বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী

‘বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়েও আমরা ভালো অবস্থায় যাবো’

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
৩০ আগস্ট ২০২২, ২২:৩৯আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২২, ২৩:০০

বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও প্রতিবেশী ভারতে পাচার হওয়ার আশঙ্কাসহ নানা কারণে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। বিশ্বে যখন উচ্চমূল্যে জ্বালানি তেলের দাম উঠেছিল সেই সময় বৃদ্ধি করলে লিটারপ্রতি ৬০ টাকা বাড়াতে হতো উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বে তেলের দাম আস্তে আস্তে কিছুটা কমার পর দাম সমন্বয় করেছি।

বিরোধী দলের এমপিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সারা বিশ্ব এখন অস্থিরতার মধ্যে আছে। কেবল বাংলাদেশ নয়। এই যুদ্ধের প্রভাব প্রতিটি দেশে ছুঁয়ে গেছে। সিঙ্গাপুরও বলছে তাদের এখন তৈরি হতে হবে। আমরা মনে করি প্রস্তুতিতে আছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের সঙ্গে আছে বলেই সেই প্রস্তুতি আছে। এত ভয় পেলে চলবে আপনাদের? অবশ্য আপনাদের ভয় পাওয়ার কথা। কারণ, আগের সরকার যেভাবে দেশ চালিয়েছে তা সবারই জানা। নার্ভাস হওয়ারই কথা। শেখ হাসিনার হাতে এই বাংলাদেশ নিরাপদ। বৈশ্বিক ঘটনার মধ্যেও আমরা ভালো অবস্থায় যাবো।

মঙ্গলবার (৩০ আগস্ট) জাতীয় সংসদে বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ সাম্প্রতিক সমস্যায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ জাতিকে জানাতে কার্যপ্রণালি বিধির ১৪৭ বিধির আওতায় আনা সাধারণ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। প্রস্তাব উত্থাপন করেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ও দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক।

আলোচনাকালে নসরুল হামিদ জাতীয় পার্টি ও বিএনপির এমপিদের নানা বক্তব্যের জবাব দেন। তিনি জাতীয় পার্টি-বিএনপি সময়কালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সমালোচনা করেন। তিনি কানসাট, ডেমরায় পানি-বিদ্যুৎ আন্দোলন, পানি-বিদ্যুতের কষ্ট, বিদ্যুতের দাবির আন্দোলনে পুলিশের গুলি, মানুষ হত্যা, বিদ্যুতে লুটপাট, তেল সংকট, খাম্বা সিন্ডিকেটসহ ওই সময়কার প্রকাশিত নানা ঘটনার চিত্র তুল ধরেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমার মনে হয় বিরোধী দলের গোল্ডফিশ মেমোরি। সবকিছু তারা ভুলে গেছেন। কীভাবে সরকার চালিয়েছিলেন এবং এখন তারা কোথায় আছেন। ভূতের মুখে রাম নাম। চেষ্টা করেছিলাম কত কম ডাটা নিয়ে আসা যায়। দেখলাম সম্ভব নয়। সেই সময়কার ঘটনার তথ্য দুই ট্রাক হবে।

বিরোধী দলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারা উটপাখির মতো মাথাটা বালুর নিচে দিয়ে রাখতে চান। বিশ্বে কী ঘটনা ঘটছে কিছুই তাদের আসে যায় না। সংসদ সদস্যের কাছে একটু গঠনমূলক পরামর্শ আশা করছিলাম। কিছুই আসলো না। ওই একই ভাঙা রেকর্ড- ক্যাপটিভ পাওয়ার, রেন্টাল পাওয়ার, ক্যাপাসিটি চার্জ। এরমধ্যেই তারা ঘুরপাক খাচ্ছে। এর থেকে বেরুতে পারছেন না।

