রাজধানী ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে দেখতে কে না চান? নিশ্চয়ই সবাই চান। কিন্তু আমরা সবাই কি সে অনুযায়ী চলি? এর উত্তর পাওয়া যাবে-‘না’। কারণ মুখে বললেও আমরা কিন্তু এ ব্যাপারে ততটা সচেতন নই। যত্রতত্র ময়লা ফেলে শহরকে দুর্গন্ধময় করে তুলছি নিত্যদিন। অন্যদিকে নগর সেবাদানকারী সিটি করপোরেশনও পারছে না পাহাড়সম এই জঞ্জাল সরাতে। ফলে মনে মনে চাইলেও বাস্তবে ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন রাখা যাচ্ছে না।
ঢাকার সমস্যাগুলো চিহ্নিত হয়ে গেছে। এখন শুধু কাজ করার পালা। পুতি গন্ধময় পরিবেশ থেকে ঢাকাকে বের করে আনতে অবশেষে বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে ‘প্রাণসখা ঢাকা’ বা ‘লাভ ফর ঢাকা’ নামে জনসচেতনতামূলক উৎসবের আয়োজন করলো ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন-ডিএসসিসি। শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনের সড়কে বানানো বিশাল মঞ্চে দাঁড়িয়ে শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, পেশাজীবী-সবাই সমস্বরে উচ্চারণ করেছেন ‘ঢাকারও প্রাণ আছে, অনুভূতি আছে। এই ঢাকা আমাদের। আমরা ঢাকাকে ভালোবাসি। ঢাকা আর অপরিষ্কার থাকবে না। আসুন আমরা সবাই সচেতন হই। নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করি।’
গত ডিসেম্বরে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ২০১৬ সালকে পরিচ্ছন্নতার বছর ঘোষণা করেন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। এরপর জানুয়ারি থেকে একের পর এক সচেতনতামূলক কর্মসূচি চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় রবিবার দিনভর শাহবাগে উদযাপিত হলো ‘লাভ ফর ঢাকা ফেস্ট’। সকাল এগারটায় মেয়র এই উৎসবের উদ্বোধন করেন। এরপর সারাদিন চলে নামিদামি শিল্পীদের সঙ্গীত পরিবেশন, কবিতা আবৃত্তি ইত্যাদি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ২০১৬ সালকে পরিচ্ছন্নতার বছর ঘোষণা করেছি। এই পরিচ্ছন্নতা শুধু ময়লা পরিষ্কার নয়, চিন্তা, আদর্শ ও মনের জগতের পরিচ্ছন্নতাও। ঢাকার প্রতিটি নাগরিককে আমরা মেয়রের ভূমিকায় দেখতে চাই। তাহলেই প্রিয় ঢাকা পরিচ্ছন্ন নগরীতে পরিণত হবে। তিনি বলেন, অনেক রকম কষ্ট আছে। তবুও ঢাকা আমার ঢাকা, প্রাণসখা ঢাকা।
সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক বলেন, সবাইকে মেয়রের দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমাদের সেই চারশ’ বছরের ঐতিহ্যের ঢাকাকে তৈরি করতে হবে। তিনি বলেন, শুধু শহরের ময়লা পরিষ্কার নয়, মনের ও চিন্তা-চেতনারও পরিচ্ছন্নতা আনতে হবে। তিনি বলেন, ‘অবোধ ভালোবাসা হলে চলবে না। প্রত্যেককে মেয়রের ভূমিকা পালন করতে হবে।’
অভিনয় শিল্পী ড. এনামুল হক বলেন, ‘আমরা এ অঙ্গীকার করতে এসেছি যে, ঢাকাকে সুন্দর রাখবো।’
চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ বলেন, ‘রুয়ান্ডাতে প্রতি শনিবার কমিউনিটির ভিত্তিতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অভিযান পরিচালনা করা বাধ্যতামূলক। ঢাকায়ও এমন কিছু করতে হবে।’
বিজ্ঞাপনী সংস্থা মাত্রার ম্যানেজিং পার্টনার ও অভিনয়শিল্পী আফজাল হোসেন বলেন, ‘আমরা এ শহরকে ভালোবাসি। যতক্ষণ না আমরা অনুভব করতে পারবো ঢাকার প্রাণ আছে, আত্মা আছে, অনুভূতি আছে ততক্ষণ পর্যন্ত ঢাকার প্রতি আমাদের ভালোবাসা প্রকাশ হবে না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য নাসরিন আহমেদ বলেন, ঢাকাকে পরিষ্কার রাখতে হলে উভয় পক্ষেরই দায়িত্ব আছে। জনগণকে যেমন সচেতন থাকতে হবে, সিটি করপোরেশনকেও তেমনি সেবা কার্যক্রম দিতে হবে।
বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে রবিবার অনুষ্ঠান আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। শাহবাগ মোড় থেকে টিএসসি হয়ে বাংলা একাডেমি, কলাভবন প্রভৃতি এলাকা পরিণত হয় সমমনা মানুষের মিলনমেলায়। সকাল থেকে জোড়ায় জোড়ায় কিংবা দল বেঁধে চলতে থাকে ঘোরাঘুরি। সবার হাতে ছিল ফুল। কেউ কেউ আবার উপভোগ করেন হরেক রকমের অনুষ্ঠানও।
ক্যাম্পাসের অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচাইতে জমজমাট ছিল ডিএসসিসির প্রাণসখা লাভ ফর ঢাকা উৎসবটি। একটি নগরীর প্রতি নাগরিকদের ভালোবাসার কথা জানান দেওয়ার এমন আয়োজন এটাই প্রথম। অনুষ্ঠানের শুরুতে থিম সং ‘ঢাকা আমার ঢাকা, প্রাণসখা ঢাকা’ পরিবেশন করে ব্যান্ড দল জলের গান। এরপর শুরু হয় দেশের জনপ্রিয় ব্যান্ডদলগুলোর ভালোবাসার গানের কনসার্ট। একে একে দর্শকদের হৃদয় মাতান ফকির আলমগীর, ‘শিরোনামহীন’ ও জেমসের ‘নগর বাউল’।
উৎসব দেখতে আসা অগ্রণী ব্যাংক কর্মকর্তা আবু আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এমন একটি জনসচেতনতামূলক অনুষ্ঠান বাংলাদেশে এই প্রথম। এর মাধ্যমে নিশ্চয়ই নগরবাসী সচেতন হবেন। তবে শুধু একদিনের অনুষ্ঠানেই যেন সব শেষ হয়ে না যায়।
ওরিয়ন গ্রুপ, গ্রামীণ ফোন ও সামিট গ্রুপ-এর সৌজন্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ছিল এই উৎসবের উদ্যোক্তা। এতে সহযোগিতা দিয়েছে চ্যানেল আই ও বিজ্ঞাপনী সংস্থা মাত্রা। উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, সামিট গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান ফরিদ খান।
ছবি: নাসিরুল ইসলাম
ওএফ/এপিএইচ/








