অডিও সাক্ষাৎকারের পর এবার বাংলা ট্রিবিউনকে ভিডিও সাক্ষাৎকার দিয়েছেন পাকিস্তানি ক্রিকেট সমর্থক বশির আহমেদ ওরফে বশির চাচা। তিনি আবারও বলেছেন, আমাকে কেউ হেনস্তা করেনি এবং খেলায় বাংলাদেশ জেতার পর আমি নিজেই সেদিন বাংলাদেশের পতাকা গায়ে জড়িয়েছিলাম, কেউ আমাকে জোর করেনি। যারা আমাকে হেনস্তার খবর প্রচার করেছেন তারা আসলে আসল ঘটনা না জেনে অপপ্রচার করেছেন, এমনকি কেউ ঘটনা জানার জন্য আমার সঙ্গে কথাও বলেনি একমাত্র বাংলা ট্রিবিউন ছাড়া। বিষয়টি আমাকে আহত করেছে।
গতকাল শনিবার বাংলা ট্রিবিউন বশির আহমেদের অডিও সাক্ষাৎকার প্রচার হবার পর সেটি নিয়ে অনেকেই সন্দেহ এবং সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তাদের সন্দেহ এবং সংশয় দূর করার জন্যই বাংলা ট্রিবিউনের এবারের ভিডিও সাক্ষাৎকার।
বশির আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে এইবার নিয়ে আমি তিনবার এলাম।কিন্তু কখনও বাংলাদেশের কেউ আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেনি,যতোবার আসি ততোবার এই একই হোটেলে থাকি। এখানকার সবাই আমার পরিচিত, বাংলাদেশের সবাইকে নিয়ে আমি খুবই হ্যাপী, বাংলাদেশের মানুষ খুবই ভালো। দু’একজন খারাপ হতেই পারে তার মানে এই না যে, এখানকার সবাই খারাপ। আমি কখনও মিথ্যা বলিনা, এখনও মিথ্যা বলবো না। আর মিথ্যা বলার দরকারও নেই। আমার সঙ্গে সেদিন স্টেডিয়ামে অপ্রীতিকর কিছুই হয়নি এবং আমাকে জোর করে কেউ বাংলাদেশের পতাকা পরাননি। বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে এভাবেই নিজের কথা জানালেন পাকিস্তানি নাগরিক বশির আহমেদ, যিনি সবার কাছে বশির চাচা নামে পরিচিত।
মিরপুরের প্রিন্স হোটেলে অবস্থানরত বশির আহমেদ যখন বাংলা ট্রিবিউনকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন, তখন সেখানে হাজির হন ভারতের সমর্থক সুধীর, যিনি এর আগে বাংলাদেশি সমর্থকদের দ্বারা শারীরিক হেনস্তার শিকার হয়েছিলেন বলে গণমাধ্যমে এসেছে। সেই সুধীরও বলেছেন, স্রেফ ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল এবং তাকে হেনস্তার সংবাদ গণমাধ্যমে এসেছে। তিনি বলেন, যেরকম সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে সেরকম সত্যিই যদি কিছু ঘটে থাকতো, তাহলে তিনি এরপর আর এখানে আসতেন না।
গত বুধবার এশিয়া কাপ টি টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ পাকিস্তান খেলা সমাপ্ত হওয়ার পরে পাকিস্তানি সমর্থক বশির আহমেদকে আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার উপস্থিতিতে শারীরিকভাবে হেনস্তা করার কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এই ঘটনায় তদন্তের দাবিও জানানো হয়। তবে যাকে নিয়ে এই ঘটনা সেই বশির আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, এ ধরনের কোনও ঘটনা তার সঙ্গে ঘটেনি, তিনি পাকিস্তানের সমর্থক, ৫৯ বছরের বৃদ্ধ, কয়েকবার তার বাইপাস সার্জারি হয়েছে এবং তিনি অসুস্থ থাকেন বেশিরভাগ সময়। এর মধ্যেও পাকিস্তানের খেলা যেখানেই হয় সেখানেই তিনি হাজির হন আমেরিকার শিকাগো থেকে। সেদিন পাকিস্তান হেরে যাওয়াতে তার কষ্ট হয় তারই প্রতিফলন হয়েছে