X
শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪
১৭ ফাল্গুন ১৪৩০

গেরিলা যুদ্ধ কী, গেরিলা কারা?

উদিসা ইসলাম
০৯ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৮:০০আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৮:০০

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্রে বলা আছে, গেরিলা যুদ্ধের মূলমন্ত্র আত্মসংযম-জ্ঞান-তিতিক্ষা-কষ্ট-সহিষ্ণুতা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের একটা বড় অংশই ছিল গেরিলা যুদ্ধ। গেরিলা যোদ্ধারা বলছেন, ‘হিট অ্যান্ড রান’ পদ্ধতিতে তারা গেরিলা কায়দায় অপারেশনে যেতেন। যুদ্ধে গেরিলা নীতি হলো বিকল্প নীতি। যার জন্য বন্দুকের পরিবর্তে প্রচার চাই, বিমানের পরিবর্তে চাই বিধ্বংসী ক্রিয়া, অস্ত্র শিল্পের পরিবর্তে চাই রাজনৈতিক শিক্ষা এবং মেশিনের পরিবর্তে মানুষ। গেরিলারা শুধু যুদ্ধের খাতিরেই যুদ্ধ করেন না, সঙ্গে তারা জনগণকে অনুপ্রাণিত করেন, সংগঠিত করে সশস্ত্র করে তোলেন এবং বৈপ্লবিক রাজনৈতিক শক্তির প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করেন।

স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রে ১ নম্বর সেক্টরের নথি সন্নিবেশিত আছে। যেখানে গেরিলা যুদ্ধ বিষয়ে ইশতেহার হিসেবে দেওয়া আছে। সেখানে বলা আছে, ১৮০৭ সালের আগে গেরিলা যুদ্ধরীতি একটি সহজ যুদ্ধরীতি হিসেবে সামরিক অভিযানে স্বীকৃত হয়নি। ওই বছর নেপোলিয়ানের ফরাসি সৈন্যরা স্পেনের সাইবেরীয় প্রণালি আক্রমণ করলে সেখানকার স্বল্প সংখ্যক অনিয়মিত সৈন্যদল এই কৌশলে যুদ্ধ করে। স্পেনের ভাষায় ‘গুয়েরিলা’ শব্দের অর্থ হলো ছোট যুদ্ধ বা খণ্ড যুদ্ধ।

ভাষা ও সংস্কৃতি গেরিলা যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই দুটি বিষয়ই পরিবেশের অন্তর্গত। গেরিলা বাহিনী যে অঞ্চলে কাজ করে, সেখানকার অধিবাসীরা যদি তাদের ভাষা না বোঝেন তাহলে যুদ্ধের কাজ ভালোভাবে চলতে পারে না। কারণ, স্থানীয় জনগণের সহায়তা ছাড়া এ যুদ্ধ কোনোমতেই চলতে পারে না। ভাষাগত ব্যবধান এ ব্যাপারে অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে। স্থানীয় জনগণের সংস্কৃতি ও ভাবধারা গেরিলা যুদ্ধের অনুকূল হওয়া চায়। স্থানীয় জনসাধারণ যদি কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং তাদের মনোভাব যদি অতীতাশ্রয়ী বা ঐতিহ্যাশ্রয়ী হয়, তাহলে তারা গেরিলা যুদ্ধের বৈপ্লবিক রীতিটাকে মেনে নাও নিতে পারে। তার মানে, এ যুদ্ধ কেন হচ্ছে এবং তার রাজনৈতিক লক্ষ্য কী; সে বিষয়ে জনগণকে ভালোভাবে বোঝাতে হয়।

আবার যেখানে জনগণের কাছ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন পাওয়া যায় না, সেখানে গেরিলাদের কঠোর হতে হবে বলেও ইশতেহারে উল্লেখ করা আছে। বলা আছে, সেখানে ব্যাপক সন্ত্রাসবাদ সৃষ্টি করতে হবে। এর ফলে জনগণ না চাইলেও ভয়ে গেরিলাদের সমর্থন করে।

যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সবসময় জনসমর্থনকে জোর দিয়ে দেখা হয়। যুদ্ধের জন্য অস্ত্র প্রয়োজন। কিন্তু অস্ত্রই সব কথা নয়, শুধু অস্ত্র দিয়েই যুদ্ধ জেতা যায় না। যুদ্ধ করে মানুষ, যুদ্ধের জন্য চাই ব্যাপক জনসমর্থন। জনগণের মন সহানুভূতিশীল। সুতরাং শত্রুদের জমকালো অস্ত্রশস্ত্র ও সৈন্যসংখ্যা দেখে ঘাবড়ে গেলে চলবে না। কোনও যুদ্ধের ক্ষেত্রে কার কত সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি আছে, তা শুধু দেখলে চলবে না। দেখতে হবে কোন পক্ষে কত লোকবল আছে। আর দেখতে হবে, সেসব লোকের মনোবল কতখানি।

