নারীর ক্ষমতায়ন ঘটার সময় প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতা, যাতে সমাজের পুরুষদের মধ্যে কোনও ভুল তথ্য না যায় এবং শত্রু ভাবাপন্ন হয়ে না ওঠে। নারী গবেষক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, এইটুকু সচেতনতা না থাকলে হিতে বিপরীত ঘটতে পারে। বড় বড় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে নারীদের শুধু বসিয়ে দিলেই চলবে না, পরিবারেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এবং সুযোগ বাড়ানোর মধ্য দিয়ে লিঙ্গবৈষম্য কমিয়ে এনেছে বাংলাদেশ। এমনকি নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বিশ্বের শীর্ষ দশেও উঠে এসেছে বাংলাদেশ। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডাব্লিউইএফ) ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০১৫’ সালের প্রতিবেদন বলছে- মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে ৭ শতাংশ নারী দায়িত্ব পালন করছেন। গত ২২ বছর ধরে বাংলাদেশে নারীরা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৪’-তে এ চিত্র ফুটে উঠেছে। ওই বছরের সূচকে বিশ্বের ১৪২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬৮তম স্থানে উঠে এসেছে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৭৫তম।
এছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অর্থনীতি, রাজনীতির ক্ষেত্রে নারীর অবদান ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে। পাশাপাশি সামরিক বাহিনী, পুলিশ, আইটি বিশেষজ্ঞ, ড্রাইভিংসহ বিভিন্ন অপ্রচলিত ও টেকনিক্যাল পেশায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, সামাজিক অবস্থানে, সম্পত্তি ভোগের ক্ষেত্রে বা প্রকৃত অর্থে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে এখন পর্যন্ত নারী-পুরুষে সমতা আসেনি। এবারের প্রতিপাদ্য কেবল সমতা নয়, কয়েক বছর ধরে সমতা নিয়েই কাজ করা হচ্ছে কিন্তু একইসঙ্গে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন নারী। দীর্ঘদিন ধরে সরকারপ্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নারী, তবে সাধারণ নারীরা আসলেই কতটুকু ক্ষমতায়িত হচ্ছে সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, নারীর ক্ষমতায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হচ্ছে রাজনীতি। নারীকে আরও বেশি ক্ষমতায়িত করতে হলে রাজনীতিতে নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
যদিও গতবছর মার্চে রাজনীতিতে লৈঙ্গিক বৈষম্য কমিয়ে আনার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘উইমেন ইন পার্লামেন্টস (ডব্লিউআইপি) গ্লোবাল ফোরাম’ এর সম্মানসূচক ‘ডব্লিউআইপি ২০১৫’ পদক পেয়েছে বাংলাদেশ। রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য ‘দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া’ আঞ্চলিক বিভাগে বাংলাদেশকে এ পদক দেওয়া হয়েছে।
দেশে নারীর ক্ষমতায়ন বাড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগের প্রশংসা করছেন নারীনেত্রীরা। তারা বলছেন, দেশে এক সময় নারীকে ঘরের ভেতর আবদ্ধ করে রাখা হতো্। আজ নারী প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধী দলীয় নেত্রী থেকে হাইকোর্টের জজ, এমনকি বিমান চালাচ্ছেন নারী। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নারী। নারীদের সবখানে গুরুত্ব সহকারে কাজ করার জন্য ব্যাপক পরিবর্তন আনছেন বর্তমান সরকার।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে বলেন, ক্ষমতায়নকে সামগ্রিকভাবে না দেখে একটি কর্নার থেকে দেখতে চাইলে এর মূল অর্থ বোঝা যাবে না। নারীরা শিক্ষায়, কর্মক্ষেত্রে যেমন এগিয়েছে তেমনই দেশের গড় মাথাপিছু আয় বেড়েছে। তৃণমূলের যে নারী একসময় ঘরের বাইরে বের হওয়ার কথা চিন্তা করতে পারতেন না, সেই নারী এখন বাজারে পণ্য বিক্রি করছেন। এসব নিয়ে উচ্ছ্বাস যেমন থাকবে তেমন সতর্ক থাকারও দরকার আছে, যাতে সমাজের অর্ধেক পুরুষ এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকতে পারে, নিজেকে যেন বিচ্ছিন্ন না ভাবে।
নিজের রাজনীতিতে আসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনৈতিকভাবেও নারীরা ক্ষমতায়িত হচ্ছে। প্রথমবার যখন সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হলাম তখন মনের মধ্যে ভয় কাজ করতো। অনেকে ধরেই নিয়েছিলেন এটা সাময়িক, হয়তো পরিবারের অন্য পুরুষরা এরপরে আসবেন। কিন্তু দৃশ্যপট বদলে গেছে। তাই রাতারাতি সবকিছু পাল্টে যাবে সেটা যেমন ভাবা ঠিক হবে না, তেমন বদলে যাওয়া বিষয়গুলোকে চর্চায় না রাখলে বিপদ আসতে পারে।
/এএইচ/এপিএইচ/








