নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের দুটি মামলার অভিযোগপত্র গঠন শেষে আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেছেন আদালত। দুটি মামলায় গ্রেফতারকৃত ২৩ জনের উপস্থিতিতে সোমবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে অভিযোগপত্র গঠন সম্পন্ন হয়। শুনানির সময় আসামিপক্ষের আইনজীবীরা ২৩ জনের অব্যাহতির আবেদন করলেও আদালতে তা নাকচ করে দেন।
এ দিন আদালতে পলাতক ১২ জন আসামি অনুপস্থিত থাকলেও সাত খুনের দুটি মামলায় অভিযুক্ত ৩৫ জনের সকলের বিরুদ্ধেই চার্জ গঠন করা হয়। ফলে ১২ জনের অনুপস্থিতিতেই মামলার বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, আদালতে চার্জ গঠনের সময় আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অব্যাহতি আবেদন করেছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষের বিরোধিতার কারণে আদালত ৩৫ জনকেই অভিযুক্ত করে চার্জ গঠন শুরু করেছে। আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি মামলার প্রথম সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
মামলায় আসামিপক্ষে মহানগর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট খোকন সাহা, প্রাক্তন পিপি সুলতানুজ্জামান, জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এমএ রশিদ ভূইয়া, সুপ্রিম কোর্টের সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আশরাফউজ্জামানসহ অর্ধশত আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে, বাদীপক্ষের আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন খান দাবি জানান, উচ্চ আদালত নির্দেশ দিয়েছিলেন তদন্তকারী সংস্থা আরও অধিকতর তদন্ত করতে পারেন। কিন্তু সেটা তদন্তকারী সংস্থা আমলে নেয়নি। ত্রুটিপূর্ণ চার্জশিট দিয়েই বিচার শুরু হয়েছে যাতে করে আসামিপক্ষের অনেক সুযোগ থেকে যাচ্ছে।
যে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন
সাত খুনের দুটি মামলায় নূর হোসেন ও র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ মোট ২৩ জন কারাগারে আটক রয়েছেন। নূর হোসেন ছাড়া বাকিরা হলেন- সামরিক বাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া র্যাব-১১ এর সাবেক লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, র্যাব-১১ এর স্পেশাল ক্রাইম প্রিভেনশন কোম্পানির ক্যাম্প কমান্ডার এম এম রানা ও মেজর আরিফ হোসেন, র্যাব সদস্য এসআই পূর্ণেন্দু বালা, এএসআই বজলুর রহমান ও আবুল কালাম আজাদ, হাবিলদার এমদাদুল হক ও নাসির উদ্দিন, কনস্টেবল শিহাব উদ্দিন ও বাবুল হাসান, আরওজি-১ আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক হীরা মিয়া, বেলাল হোসেন, ল্যান্স কর্পোরাল রুহুল আমিন, সিপাহী আবু তৈয়ব, নুরুজ্জামান, আসাদুজ্জামান নূর এবং নূর হোসেনের সহযোগী মোর্তুজা জামান চার্চিল, আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান দীপু, রহম আলী ও আবুল বাশার।
মামলা দুটিতে পলাতক রয়েছেন ১২ জন। তারা হলেন নূর হোসেনের সহযোগী সেলিম, শাহজাহান, সানাউল্লাহ সানা, জামাল উদ্দিন, র্যাব কর্পোরাল লতিফুর রহমান, সৈনিক মহিউদ্দিন মুন্সি, আল আমিন শরিফ, আব্দুল আলী, তাজুল ইসলাম, সার্জেন্ট এনামুল কবির, এএসআই কামাল হোসেন ও কনস্টেবল হাবিবুর রহমান।
প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন ও গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম এবং আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার, তার গাড়িচালক ইব্রাহীম অপহৃত হন। পরে ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ছয়জনের এবং ১ মে একজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় নিহত কাউন্সিলর নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি ও চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল পৃথক দুটি করেন। হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক বছর ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের আদালতে ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মামনুর রশিদ মণ্ডল। মামলায় সাক্ষী দেখানো হয়েছে ১১৭ জনকে।
কিন্তু চার্জশিট থেকে পাঁচ আসামিকে বাদ দেওয়ায় এবং প্রধান আসামি নূর হোসেনের জবানবন্দি ছাড়া চার্জশিট আদালত আমলে নেওয়ায় ‘নারাজি’ আবেদন করেন সেলিনা ইসলাম বিউটি। আবেদনটি নারায়ণগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও জর্জ কোটে খারিজ হয়ে গেলে বিউটি উচ্চ আদালতে যান। হাইকোর্টের আদেশে বলা হয়, পুলিশ চাইলে মামলাটির ‘অধিকতর তদন্ত’ করতে পারে এবং ‘হত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনার’ ধারা যুক্ত করে নতুন করে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে পরে। তবে তদন্তকারী সংস্থা জানান, তাদের চার্জশিট নির্ভুল ও চমৎকার।
গত ১২ নভেম্বর নূর হোসেনকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার পরদিনই তাকে সাত খুনের দুটি মামলাসহ ১১ মামলায় গ্রেফতার দেখায় পুলিশ। ১১টি মামলার মধ্যে সাত খুনের দুটি মামলা, চাঁদাবাজির তিনটি এবং অস্ত্র আইনসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলাগুলো রয়েছে।
এদিকে, দুপুরে জজ কোর্টে নূর হোসেনের বিরুদ্ধে চার মামলার শুনানি শেষে আদালত তাকে জামিন দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন অ্যাডভোকেট খোকন সাহা। তিনি জানান, মাদকের একটি, চাঁদাবাজির দুটি এবং অস্ত্র আইনের একটি মামলায় আদালত নূর হোসেনকে জামিন দিয়েছেন।
/বিটি/টিএন/