একাত্তরে বাঙালি জাতির যুদ্ধ জয়ের অন্যতম হাতিয়ার ছিল গেরিলা যুদ্ধ। পাকিস্তানি সৈন্যদের কুপোকাত করতে মোক্ষম ভূমিকা রেখেছিল যুদ্ধের বিশেষ এই কৌশল। গেরিলা যোদ্ধা তাদের বলা হয়, যারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে শত্রুদের বিপর্যস্ত করে তুলতো। যুদ্ধের সময় প্রত্যেকটি গেরিলা ঘাঁটি পরিচালিত হতো অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে। ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর দিল্লিতে বাংলাদেশ মিশনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মিশন প্রধান হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী বলেন, ‘আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ঢাকা মুক্ত হবে। ঢাকার পতনের মধ্য দিয়ে আমাদের মাতৃভূমি হানাদার শত্রুদের কবল থেকে মুক্ত হবে।’

এদিন লোকসভার অধিবেশনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যুদ্ধবিরতি এবং সৈন্য অপসারণের জন্য জাতিসংঘ যে অবাস্তব প্রস্তাব দিয়েছে, ভারত তাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আমরা জাতীয় উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছি। এতদিন আমাদের ওপর আঘাত এসেছে, এবার আমরাও পাল্টা আঘাত করছি।’

তখন ঢাকায় ও ঢাকার বাইরে গেরিলারা অপেক্ষা করছিলেন। তাদের যুদ্ধকৌশল কেমন ছিল প্রশ্নে গেরিলা যোদ্ধা নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, শত্রুর শক্তি খর্ব করার জন্য যেকোনও সুযোগের সদ্ব্যবহার করাই হলো গেরিলাদের রীতি। তবে তারা নিয়মিত যুদ্ধের কলাকৌশলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। গেরিলা যুদ্ধে রক্ষণশীলতার কোনও সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, ‘শহীদ মানিক ছিলেন আমাদের দলের কমান্ডার এবং আমি ছিলাম সহ-কমান্ডার। আমাদের এই দলটি ঢাকায় বেশ কিছু সফল অপারেশন পরিচালনা করে। কখনও আমরা পাকিস্তানি বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেছি, আবার কখনও নিজেরা কৌশলগত কারণে পিছু হটেছি। তবে আমরা তখন বেশ কিছু সফল অপারেশন করতে সমর্থ হই। এর মধ্যে বায়তুল মোকাররম অপারেশন, কাকরাইল পেট্রোলপাম্প অপারেশন, মালিবাগ রেললাইন অপারেশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপারেশন উল্লেখযোগ্য। আমাদের নিয়মিত অপারেশনগুলোর মধ্যে ছিল ঢাকার বিভিন্ন স্কুল-কলেজে পাকিস্তান বাহিনীর ক্যাম্পগুলোতে গেরিলা আক্রমণ করা।’

/ইউএস/এমওএফ/
সম্পর্কিত
অগ্নিঝরা মার্চের প্রথম দিন আজ
‘৩০ লাখ শহীদের বিষয়টি ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে লিপিবদ্ধ হলো’
মেলায় বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অর্ধশতাধিক বই, আগ্রহ গবেষকদের
সর্বশেষ খবর
বেইলি রোডে নিহতদের মধ্যে ভোলার চার জন
বেইলি রোডে নিহতদের মধ্যে ভোলার চার জন
বিপিএলে কে কত টাকা পুরস্কার পেলেন
বিপিএলে কে কত টাকা পুরস্কার পেলেন
জিহাদের গ্রামের বাড়িতে মাতম
জিহাদের গ্রামের বাড়িতে মাতম
পুড়ে মারা গেলো মেহেদী, ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরলো বড় ভাই ইসরাফিল
পুড়ে মারা গেলো মেহেদী, ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরলো বড় ভাই ইসরাফিল
সর্বাধিক পঠিত
দুই ছেলের আবদার মেটাতে গিয়ে লাশ হলেন মা’সহ ৩ জনই
দুই ছেলের আবদার মেটাতে গিয়ে লাশ হলেন মা’সহ ৩ জনই
আগুন কেড়ে নিলো ইতালি প্রবাসী মোবারকের পরিবারের সবাইকে
আগুন কেড়ে নিলো ইতালি প্রবাসী মোবারকের পরিবারের সবাইকে
বেইলি রোডের আগুনে অন্তত ৪৪ জনের মৃত্যু
বেইলি রোডের আগুনে অন্তত ৪৪ জনের মৃত্যু
নতুন ৭ প্রতিমন্ত্রী: কে কোন দফতরে
নতুন ৭ প্রতিমন্ত্রী: কে কোন দফতরে
তুরস্কের কাছে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বিক্রির সিদ্ধান্তে অটল যুক্তরাষ্ট্র
তুরস্কের কাছে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বিক্রির সিদ্ধান্তে অটল যুক্তরাষ্ট্র