ছবিগুলোতে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ, ভারতসহ যে কোনও দেশই হারুক না কেন, সেই দেশের সমর্থকরা কাঁদেন এবং সেই দৃশ্য টেলিভিশনে দেখানো হয়। তার মানে কি তাদেরকেও জোর করে কাঁদানো হয়ে থাকে। তাহলে কেন আপনাকে নিয়ে এই অপপ্রচার জানতে চাইলে তিনি বলেন, ছবিগুলো কে তুলেছেন, কেন তুলেছেন তিনি জানেন না। তবে যারা এগুলো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ এবং প্রচার করেছেন তারা কেউ তার সঙ্গে কথা বলেননি বলেও জানান তিনি।
সেদিনের ঘটনা সর্ম্পকে তিনি বলেন, কেউ কেউ বলছেন সেদিন ওখানে আমাকে হেনস্তা করা হয়েছে কিন্তু আমি বলতে চাই, নাথিং হ্যাপেন্ড, নাথিং হ্যাপেন্ড, নো বডি ফোর্সড মি, আফটার বাংলাদেশ উইন আই ক্যারিড বাংলাদেশ ফ্ল্যাগ, বলাথা বাংলাদেশ জিতেগা। আই টুক দি বাংলাদেশি ফ্ল্যাগ। কেউ কেউ বলছেন আমি কেঁদেছি, আমি বলতে চাই…আমি একজন পাকিস্তানি সমর্থক, আমি চেয়েছি পাকিস্তান জিতুক সেখানে পাকিস্তান হেরে গেছে আমারতো তখন কষ্ট হতেই পারে।
আজ সকালে আমার ছেলে ফোন করে আমাকে শিকাগোতে ফেরত যেতে বলেছে। আমি তাকে বলেছি কেন যাবো, এখানে কিছুই হয়নি, নো প্রবলেম, সামবডি গিভস ইউ রং ইনফরমেশন।
বশির আহমেদ বলেন, সেদিন গ্যালারিতে আমি চিৎকার করছিলাম জিতে গা ভাই জিতে গা, তখন পাশ থেকে বাংলাদেশিরা বলেছে বাংলাদেশ জিতেগা, আমি বলেছি পাকিস্তান জিতেগা। আমরা পাশাপাশি বসে, চিৎকার করে নিজ দেশের সমর্থন দিয়েছি।যখন বাংলাদেশ জেতে তখন অনেকেই বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে ভেতরে যায়, আমিও পাকিস্তানের পতাকা নিয়ে ভেতরে যেতে চেয়েছি, তখনিই একজন ফটোগ্রাফার আমাকে বলেছে, রিমুভ ইউ, রিমুভ। আমি বলেছি হোয়াই, অ্যাট দ্যাট টাইম আই ফিল ব্যাড। আদারওয়াইজ বাংলাদেশি পিপল আর ভেরি গুড।
আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ১৯৭১ সালে আমি খুবই ছোট ছিলাম। তারপরও তখন বাংলাদেশে যা হয়েছে আমি তার জন্য অত্যন্ত দুঃখিত। আল্লাহ তায়ালা তার জন্য পাকিস্তানকে শাস্তিও দিচ্ছেন। পাকিস্তানে এখন নানাবিধ সমস্যা। আমি বাংলাদেশের মানুষকে বলতে চাই, আমাকে মাফ করে দাও, আমি স্যরি।
তিনি বলেন, আমি ভারতীয় ক্রিকেট তারকা ধোনিকে ভালবাসি, পাকিস্তানকে ভালবাসি কারণ সেখানে আমার জন্ম। একইসঙ্গে আমি বাংলাদেশকেও ভালবাসি।
বশির আহমেদের সাক্ষাৎকার গ্রহণকালে সেখানে উপস্থিত হন ভারতীয় সমর্থক সুধীর এবং বাংলাদেশি সমর্থক শোয়েব আলী, যিনি টাইগার শোয়েব নামে পরিচিত।
অভিযুক্ত সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা সর্ম্পকে বশির আহমেদ বলেন, তিনি সেখানে বসে ছিলেন কিন্তু তিনি আমাকে কিছু বলেননি এবং এর সঙ্গে তার কোনও সর্ম্পক নেই। আদতে সেখানে কিছু ঘটেও নি। আই লাভ আমজাদ ভাই, আই লাভ বিসিবি ডিরেক্টর ববি ভাই, তিনি আমাকে সবসময় টিকিট দেন, সবসময় আমার খোঁজ নেন।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, আমি চাই বাংলাদেশ -ভারত- পাকিস্তান সবাই সবাইকে ভালবাসবে, আর যুদ্ধ কেন। এই যুদ্ধের অবসান হোক।
ভিডিও সাক্ষাৎকারটি দেখুন—
ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
ভিডিও: জাকিয়া আহমেদ
এপিএইচ/








