বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সামনে এগুতে চায় বাংলাদেশ বিমান। ১৯৬০ সাল হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিশ্বে এভিয়েশন সেক্টরে বিপুল উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। কিন্তু তার সঙ্গে তাল মেলাতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ বিমান। আন্তর্জাতিক রুটে মানসম্মত সেবা দিতে ব্যর্থ বাংলাদেশ বিমান সমালোচনার মুখে পড়েছে সবসময়। বিমানের লোকসান টানতে টানতে অনেকটাই ক্লান্ত কর্তৃপক্ষ। দেশি বিদেশি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গড়ে তোলা ব্যবস্থাপনায় লোকসান কমানো যায়নি কখনও, প্রসারিত হয়নি সেবা কার্যক্রম। কখনও মন্ত্রী,কখনও সচিব,কখনও পরিচালনা বোর্ড, আবার কখনও নানা অজুহাতে কর্মকর্তা কর্মচারিদের যৌক্তিক বা অযৌক্তিক দাবি আদায়ের নামে গড়ে ওঠা আন্দোলন বা শ্রমিক ইউনিয়নের কর্মকাণ্ড লোকসান কমানো ও মানসম্মত সেবার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই অবস্থায় বিশ্বব্যাপী বিমানের উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ বিমানকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১৯৬০ সালের বেসামরিক বিমান চলাচল আইনটি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি বেসামরিক বিমান চলাচল আইনটি পরিবর্তন করে বেসামরিক বিমান চলাচল আইন-২০১৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদন হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, আইনগত জটিলতায় এতোদিন অনেক কিছুই করা যায়নি। সেই ১৯৬০ সালের পুরোনো আইন দিয়ে ২০১৬ সালের নতুন ও বাস্তবধর্মী সেবা দেওয়া যায় না। আইনটি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতসহ জাতীয় সংসদে আইনটি পাশ হলে নতুন উদ্যোমে চলবে বাংলাদেশ বিমান। আশা করছি তখন সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বিমানের আয় ও সেবা উভয়টাই বাড়বে। এক প্রশ্নের জবাবে রাশেদ খান মেনন বলেন, নতুন আইনটি সর্বক্ষেত্রেই বিমানকে পরিবর্তনে সহায়ক হবে।
আরেক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, আইনটি পাশ হওয়ার মাধ্যমে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের চাহিদার বাস্তবায়ন ঘটবে। নতুন আইনটি সময়ের পরিবর্তিত চাহিদা পূরণ করবে। সাম্প্রতিক সময়ে সারা বিশ্বে এভিয়েশন সেফটি সংক্রান্ত উদ্বেগ দূর করতে এ আইন কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করেন বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন।
জানা গেছে, ১৯৬০ সালের অধ্যাদেশে ধারা ছিল ১৯টি। প্রস্তাবিত আইনে ধারা রাখা হয়েছে ৪৪টি। বেসামরিক বিমান চলাচল আইন, ২০১৬ এর খসড়া প্রণয়নের ক্ষেত্রে ১৯৬০ সালের অধ্যাদেশের প্রয়োজনীয় ধারাসমূহ বহাল রেখে যুগপোযোগী ও হালনাগাদসহ প্রধান প্রধান কিছু বিষয় সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে বিমানের উন্নয়ন করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নতুন আইন অনুযায়ী বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারের বিধি প্রণয়নের ক্ষেত্র সম্প্রসারণে ফ্লাইটে নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিয়োগের বিধান, বিমান দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তি এবং তার পরিবারকে সহায়তা প্রদান, বেসামরিক বিমান হিসাবে রাষ্ট্রীয় বিমানের ব্যবহার, বেসামরিক বিমান চলাচল ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য বেআইনি আচরণের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা প্রদান, বেসামরিক বিমান পরিবহনে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। যা আগে সম্ভব ছিল না।
