১৯৭৪ সালের অক্টোবরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের অনেকগুলো সমাবেশ পরিচালনা করেন এবং ধারণা দেন যে, আরেকটি ‘বিপ্লব’ এখন অনিবার্য হয়ে পড়েছে। পরবর্তীকালে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু তাঁর সংসদীয় বক্তব্যে প্রথমবারের মতো ‘দ্বিতীয় বিপ্লবের’ ঘোষণা দেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি বেশকিছু পরিবর্তনের ডাক দেন।
বঙ্গবন্ধু এই পর্যায়ের মূল কাজ হিসেবে, অর্থাৎ মুক্তিসংগ্রামের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ হিসেবে অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করাকে নির্ধারণ করেন। যাতে এর সুফল কৃষক-শ্রমিক মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষ ভোগ করতে পারে। গবেষকরা বলছেন, বঙ্গবন্ধুর কাছে এক কথায় মুক্তিসংগ্রামের দ্বিতীয় পর্যায় ছিল, অর্থনৈতিক মুক্তি।
পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ওই ভাষণে তিনি নতুন বাংলাদেশকে গড়ার লক্ষ্যে সাময়িকভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর নির্দেশনা দেন। তিনি নিজেই তখন অনেক কিছু বদলে দেওয়ার রাস্তা খুঁজছিলেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই ভাষণটি ছিল বঙ্গবন্ধুর শেষ ভাষণ।
জাতির পিতার কাছে প্রথম বিপ্লবটি ছিল দেশের স্বাধীনতা অর্জন। তাঁর নেতৃত্বেই সেটি সফল হয়েছে। বাকশাল ঘোষণার মধ্য দিয়ে তিনি দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, এ বিপ্লবের লক্ষ্য হলো—‘দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো’। তিনি বলেছেন, তাঁর দ্বিতীয় বিপ্লবের লক্ষ্য হলো— অর্থনৈতিক মুক্তি।
বঙ্গবন্ধু সেদিনের ভাষণে বলেন, ‘আমি যে কো-অপারেটিভ করতে যাচ্ছি গ্রামে গ্রামে, এর ওপর বাংলার মানুষের বাঁচা নির্ভর করবে। আপনাদের ফুল প্যান্টটা একটু হাফপ্যান্ট করতে হবে। পাজামা ছেড়ে একটু লুঙ্গি পরতে হবে। আর গ্রামে গ্রামে যেয়ে এই কো-অপারেটিভকে সাকসেসফুল করার জন্য কাজ করতে হবে। যুবক চাই, ছাত্র চাই, সবাইকে চাই।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যখন ক্ষমতায় আসলাম, দেশের ভার নিলাম— তখন দেশের রাস্তাঘাট যে অবস্থায় পেলাম, তাকে রিপেয়ার করার চেষ্টা করলাম। সেনাবাহিনী নাই, প্রায় ধ্বংস করে গেছে। পুলিশ বাহিনীর রাজারবাগ জ্বালিয়ে দিয়েছিল। সেই খারাপ অবস্থা থেকে ভালো করতে কী করি নাই? আমরা জাতীয় সরকার গঠন করলাম। আমাদের এখানে জাতীয় সরকার ছিল না, আমাদের ডিফেন্স ডিপার্টমেন্ট ছিল না, বৈদেশিক ডিপার্টমেন্ট ছিল না, প্ল্যানিং ডিপার্টমেন্ট ছিল না। এখানে কিছুই ছিল না। তার মধ্যে আমাদের জাতীয় সরকার গঠন করতে হলো। যারা শুধু কথা বলেন, তারা বুকে হাত দিয়ে চিন্তা করে বলুন— আমরা কী করেছি। এক কোটি লোককে ঘরবাড়ি দিয়েছি। রাষ্ট্রের লোককে খাওয়ানোর জন্য বিদেশ থেকে খাবার আনতে হয়েছে। পোর্টগুলোকে অচল থেকে সচল করতে হয়েছে। দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গা থেকে ২২ কোটি মণ খাবার এনে বাংলার গ্রামে গ্রামে বাংলার মানুষকে বাঁচাতে হয়েছে।’
সেদিনের বক্তব্যে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে হতাশার সুরও শোনা যায়। তিনি বলেন, ‘আমি মানুষকে বললাম, আমার ভাইদের বললাম, মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের বললাম, তোমরা অস্ত্র জমা দাও। তারা অস্ত্র জমা দিলো। কিন্তু একদল লোক আমার জানা আছে— যাদের পাকিস্তান অস্ত্র দিয়ে গিয়েছিল, তারা অস্ত্র জমা দেয়নি। তারা এসব অস্ত্র দিয়ে নিরপরাধ লোককে হত্যা করতে আরম্ভ করলো। এমনকি পার্লামেন্টের পাঁচ জন সদস্যকেও তারা হত্যা করলো। তবুও আমি শাসনতন্ত্র দিয়ে নির্বাচন দিলাম। কিন্তু যদি বাংলার জনগণ নির্বাচনে আমাকেই ভোট দেয়, সেজন্য দোষ আমার নয়। ৩১৫ জন সদস্যের মধ্যে ৩০৭ সিট বাংলার মানুষ আমাকে দিলো। কিন্তু একদল লোক বলে, কেন জনগণ আমাকে ক্ষমতা দিলো?’
