আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারবিরোধী আন্দোলনে সুযোগ বুঝে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য ছিন্নমূল শিশু-কিশোর ও তরুণদের যুক্ত করার পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। রাজধানীসহ বড় কয়েকটি মহানগরীতে পথে-ঘাটে থাকা ছিন্নমূল ও স্বজনহীন শিশু-কিশোরদের টার্গেট করে এই পরিকল্পনা চলছে। রাষ্ট্রীয় প্রভাবশালী একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধী দলের সরকারবিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত ধাপে ছিন্নমূল শিশু-কিশোরদের ব্যবহার করার তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। এক্ষেত্রে ছিন্নমূলদের কারা সংগঠিত করছে, কারা অর্থায়ন করছে—সেসবের সূত্র মেলাতে তৎপরতা শুরু করেছে প্রভাবশালী একাধিক সংস্থা।
সংস্থার সূত্র বলছে, তাদের কাছে তথ্য রয়েছে সরকারবিরোধী আন্দোলনের শেষ ধাপে ছিন্নমূল গোষ্ঠীর মানুষদের নিয়ে ‘বিশেষ ফোর্স’ গঠন করা হতে পারে। এক্ষেত্রে আন্দোলনের নিয়মিত শক্তির পাশাপাশি এই ফোর্সটিকেও শেষ মুহূর্তে কাজে লাগানোর তৎপরতা চলছে।
এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সুনির্দিষ্ট কোন ব্যক্তি বা দল জড়িত তা এখনই প্রকাশ করতে নারাজ গোয়েন্দা সূত্র।
একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সারা দেশে ২৫ লাখের বেশি ছিন্নমূল শিশু-কিশোর ও তরুণ রয়েছে। যাদের বেশিরভাগ সুনির্দিষ্ট কোনও কাজে যুক্ত নেই। রাজধানীতে প্রায় সাত-আট লাখ ছিন্নমূল মানুষ বিভিন্ন সড়কে অবস্থান করে। তাদের মধ্য থেকেই সুনির্দিষ্ট ‘সুবিধা’র বিনিময়ে বাছাইকৃত ছিন্নমূলদের বিশেষ ফোর্সে যুক্ত করা হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ভাসমান, ছিন্নমূল শিশু-কিশোর-তরুণরা যেন অপরাধে না জড়ায়—সেই চিন্তা থেকে আগেভাগেই নজরদারি শুরু হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অপরাধ বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার ড. খ. মুহিদ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেকোনও ধরনের অপরাধ সংঘটিত হওয়ার বিষয়ে আগাম তথ্যের জন্য গোয়েন্দা পুলিশ কাজ করে থাকে। ভাসমান বা ছিন্নমূল যা-ই বলি না কেন, তারা সমাজের একটি অংশ। এই ভাসমান এবং ছিন্নমূল যারা রয়েছে, তাদের কেউ যেন কোনও ধরনের অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে না পারে, সে ব্যাপারে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যখনই কোনও ধরনের তথ্য পাওয়া যায়—তখনই সেসব বিষয়ে পুলিশ আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়।’
ড. খ. মুহিদ উদ্দিন আরও বলেন, ‘ছিন্নমূল এবং ভাসমান যারা রয়েছে, তারা যাতে কারও ইন্ধনে কোনও ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়তে না পারে, সে ব্যাপারে বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। শুধু ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ নয়—পুলিশের সব ইউনিট এসব বিষয়ে নজর রাখছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে কোনও ধরনের অপতৎপরতার সুযোগ যেন কেউ নিতে না পারে, সে বিষয়েও পুলিশ বিশেষ নজর রাখছে।’
পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) মনজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভাসমান বা ছিন্নমূল যারা রয়েছে, তাদের অপরাধ শনাক্তে পুলিশ সদস্যরা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। যখনই কোনও ধরনের গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তখনই পুলিশ তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসছে।’
সমাজসেবা অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা জানান, সরকারের অন্য সংস্থার পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ছিন্নমূলদের রাজনৈতিক সহিংসতায় ব্যবহারের বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। তবে অধিদফতরের কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে আলোচনা শুরু হয়েছে।