বিএনপির এমপি হারুনুর রশিদকে উদ্দেশ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, উনারা নিজেরাই বলছেন কোভিড-১৯, বৈশ্বিক অস্থিরতা, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ- যেসব কারণে আজকে এই মূল্যস্ফীতি। কেউ অস্বীকার করছেন না। আপনি কোরআনের আয়াত বললেন- সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢাকা যায় না। আপনারাই তো মিথ্যা কথা বলে যাচ্ছেন। তো মিথ্যাকে দিয়ে মিথ্যা ঢাকবেন কীভাবে? ৪৮ হাজার কোটি টাকা বিপিসি লাভ করেছে। আপনারা কী চান সরকারি সংস্থা দেউলিয়া হয়ে যাক। ৪৮ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৪৫ হাজার কোটি টাকা সরকারকে দেওয়া হয়েছে দেশ পরিচালনা করার জন্য।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, একটি সংস্থা সারা বাংলাদেশের জ্বালানি ইমপোর্ট করে নিয়ে আসে। সরবরাহ করে। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে হঠাৎ করে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ যখন শুরু হলো, ১৭০ ডলার হয়েছিল জ্বালানি তেলের দাম। সংসদ সদস্য বলেছেন, সেই সময় কেন দাম বাড়ানো হলো না? সেই সময় যদি আমরা দাম বাড়াতাম তাহলে পার লিটার ৬০ টাকা করে বাড়াতে হতো। আমরা অপেক্ষায় ছিলাম দামটা একটু কমুক। তখন অ্যাডজাস্টমেন্টে যাবো। দাম আস্তে আস্তে কমে ১৩৯ ডলার যখন হয়েছে, ভারতের থেকে তখনও আমাদের ৪০ টাকা লিটারপ্রতি পার্থক্য ছিল। যার কারণে আশঙ্কা ছিল ভারতে তেল পাচার হয়ে যাওয়ার। সেই কারণে আমাদের একটি ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। বৈশ্বিক অবস্থা, তেলের ঘাটতি, ঊর্ধ্বমুখী তেলের দাম এবং পাচার হওয়ার ঘটনা অনেক কিছু মিলিয়ে এই দাম আমাদের সমন্বয় করতে হয়েছে। আমরা তো দাম বৃদ্ধি করিনি। আমরা সমন্বয় করেছি। আমরা জানি সকলেই কষ্টে আছেন। আমরা এটা বারবার বলেও আসছি সারা পৃথিবীর মানুষ কষ্টে আছে। উদাহরণ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

বিরোধী দলের সদস্যদের উদ্দেশ করে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, আপনারা সারাক্ষণ ফেসবুক, সোশাল মিডিয়ার তথ্য দিয়ে যাবেন- সোশাল মিডিয়া একটু খুলে দেখেন। পরিস্থিতি কী? কী অবস্থা জার্মানির। তাদের ৪০ শতাংশ গ্যাস কার্টেল করতে হবে। তারা বিপদে আছে শিল্প চলবে কীভাবে? শীতকালে বয়স্ক মানুষেরা কীভাবে হিটিং সিস্টেম চালাবে? ইউকে সিদ্ধান্ত নিয়েছে জানুয়ারি থেকে বিদ্যুৎ কাটঅফ করবে। আপনাদের বলতে চাই, এতই যখন ফেসবুক থেকে তথ্য নেন, গুজবে কান দেবেন না। বঙ্গবন্ধুর কন্যার হাতে এই দেশ হবে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ একটি দেশ। আমরা সেই পথেই আছি। প্রধানমন্ত্রী ধীরে ধীরে বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের দেশের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।

বিরোধী দলের এমপিদের উদ্দেশ করে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, রেন্টাল পাওয়ার বলতে কিছু নেই। আমাদের স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছিল। স্বল্প মেয়াদের পরিকল্পনায় ছিল ইমিডিয়েট কয়েক মাসের মধ্যে কীভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র করা যায়। সেজন্য আমরা ভাড়া করে নিয়ে আসছিলাম। ইংরেজিতে সেটাকে বলে রেন্টাল পাওয়ার। একটাও পাওয়ারপ্ল্যান্ট তো এখন রেন্টাল না। একটারও কোনও ক্যাপাসিটি চার্জ নেই। ক্যাপাসিটি চার্জের কথা বললেন? সারা বিশ্বে আপনি কোনও পাওয়ারপ্ল্যান্ট করতে পারবেন না, যদি ক্যাপাসিটি চার্জ না দেন। একটি পাওয়ারপ্ল্যান্ট ১০-২০ বছরের জন্য নেবেন—তার প্রতিদিনে যে অর্থ খরচ হবে তা দেবেন না? আপনি বলবেন আমি যখন ইচ্ছে তখন চালাবো। পৃথিবীর কেউ আপনার কাছে ইনভেস্টমেন্ট করবে? দুই বছরের জন্য ঘর ভাড়া নিয়ে মালিককে যদি বলেন যখন থাকবেন ভাড়া দেবেন আর না থাকলে ভাড়া দেবেন না, কেউ কী ভাড়া দেবে? এটা হাস্যকর কথা। অর্থনীতি সম্পর্কে কোনও ধারণাই আপনাদের নেই।

