‘দুর্নীতিবাজরা সিন্ডিকেট করে ভোজ্যতেলের দাম বাড়িয়ে হাজার কোটি টাকা ডাকাতি করেছে। মানুষের পকেট কেটেছে। ক্লার্ক, ড্রাইভারের মতো ছোট ছোট দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হয়েছে। কিন্তু যারা বড় পদে, হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি করে, তাদের লোম স্পর্শ করার সাহস নেই।’
সরকারি দলের সদস্য শহীদুজ্জামান সরকার বলেন, দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি ‘এক্সপোর্টেড’। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এটি হয়েছে। মানুষের চাহিদা সীমিত না করে সহায়তা বাড়াতে হবে এবং মুদ্রানীতি সহজ করতে হবে।
সরকারি দলের সদস্য প্রাণগোপাল দত্ত বলেন, ‘অর্থ ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করা যায় কিনা দেখা দরকার। সমাজে এটার ইতিবাচক প্রভাব নেই। যারা বিদেশে টাকা পাচার করেছেন, তারা যদি সৎ হতেন, তাহলে টাকা দেশেই রাখতেন। চোর ধর্মের কথা শোনে না, এটা মাথায় রাখা উচিত।’
অন্যদের মধ্যে সরকারি দলের সংসদ সদস্য আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও মহীউদ্দীন খান আলমগীর আলোচনায় অংশ নেন।