জানতে চাইলে রবিবার (১৮ জুন) বিকালে ঢাকা বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালক (উপসচিব) মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, ‘মূলত সমাজসেবা অধিদফতরই ছিন্নমূল ও ভবঘুরেদের নিয়ে কাজ করে থাকে। জেলায়ও এই কার্যক্রম অব্যাহত আছে। ঢাকা বিভাগীয় অফিসের আওতায় আমাদের তিনটি চাইল্ড প্রটেকশন হাব আছে—গাবতলী, কমলাপুর ও সদরঘাটে। সেখানে ভবঘুরে ও ছিন্নমূলদের সেখানে পড়াশোনা এবং খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।’
মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক উল্লেখ করেন, ‘ছিন্নমূল, ভবঘুরে শিশু-কিশোররা যেন অপরাধে না জড়ায়, সে কারণে বিভিন্ন মোটিভেশনাল প্রোগ্রাম করা হয়। আমাদের চাইল্ড হাবগুলোতে আর্ট, গান ও খেলাধুলার শিক্ষক রয়েছেন। তারা ভবঘুরে শিশু-কিশোরদের অপরাধ থেকে বিরত রাখতে উদ্দীপনামূলক ক্লাস গ্রহণ করেন।’
গোয়েন্দা নজরদারিতে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরাও
রাষ্ট্রীয় প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ও সংক্ষুব্ধ হয়ে আছে এমন শ্রমিকগোষ্ঠীকেও সরকারবিরোধী আন্দোলনে ব্যবহার করার খবর পাওয়া গেছে। এক্ষেত্রে বিগত কয়েক মাসে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত সংক্ষুব্ধ শ্রমিক, উচ্ছেদকৃত হকারদের সংক্ষুব্ধ অবস্থানকে আন্দোলনে ধাবিত করার প্রচেষ্টার বিষয়টিও গোয়েন্দাদের নজরদারিতে উঠে এসেছে।
সংস্থার সূত্র জানায়, কর্মহীন শ্রমিকের পাশাপাশি বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশের মানুষদের ক্ষোভকে আন্দোলনে কাজে লাগানোর বিষয়ে একাধিক রাজনৈতিক দলের সরাসরি যুক্ততা পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত জানাতে অপারগতা প্রকাশ করে সূত্রটি।
গত কয়েক মাস ধরে নজরদারি কার্যক্রমে যুক্ত মাঠপর্যায়ের বেশ কয়েকজন গোয়েন্দা সদস্য বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে জানিয়েছেন, রাজধানী ঢাকায় বিগত কয়েক মাসে বেশ কয়েকটি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে অনেকেই যোগাযোগ করেছেন। তাদের মধ্যে কোনও কোনও পক্ষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনে যোগাযোগ করেছে—এমন তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ৪ এপ্রিল বঙ্গবাজার মার্কেটে আগুন লেগে প্রায় পাঁচ হাজার দোকান পুড়ে যায়। ১১ এপ্রিল চকবাজারের বিসমিল্লাহ টাওয়ারের পাশে বহুতল ভবনের চতুর্থ তলায় সিরামিক ওয়্যার হাউজ ভস্মীভূত হয়। ১৩ এপ্রিল নবাবপুরের মোহাম্মাদিয়া মার্কেটে ২০টি দোকান ও ওয়্যার হাউজ পুড়ে যায়। ১৫ এপ্রিল নিউমার্কেট সংলগ্ন নিউ সুপারমার্কেটে প্রায় ৩০০ দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি ঈদের আগে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় ২২টি স্থানে আগুন লাগার ঘটনা রয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্যমতে, ২০২২ সালে সারা দেশে গড়ে প্রতিদিন ৬৬টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া শুধু অগ্নিকাণ্ডে এক বছরে ক্ষতির পরিমাণ ৩৪২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। ২০২১ সালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ২১ হাজার ৬০১টি। অপর দিকে ২০২২ সালে এসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ হাজার ১০২টি।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল-মঈন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছিন্নমূল এবং ভাসমান জনগোষ্ঠীকে দিয়ে অপরাধ ঘটনোর বিষয়টি আমরা নজরে রাখছি। যারা এ ধরনের ভাসমান এবং ছিন্নমূলদের দিয়ে অপরাধ ঘটানোর চেষ্টা করবেন, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। নির্বাচনকে সামনে রেখে সব ধরনের বিষয় মাথায় রেখেই আমরা কাজ করছি।’









