প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈঠক করবেন আগামী ২৩ মার্চ। সেই বৈঠক থেকে দুই প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইন্টারনেট ব্যান্ডউডথ রফতানি ও ভারত থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানি কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন। এ জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোয় ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে।
আমদানিকৃত ব্যান্ডউইথ দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর চাহিদা মেটানো হবে। ব্যান্ডউইথ রফতানি করে বাংলাদেশের আয় হবে বছরে প্রায় সাড়ে ৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে বাংলাদেশ নিয়ে আসছে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এই বিদ্যুৎ দিয়ে কুমিল্লা অঞ্চলের চাহিদা মেটানো হবে।
এ খবর নিশ্চিত করেছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শওকত মোস্তফা। তিনি বলেন, আমাদের অনেক ব্যান্ডউইথ অব্যাহৃত থাকছে। ভারতে রফতানি করা হলেও আমাদের দেশের অসুবিধা হবে না। তিনি বলেন, চীন, মিয়ানমার ও ভুটানও বাংলাদেশ থেকে ব্যান্ডউইথ নিতে চায়। এ ব্যাপারে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। একই দিনে বিদ্যুৎ আমদানির খবরও নিশ্চিত করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা।
জানা গেছে, সম্প্রতি বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল) এবং ভারত সঞ্চার নিগম লিমিটেড (বিএসএনএল)-এর মধ্যে তিন বছরের জন্য ব্যান্ডউইথ রফতানির চুক্তি সই হয়েছে। এই চুক্তি অনুযায়ী ১০ জিবিপিএস (গিগাবাইট পার সেকেন্ড) ব্যান্ডউইথ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ভারতে সরবরাহ করা হবে।
ব্যান্ডউইথ রফতানির প্রস্তাবটি বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার অনুমোদন পায় গত বছর ২০ এপ্রিল। ওইদিন মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা জানান, ব্যান্ডউইথ রফতানি বাবদ বাংলাদেশ পাবে বছরে এক দশমিক দুই মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা)। চুক্তি অনুসারে ভারতের চাহিদা অনুযায়ী ব্যান্ডউইথ রফতানির পরিমাণ সর্বোচ্চ ৪০ জিবিপিএস পর্যন্ত করা যাবে। রফতানি করা ব্যান্ডউইডথের মূল্য হার দেশের বাজারের তুলনায় এমবিপিএস (মেগাবাইট পার সেকেন্ড) প্রতি মাসিক ২-৩ মার্কিন ডলার বেশি।
সাগরতল দিয়ে আসা বাংলাদেশের একমাত্র সাবমেরিন কেবল 'এসইএ-এমই-ডব্লিউই-৪' (সাউথ ইস্ট এশিয়া-মিডল ইস্ট-ওয়েস্ট ইউরোপ)-এর ল্যান্ডি স্টেশন কক্সবাজারে। এখান থেকে মাটির নিচ দিয়ে ফাইবার অপটিক ক্যাবলের মাধ্যমে তা ঢাকা পর্যন্ত এসেছে। চুক্তি অনুযায়ী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাছে দিয়ে আসা ফাইবার অপটিক ক্যাবল থেকে সংযোগ নিয়ে আখাউড়া সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হবে। এরপর ভারতের ত্রিপুরার আগরতলা দিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে যাবে এ ব্যান্ডউইথ।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্তমানে 'এসইএ-এমই-ডব্লিউই-৪'-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ পাচ্ছে ২০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ। এখান থেকে মাত্র ৩০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ ব্যবহার হয়। বাকিটা অব্যবহৃত থাকে। এ বছর ডিসেম্বরে 'এসইএ-এমই-ডব্লিউই-৫'-এর আওতায় আরও ১৩০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তখন বাংলাদেশের ক্ষমতা দাঁড়াবে দেড় হাজার জিবিপিএসে।
ভারত নিজ দেশ থেকে না নিয়ে বাংলাদেশ থেকে কেন ব্যান্ডউইথ নিচ্ছে?—এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, ভারত যদি তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোয় ইন্টারনেট সেবা বাড়াতে চায় তাহলে মুম্বাই থেকে ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করতে হবে। এতে তাদের ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। অতিরিক্ত ব্যয় এড়াতেই বাংলাদেশ থেকে ব্যান্ডউইথ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। এতে দুই দেশেরই লাভ হলো।
অন্য একটি চুক্তির আওতায় ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করছে বাংলাদেশ। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পালাটানা উৎপাদন কেন্দ্র থেকে আগরতলা-আখাউড়া সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে আসবে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এ বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম ধরা হয়েছে ৬ টাকা ৪৩ পয়সা।
জানা গেছে, ভারতের পালটনা থেকে আগরতলা সীমান্ত পর্যন্ত গ্রিড লাইন স্থাপন করেছে ভারত। আগরতলার এপাড়ে আখাউড়ার সীমান্ত থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত ৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ৪০০ কেভির গ্রিড লাইন স্থাপন করেছে বাংলাদেশের পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেড-পিজিসিবি। ‘ত্রিপুরা (ভারত)-কুমিল্লা দক্ষিণ (বাংলাদেশ) গ্রিড ইন্টারকানেকশন প্রজেক্ট’র আওতায় এ লাইন স্থাপন করা হয়েছে। এ সঞ্চালন লাইন স্থাপনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৭১ কোটি টাকা। তিনটি লটে এক বছরের মধ্যে কাজটি সম্পন্ন হয়েছে।
বিদ্যুৎ আমদানির সুবিধার্থে বুড়িচং উপজেলার হরিণধরাতে ‘কুমিল্লা উত্তর’ এবং সদরের জাঙ্গালিয়ায় ‘কুমিল্লা দক্ষিণ’ নামের দু’টি সাবস্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক মো. শফিউল্লাহ মঙ্গলবার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমরা গ্রিড লাইন নির্মাণ শেষ করেছি। বর্তমানে ওই লাইন দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে ১৩২ কেভির বিদ্যুৎ সঞ্চালন করা হচ্ছে। ২৩ মার্চ থেকে শুরু হবে আমদানিকৃত বিদ্যুতের সঞ্চালন। তিনি বলেন, আমদানীকৃত এ বিদ্যুৎ বৃহত্তর কুমিল্লায় ব্যবহার করা হবে।
জানা গেছে, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীদের ভিডিও কনফারেন্স আয়োজনের নানা দিক নিয়ে আলোচনার জন্য বুধবার ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাবেন। ভিডিও কনফারেন্সে ব্যান্ডউডথ ও বিদ্যুতের আমদানি-রফতানি কার্যক্রম উদ্বোধন ছাড়াও দুই প্রধানমন্ত্রী পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কথা বলবেন বলে জানা গেছে।
/এমএনএইচ/