দেশে তখন চার দিকে হাহাকার। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের দুর্বল অর্থনীতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের কর্তব্য মানুষকে বাঁচানো। চার দিকে হাহাকার, স্বাধীনতা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুনিয়ার সব জিনিসের দাম আস্তে আস্তে বেড়ে গেলো। সব দুনিয়া থেকে আমাদের কিনতে হয়। খাবার কিনতে হয়, কাপড় কিনতে হয়, ওষুধ কিনতে হয়, তেল কিনতে হয়। আমরা তো কলোনি ছিলাম। দুশ’ বছর ইংরেজদের কলোনি ছিলাম। ২৫ বছর পাকিস্তানের কলোনি ছিলাম। আমাদের তো সবকিছুই বিদেশ থেকে কিনতে হয়। কিন্তু তার পরেও বাংলার জনগণ কষ্ট স্বীকার করে কাজ করতে আরম্ভ করেছেন। কিন্তু তারা এগোবার দেয় না, কাজ করতে দেয় না। আর একদল বিদেশে সুযোগ পেলো, তারা বিদেশ থেকে অর্থ এনে বাংলার মাটিতে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করলো। স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করলো। আজ এই দিনে কেন বলছি একথা। অনেক বলেছি, এত বলার দরকার ছিল না।’
বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট উত্তর দেন— কেন সিস্টেম পরিবর্তন করলেন? তিনি বলেন, ‘সিস্টেম পরিবর্তন করেছি দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য। সিস্টেম পরিবর্তন করেছি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য। কথা হলো— এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যে, অফিসে গিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে যায়, সাইন করিয়ে নেয়, ফ্রি-স্টাইল। ফ্যাক্টরিতে যেয়ে কাজ না করে টাকা দাবি করে। সাইন করিয়ে নেয়। যেন দেশে সরকার নেই। স্লোগান হলো— বঙ্গবন্ধু কঠোর হও। বঙ্গবন্ধু কঠোর হবে। কঠোর ছিল, কঠোর আছে। কিন্তু দেখলাম, চেষ্টা করলাম। এত রক্ত, এত ব্যথা দুঃখ। দেখি কী হয়, পারি কিনা। আবদার করলাম, আবেদন করলাম, অনুরোধ করলাম, রিকোয়েস্ট করলাম, কামনা করলাম, কথা শুনে না। চোরা নাহি শুনে ধর্মের কাহিনি।’
বঙ্গবন্ধু কীভাবে দেশের মানুষের জীবনমানে পরিবর্তন আসবেন সেজন্য দুর্নীতি বন্ধ করতে, কৃষি উৎপাদন দ্বিগুণ করতে, দেশ গড়ার কাজে মনোনিবেশ করতে বারবার ডাক দেন। তিনি বলেন, ‘আমি চাই বাংলাদেশের প্রত্যেক কৃষক ভাইয়ের কাছে, যারা সত্যিকার কাজ করে। যারা প্যান্ট পরা, কাপড় পরা ভদ্রলোক তাদের কাছেও চাই— জমিতে যেতে হবে, দ্বিগুণ ফসল করুন। প্রতিজ্ঞা করুন, আজ থেকে ওই শহীদদের কথা স্মরণ করে ডাবল ফসল করতে হবে। যদি ডাবল ফসল করতে পারি, আমাদের অভাব, ইনশাআল্লাহ হবে না। ভিক্ষুকের মতো হাত পাততে হবে না। আমি পাগল হয়ে যাই চিন্তা করে। এ বছর ’৭৫ সালে আমাকে ৬ কোটি মণ খাবার আনতে হবে। কী করে মানুষকে বাঁচাবো?’
বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব নিয়ে বই লিখেছেন সুভাষ সিংহ রায়। তিনি বলেন, ‘‘বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব নিয়ে এখন আর তেমন কথা হয় না। কিন্তু এটি ছিলও শ্রেষ্ঠ একটি পরিকল্পনা। বঙ্গবন্ধু শোষিতের গণতন্ত্র চেয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক অনেক সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘আমি শোষিতের পক্ষে।’ এর মর্ম কথা উপলব্ধি করতে পারলে, বাকশাল নিয়ে কথা বলতে কারোর সমস্যা হওয়ার কথা না। আমি মনে করি, বাকশাল কোনও দল নয়, এটি একটি প্ল্যাটফর্ম। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা, কৃষিভিত্তিক সমাজ ববস্থাপনা, শিক্ষা, সব জায়গায় পরিবর্তনের যে ছোঁয়া আনতে চেয়েছিলেন, সেটা ছিল মানুষকে নিয়ে মানুষনির্ভর। তিনি কমিউনিস্ট না, কিন্তু নিজেকে একজন সমাজতান্ত্রিক হিসেবেই দেখতেন, যে কিনা মানুষকে দেখতেন মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে। এটাই বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব— যেখানে তিনি প্রশাসনিক ব্যবস্থাতেও আমূল পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন।’’









