আমদানি অনিশ্চয়তা, ডলারের বিপরীতে টাকার মান ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, উচ্চ আমদানি শুল্কসহ নানামুখি জটিলতায় ধুঁকছে চশমার পাইকারি বাজার। দেশে চশমার বৃহত্তম পাইকারি বাজার রাজধানীর পাটুয়াটুলিতে। বর্তমানে সেখানে ৪ শ’র বেশি দোকান রয়েছে। ২-৩ বছর আগে ব্যবসা রমরমা থাকলেও এখন সেখানে ভিন্নচিত্র।
পাটুয়াটুলির নূরুল হক মার্কেট, শেখ জামাল মার্কেট, পাবনা বিল্ডিং, ফিরোজা ভবন, বি.পি.এম. মার্কেটের পাইকারি ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, উচ্চ আমদানি শুল্ক ও পণ্যের গুণগত মানের কারণে চীনের ওপর একচেটিয়া নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে দেশের পাইকারি চশমার বাজার। চীন থেকে পণ্য অর্ডার দেওয়ার পর নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেলেও দেশে পৌঁছে না সেই পণ্য। খুচরা বাজারে চাহিদা থাকলেও পণ্যের নিয়মিত সরবরাহ হচ্ছে না। করোনা ও ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিকে প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়া, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, করোনার সময়ের ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে না পারায় পুঁজি হারাচ্ছেন বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। ব্যবসা টেকাতে ব্রান্ডের পণ্যের বদলে রেপ্লিকা পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন তারা, বাড়ছে অবৈধ আমদানি।
বিপিএম মার্কেটের নাইক অপটিকসের মো. আল-আমিন বলেন, ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে বেচা-বিক্রি কিছুটা বাড়লেও সারা বছরের চাহিদায় ভাটা পড়েছে। এই মৌসুমে চোখ ওঠা রোগের প্রকোপ বাড়ায় চশার বিক্রি কিছুটা বেড়েছে। তাছাড়া ডলারের দাম বেড়েছে, শিপ আসতে দেরি হচ্ছে, আমদানি পণ্য কবে পৌঁছাবে তার ঠিক নেই। এভাবে তো ব্যবসা হয় না, উল্টো পুঁজি নষ্ট হচ্ছে আমাদের।’
শেখ জামাল মার্কেটের মাদার অপটিকসের মালিক আলিম রহমান বলেন, ‘ব্যবসা আগের তুলনায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। মাল না পেলে আমরা খুচরা ব্যবসায়ীদের কীভাবে পণ্য দিবো? আজ অর্ডার দিবো, কিন্তু দুই মাস তো দূরের কথা ৪ মাসেও পাবো কিনা তার নেই ঠিক। পুঁজি খাটিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে। করোনার মধ্যে অনেক লস করেছি, অনেকে ব্যবসাও ছেড়েছে। জিনিসের দাম যেভাবে বাড়ছে, খুচরা ব্যবসায়ীরাও আগের মতো মাল নিতে পারছে না।'
চীনের ওপর একচেটিয়া নির্ভরতা
ব্যবসায়ীরা জানান, ৯০ দশক ও একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, কোরিয়া থেকে চশমা আমদানি করা হতো। আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি ও আমদানি খরচের সামঞ্জস্য রাখতে বর্তমানে ভারত ও চীন থেকে চশমা আমদানি করা হচ্ছে। তবে ভারতীয় পণ্যের গুণগত মানের অভাব ও চাহিদা না থাকায় এবাজারের একচেটিয়া নির্ভরতা এখন চীনের ওপর।
চীন থেকে বৈধ আমদানিকারকদের মাধ্যমে লটে পণ্য আসলেও বর্তমানে অনলাইন মার্কেটপ্লেস আলিবাবা.কমের মাধ্যমেও অর্ডার করছেন অনেক ব্যবসায়ী। এ পদ্ধতিতে কমছে আমদানি খরচ, কম পুঁজির ব্যবসায়ীরা হচ্ছেন লাভবান। তবে জাহাজের মাধ্যমে নিয়ে আসার কারণে সময়মতো পৌঁছে না পণ্য।
নূরুল হক মার্কেটের হাওলাদার অপটিকসের মালিক আজাহারুল হাওলাদার রানা বলেন, ‘সিঙ্গাপুর থেকে পণ্য আনতে ৩০ হাজার টাকা ট্যাক্স লাগে। সেখানে চীনের খরচ অনেক কম। শিপের মাধ্যমে আলিবাবায় অর্ডার করলে এখন কেজিতে ১৬০০-১৭০০ টাকা খরচ হয়। যদিও করোনার আগে ৩৫০ টাকায় আনতাম আমরা।’
রেপ্লিকা পণ্যের বাজার দখল
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিতিশীলতা, উচ্চ আমদানি শুল্ক ও ক্রেতার অভাব থাকায় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর প্রতি আগ্রহ হারিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বিপরীতে বাজার দখল করেছে রেপ্লিকা পণ্য। আন্তর্জাতিক সব ব্র্যান্ডের রেপ্লিকা পণ্য স্টিকার লাগিয়ে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে৷ ব্যান, আরমানি, পোলিস, রেবেন, গুচি, ফাস্টট্র্যাকসহ যেকোনও ব্র্যান্ডেরই রেপ্লিকা পণ্য রয়েছে বাজারে। এসব রেপ্লিকা পণ্য আসে চীন থেকেই। রেপ্লিকা হলেও বোঝার উপায় নেই যে তা আসল নয়। নিখুঁত ও মূল্য কম হওয়ায় ক্রেতারাও সানন্দে ক্রয় করেন বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।
কামাল অপটিক্যালের ম্যানেজার নাইনুর রহমান বলেন, ‘বাজারে যা পাবেন, সব চায়নার রেপ্লিকা, আসল বলে কোনও কথা নেই। এরা যেভাবে বানায় বোঝার উপায়ও থাকে না—সেগুলো আসল না নকল। রেবেনের একটা চশমার দাম যেখানে ২০ হাজার টাকা, সেখানে ২০০০ টাকায় রেপ্লিকা পাবেন।’
চশমা বণিক সমিতির পরিচালক আব্দুর রশিদ বলেন, ‘চীন থেকে চশমাপ্রতি আমাদের আমদানি শুল্ক ৮০ টাকা, একই পণ্য ভারতে ১০ টাকা, পাকিস্তানে ৫ টাকা। এখন ডলারের দাম বেড়েছে, আমদানি কঠিন হয়েছে, সবমিলিয়ে চশমার দামও বেড়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমায় খুচরা ব্যবসায়ীরাও কম মাল নিচ্ছে। কিন্তু আমদানি জটিলতায় আমরা চাহিদা অনুযায়ী বাজারে মাল ছাড়তে পারছি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক সময় ৮০ টাকা শুল্ক দিয়ে কেনা চশমা তুলনামূলক কম দামে বেচতে হয়। সরকার তো এটা দেখে না, তারা লিখে দেয় চশমার শুল্ক ৮০ টাকা। করোনার ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে পারিনি, আমরা কোনও প্রণোদনাও পাইনি। সরকার যদি আমাদের প্রতি সুদৃষ্টি না দেয় এই ব্যবসার সাথে জড়িত সবাই পড়ে যাবো। আমদানি সমস্যার সমাধান করলে আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারবো।'
ছবি: নাসিরুল ইসলাম।









