শুধু লেখালেখির কারণেই চাপাতির কোপে লেখক অভিজিৎ রায়, প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনকে প্রাণ হারাতে হলেও লেখক-প্রকাশক-পাঠকের বইমেলায় নেই তাদের কোনও স্মৃতিচিহ্ন। যার বই প্রকাশের কারণে দীপনের ওপর হামলা হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়, সেই অভিজিতেরই কোনও বই নেই জাগৃতির স্টলে। ‘বাস্তব পরিস্থিতির’ কারণেই অভিজিতের বই জাগৃতির স্টলে রাখা হয়নি বলে জানিয়েছেন দীপনের বাবা আবুল কাসেম ফজলুল হক।
তবে, গতবছর হারানো লেখক-প্রকাশকদের জন্য কেন কোনও উদ্যোগ নেওয়া হলো না এবারের মেলায়, এ নিয়ে পাঠক মনে প্রশ্ন, ক্ষোভ দুই-ই আছে।
নানা শঙ্কা নিয়ে বইপ্রেমী বাঙালি এবারের মেলায় এলেও তাদের মনে হয়, গত বছর প্রাণ হারানোর ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা না জানানোটা অন্যায় হচ্ছে। এমনকি প্রকাশকরা কেউ তেমন বড় ধরনের কোনও বিক্ষোভও করেননি। বই লেখা ও প্রকাশকে ঘিরে এত বড় অন্যায় ঘটল, এবারের বইমেলায় তার কোনও ছাপই নেই দেখে অবাক হয়েছেন অনেকে। তাদের মধ্যে একজন সপরিবারে মেলায় আসা সাধারণ পাঠক মেসবাহ। তিনি বলেন, কেবল তাই-ই নয়, জাগৃতি থেকে অভিজিতের যে বইটি বের হয়েছিল, সেটাও সেখানে মিলছে না। বলতে চান, সব বিক্রি হয়ে গেছে? আর হলেও রিপ্রিন্ট হলো না এ বার?
এ প্রসঙ্গে দীপনের বাবা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘দীপন ইসলামের ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে শ্রদ্ধাশীল ছিল। দীপন কখনও ব্লগ বা কোনও আয়োজনেও ইসলামবিরোধী কোনও মন্তব্য করেনি আমার জানামতে। সে বিশ্বাস করত, ধর্মমানুষের মুক্তির পথ। শুধু ইসলাম ধর্ম নয়, সব ধর্মকেই সে সমান শ্রদ্ধার চোখে দেখত। অভিজিতের ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ বইটি সে বন্ধুত্বের কারণেই ছেপেছিল। একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তারা ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা করেছে। আমরা বাস্তব পরিস্থিতির কারণেই অভিজিতের বইটি স্টলে রাখিনি।’’ বাস্তবপরিস্থিতিটা কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এই যে মুক্তবুদ্ধি চর্চার কারণে সাত/আটটি প্রাণ ঝরে গেল, বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ বা মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারীরা কি কোথাও তাদের কথা বলেছেন? বাংলা একাডেমির এই মঞ্চে তাদের মৃত্যু নিয়ে একটি কথা বলা কি যেত না? দীপনের জন্য আমাদের একা লড়াই করতে হচ্ছে। তাই আমরা অভিজিতের বইটি রাখিনি।’
মেলা শুরুর সপ্তাহেই জনে-জনে জাগৃতির স্টলে ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ বইটির খোঁজ করেছেন অনেকে। হতাশ হতে হয়েছে তাদের। দীপনের স্ত্রী ডা. রাজিয়া রহমান বলেন, ‘আমরা আসলে যে লড়াইটা মনের সঙ্গে, বেঁচে থাকার জন্য, টিকে থাকার জন্য করছি, সেখানে এই বিষয়গুলো নিয়ে এখন ভাবার সুযোগই নেই। এমনকি পুরো ব্যবসাটাকে এই কয়মাসে হাল ধরে মেলা পর্যন্ত আসাটাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।’ তবে, তার কথাতে আছে প্রকাশক বা একাডেমির পক্ষ থেকে দীপনের কোনও স্মৃতিই না রাখার ক্ষোভ। এই স্মৃতি না থাকা নিয়ে অনেক প্রশ্ন ঘুরছে তার মাথায়। যার উত্তর তিনি এখনও জানেন না।
গত বছরের বইমেলার ২৬তম দিনে মেলা থেকে ফেরার পথে ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের চাপাতির আঘাতে খুন হন বিজ্ঞান লেখক, ব্লগার, গবেষক ডক্টর অভিজিৎ রায়। এরপর একই বছরের ১২মে সিলেটে খুন হন আরেকজন বিজ্ঞান লেখক অনন্ত বিজয় দাশ। খুন হন ব্লগার ওয়াশিকুর বাবু, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয় (নিলয় নীল) এবং ৩১ অক্টোবর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় নিজ প্রতিষ্ঠানে খুন হন অভিজিতের বইয়ের প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন। তিনি তার জাগৃতি প্রকাশনী থেকে অভিজিতের জনপ্রিয় বই ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ প্রকাশ করেছিলেন। একই দিনে চাপাতির আঘাতে গুরুতর আঘাত প্রাপ্ত হন অভিজিৎ রায়ের বইয়ের প্রকাশক শুদ্ধস্বরের আহমেদুর রশিদ টুটুল, লেখক রণদীপম বসু ও তারেক রহিম।
মেলায় দেখা গেছে, জাগৃতির স্টলের ভেতরে প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনের হাসিমাখা মুখের আলোকচিত্র। ছবির নিচে জীবনানন্দ দাশের কবিতার দুই লাইন, 'অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ/ যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা।’ আর বিদ্রোহের লাল রঙ দিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চেয়েছে টুটুলের শুদ্ধস্বরের স্টল। এর বাইরে কিছু চোখে পড়ে না।
/এমএনএইচ/