শিকাগো কনভেনশনের পরিশিষ্টসমূহ ও সংশ্লিষ্ট আইসিএও এবং আন্তর্জাতিক ডকুমেন্ট এ বর্ণিত মানদণ্ড এবং তার সংশোধনী বাস্তবায়ন সংক্রান্ত এএনও (এয়ার নেভিগেশন অর্ডার) জারি, সংশোধন ও অব্যাহতি প্রদান, নির্দেশাবলী এবং সার্কুলারের কার্যকারিতা সংক্রান্ত বিষয়ে নতুন বিধান সংযোজন করা হয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ইন্সপেক্টর যাতে বাংলাদেশের যে কোনও এয়ারলাইন্স, অপারেটর, অন্যান্য সেবা প্রদানকারী সংস্থার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করাসহ বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি এয়ারলাইন্সের বিমান পরিচালনা পরিদর্শন করতে পারে সে লক্ষ্যে উক্ত সংস্থাসমূহ ও বিমান পরিদর্শনের জন্য প্রবেশের অধিকার নিশ্চিত করাসহ প্রয়োজনীয় পরিদর্শন ও পরবর্তী কার্যক্রমের ক্ষমতা প্রদান সংক্রান্ত ২টি নতুন ধারা সংযোজন করা হয়েছে।
কোনও প্রয়োজনে বিদেশি কোনও রাষ্ট্র থেকে কোনও বিমান লিজের মাধ্যমে বাংলাদেশে আনা হলে অথবা বাংলাদেশ হতে কোনও বিমান লিজের মাধ্যমে অন্য কোনও বিদেশি রাষ্ট্রের বিমান সংস্থা কর্তৃক ব্যবহৃত হলে উক্ত বিমানের সেফটি ওভারসাইট রেসপনসিবিলিটি কোন রাষ্ট্রের আওতাভুক্ত থাকবে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে দুই রাষ্ট্রের অ্যারোনটিক্যাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে সেফটি ওভারসাইট রেসপনসিবিলিটি বিনিময় বিষয়ক দ্বি-পাক্ষিক চুক্তি করা আইসিএও’র বিধান অনুসারে অত্যাবশ্যক। উক্ত বিষয়টি নিশ্চিত করতে একটি নতুন বিধান সংযোজন করা হয়েছে । যা আগে ছিল না।
বেসামরিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে, প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট ব্যতীত বা সার্টিফিকেটের শর্ত লঙ্ঘন করে বিমান পরিচালনা, এয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন, বিমান সংস্থা পরিচালনা, স্কুল বা রক্ষণাবেক্ষন সংস্থা পরিচালনার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার বিধান রেখে একটি নতুন ধারা সংযোজন করা হয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল সংক্রান্ত আইন, বিধি, প্রবিধান, এএনও প্রদত্ত সার্টিফিকেটের কোনও শর্ত প্রতিপালনে ব্যর্থ কোনও ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দণ্ড প্রদানের উদ্দেশ্যে বর্তমান অধ্যাদেশের বিধানটিকে আরও সমৃদ্ধ ও সুস্পষ্টকরণ করে নতুন ধারা সংযোজন করা হয়েছে। যেমন কর্তৃপক্ষের আদেশ লঙ্ঘনের ঘটনার দণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে ঘটনার প্রকৃতি, পারিপার্শ্বিকতা, ব্যাপ্তি ও গুরুত্ব এবং লঙ্ঘনকারী ব্যক্তির অতীত অপরাধ, আর্থিক সক্ষমতা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করার বিধান রাখা হয়েছে।
তা ছাড়া অর্থ দণ্ডের পরিমাণ প্রতি চার বছর অন্তর মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করারও বিধান রাখা হয়েছে। যা আগে করার সক্ষমতা ছিল না।
ইচ্ছাকৃতভাবে বিমানের মাধ্যমে অবৈধভাবে বাংলাদেশের আকাশসীমায় অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৭ বছর ও সর্বনিম্ন ৩ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং ন্যূনতম ২ কোটি টাকা অর্থ দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। বিপজ্জনক পদ্ধতিতে বিমান পরিচালনার দোষে দায়ী ব্যক্তিকে বিদ্যমান অনধিক এক বছরের কারাদণ্ডসহ ৫ হাজার টাকা অর্থ দণ্ড বাড়িয়ে অনধিক ৫ বছরের কারাদণ্ডসহ ন্যূনতম ১ কোটি টাকা অর্থ দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল ক্ষেত্রে সকল অপারেটর, সেবা প্রদানকারী সংস্থা ও এয়ারম্যানের দায়িত্ব যেমন-বেসামরিক বিমান চলাচলে ব্যবহৃত সকল অবকাঠামো ও ইকুইপমেন্ট পরিদর্শন, রক্ষণাবেক্ষণ, ওভারহোল ও মেরামত করা, লাইসেন্স বা সর্টিফিকেটের শর্ত প্রতিপালন করা, এএনও অনুসারে কার্যাদি সম্পাদন, আশপাশে বিপজ্জনক পণ্যের নিরাপদ পরিবহন সম্পর্কিত আইসিওএ’র টেকনিক্যাল নির্দেশনা অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ ইত্যাদিসহ জনসাধারণের দায়-দায়িত্ব যেমন-এই আইন বা তদাধীন প্রণীত বিধি বা এএনও, নির্দেশাবলী, সার্কুলার কার্যকর থাকা পর্যন্ত মেনে চলা সম্বলিত দু’টি পৃথক ধারা সংযোজন করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদে নতুন আইন পাশ হওয়া সম্পর্কে রাশেদ খান মেনন বলেছেন, আশা করছি আগামী বাজেট অধিবেশনেই ‘বেসামরিক বিমান চলাচল আইন,২০১৬’ পাশ হতে পারে।
/এসআই/ এমএসএম/আপ-এআর/