নসরুল হামিদ বলেন, জাতীয় পার্টির ক্ষমতায় থাকতে বিদ্যুতের সিস্টেম লস ছিল ৪৪ শতাংশ। বিএনপির সময়ে ছিল ২২ শতাংশ। এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, সিস্টেম লস ৭ শতাংশ। বিশ্বের সবচেয়ে স্ট্যান্ডার্ড সিস্টেম লস হচ্ছে ৭.৬ শতাংশ।

তিনি বলেন, ২০০৯ সালে এক কোটি গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ ছিল। এখন সাড়ে চার কোটি গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ। বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে এখন বিদ্যুৎ সংযোগ আছে। ট্রান্সমিশন লাইন না থাকলে এই কানেকশন করলাম কীভাবে? সাড়ে ৫ লাখ কিলোমিটার ট্রান্সমিশন লাইন হয়েছে। আপনারা চোখ বন্ধ করে থাকেন, এজন্য বিদ্যুৎ আছ কী নেই দেখতে পান না। গ্রামে যান চোখ বন্ধ করে। হয়তো সেই পুরনো কথা মনে হয়- খাম্বা আছে। মাথা থেকে ওই জিনিস যায়ইনি।

এর আগে সরকার জ্বালানি কূটনীতিতে মনোযোগী নয় বলে দাবি করে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ও দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ওপেকভুক্ত বড় তেল উৎপাদনকারী কোম্পানি এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের স্থায়ী কোনও চুক্তি করার উদ্যোগ নেই। প্রাথমিক জ্বালানির উৎস এবং সরবরাহ নিশ্চিত না করেই বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে।

প্রস্তাবের বিষয়ে মুজিবুল হক বলেন, কোভিড-১৯, বৈশ্বিক অস্থিরতা, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি প্রভৃতি সমস্যা মোকাবিলা করার নিমিত্ত সরকারের গৃহীত স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পদক্ষেপ মহান সংসদে আলোচনার মাধ্যমে জাতিকে অবহিত করা হোক।

এক লাফে ৪১ থেকে ৫১ শতাংশ ডিজেল, অকটেন এবং পেট্রোলের মূল্য বাড়ানো হয়েছে উল্লেখ করে চু্ন্নু বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একক কোনও পণ্যের দাম এত বৃদ্ধি হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এ কারণে সব জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। যার সঙ্গে তেলের কোনও সম্পর্ক নাই, সেসব পণ্যও এই কালোবাজারি, অসৎ ব্যবসায়ীরা বাড়িয়ে দিয়েছেন। সরকারের কোনও নিয়ন্ত্রণ আছে বলে আমরা দেখি না।

মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, গত ১ বছরে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে ৬৫ শতাংশ। অথচ এই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে গড়ে দুই শতাংশ জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। দেশের সেচ কেন্দ্রগুলোর ৩ ভাগের একভাগ বিদ্যুৎচালিত, বাকি দুইভাগ ডিজেলচালিত। ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষককে বাড়তি খরচ করতে হবে। এতে উৎপাদনে ঘাটতি হবে।

/ইএইচএস/এমআর/এমওএফ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বিশ্ব অর্থনীতির সামনে দুই কঠিন পথ, নেপথ্যে ইরান যুদ্ধ ও এআই সংকট
বিশ্ব অর্থনীতির সামনে দুই কঠিন পথ, নেপথ্যে ইরান যুদ্ধ ও এআই সংকট
এবার পল্লবীতে মিললো আরেক নারীর গলিত মরদেহ
এবার পল্লবীতে মিললো আরেক নারীর গলিত মরদেহ
নিখোঁজ ব্যবসায়ীর হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার
নিখোঁজ ব্যবসায়ীর হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার
ওপেনএআই’র নতুন বাজি ‘কোডেক্স’
ওপেনএআই’র নতুন বাজি ‘কোডেক্স’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের