আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমরা মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছি, সেটি আমরা অর্জন করতে পেরেছি। এই আস্থার জায়গাটা রয়ে গেছে, সেটাই আমাদের বড় শক্তি। কারণ, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত ছিল, যেন নির্বাচনটাই না হয়। যেটা (ষড়যন্ত্র) ছিল, নির্বাচনই করা যাবে না— এধরনের একটা প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। সেজন্য বিরোধীদল (বিএনপি) ইলেকশনে আসবে না। তারা জানতো ইলেকশন তো হবেই না, তাই তারা নির্বাচন (প্রক্রিয়াতেও) আসবে না। সেখানে নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর আবার একটা চক্রান্ত ছিল।’
শুক্রবার (৭ জুন) সন্ধ্যা ৭টায় আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে দলের উপদেষ্টা পরিষদের এক সভার সূচনা বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এগুলো আমরা কিছুটা বুঝতে পারি। যার জন্য আমরা ইলেকশনটা একটা রিস্ক হিসেবে নিয়েছিলাম। আমি ইলেকশনটা ওপেন করে দিয়েছি। নমিনেশন দিয়েছিলাম সত্য, সেই সঙ্গে এটাও বলেছিলাম— যে যত পারো দাঁড়াও। হয়তো এমনও হতে পারতো, যারা দাঁড়ালো তারাই বেশি হয়ে গেলো। আমরা কম আসন পেলাম। আসলে তা হয়নি। ওপেন করে দেওয়ায় যেটা হয়েছে, ২০০৮ সালের ইলেকশনে আমরা এককভাবে ২৩৩ আসন পেয়েছিলাম। এবার আমরা ২২৩টা পেয়েছি। কারণ, আমাদের স্বতন্ত্র অনেকে জয়ী হয়ে এসেছে।
বিরোধী দলের অবস্থা খুবই করুণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপি তো ২০০৮ সালের নির্বাচনে মাত্র ৩০টা সিট পেয়েছিল। তখন মানুষের একটা ভাবনা ছিল— বিএনপি আর আওয়ামী লীগ সমান-সমান। কাজেই ভোট সমান-সমান হবে। হয়তো হ্যাং পার্লামেন্ট হয়ে যাবে— তখন যারা ক্ষমতায় ছিল তাদের এমন একটা চিন্তা ছিল। কিন্তু দেখা গেলো, মানুষের আস্থা-বিশ্বাস আওয়ামী লীগের ওপর। ওই নির্বাচন নিয়ে কেউ কোনও প্রশ্ন তুলতে পারেনি, তোলেওনি। যারা বিরোধীদল তারাও করতে পারেনি।
২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন বানচাল করার ষড়যন্ত্র হয়েছিল উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, অগ্নিসন্ত্রাস, আগুন দিয়ে মানুষ পোড়ানো— নানা ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছিল। এভাবে ইলেকশনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। সব বাধা অতিক্রম করে মানুষ কিন্তু ভোট দিয়েছে। আমরা আবার জয়ী হয়ে ক্ষমতায় এসেছি।
২০১৮ সালে সবাই মিলে নির্বাচনে আসলেও বিএনপির সমস্যা হচ্ছে নেতৃত্বের অভাব উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কারণ সাজাপ্রাপ্ত আসামি, পলাতক তারেক জিয়া লন্ডনে বসে হুকুম দেয়। ইলেকশনে তাদের নমিনেশন একটা লন্ডন থেকে আসে, একটা পল্টন থেকে আসে, আর একটা গুলশান থেকে আসে। এক এক সিটে দুজন, তিন জন ক্যান্ডিডেট। নিজেদের মধ্যে কামড়া-কামড়ি। একটা পর্যায়ে তারা নিজেরাই ইলেকশন ছেড়ে চলে যায়। ইলেকশনটাই ঠিক মতো করেনি। এটাই হলো বাস্তবতা। কারণ, তারা জানে, হেরে যাবে। সেজন্য ইলেকশন থেকে পিছিয়ে যায়। আর ইলেকশন যাতে না হয়, সেই চক্রান্ত করে। চক্রান্তের মধ্য দিয়েই তাদের জন্ম। তারা চক্রান্ত করবে এটাই তো স্বাভাবিক।
বাংলাদেশ বদলে গেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এই বাংলাদেশ বদলে যাওয়া বাংলাদেশ, এতে আর কোনও সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নতি হয়েছে। তবে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ, স্যাংশন কাউন্টার স্যাংশন, ফিলিস্তিনের গাজায় গণহত্যা এবং করোনার প্রভাব— এই সব কিছু মিলিয়ে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা ভাব, স্থবিরতা, মুদ্রাস্ফীতি। বাংলাদেশও তার থেকে রেহাই পায়নি, একই অবস্থা।
তিনি বলেন, এর মধ্যেও আমরা এটুকু বলতে পারি— উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উত্তরণ ঘটানোর ক্ষেত্রে যে ধাপগুলো আমরা অতিক্রম করেছিলাম, সেগুলো ধরে রাখতে পেরেছি। অনেক ক্ষেত্রে কৃচ্ছ্র সাধন করতে হয়েছে। এই অবস্থার মধ্যেও আমরা অন্তত একটা বাজেট দিতে পারলাম। আমরা একেবারেই পিছিয়ে যাইনি। তবে এবার বাজেট দেওয়ার ক্ষেত্রে লক্ষ্য রেখেছি, খুব বেশি বড় বাজেট না। কিন্তু দেশের উন্নয়ন যেন অব্যাহত থাকে, সেদিকে লক্ষ্য রেখেই বাজেট করা হয়েছে।
বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দেওয়ার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এখন বড় চ্যালেঞ্জ এই মূল্যস্ফীতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনবো। আমার মনে আছে, ২০০৯ সালে যখন সরকার গঠন করি, তখন মুদ্রাস্ফীতি ছিল ১২ দশমিক ৩ শতাংশ। রিজার্ভ ১ বিলিয়নও ছিল না— এটা বাস্তব কথা। সেখান থেকে আর্থনীতিকে আমরা অনেক উপরে তুলতে পেরেছি। তখন বাজেট ছিল মাত্র ৬৮ হাজার কোটি টাকা। এখন আমরা ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিতে পেরেছি— এটা হচ্ছে সবচেয়ে বড় কথা।
অনেক হিসাবনিকাশ করে বাজেট দেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সুস্থ পরিবেশ থাকলে, আরও ভালো বাজেট দিতাম। আমরা সেটা দেইনি। আমরা খুবই হিসাবনিকাশ করে করেছি। এখন এটা বাস্তবায়ন করা, মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরতে হবে। তবে ইতোমধ্যে মানুষকে, বিশেষ করে সীমিত আয়ের যারা তাদের জন্য পারিবারিক কার্ড করে দিয়েছি। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সাহায্য-সহযোগিতা, সামাজিক নিরাপত্তা করে যাচ্ছি। আরেকটা বিষয় হলো আমাদের অঙ্গীকার ছিল— সার্বজনীন পেনশন। এটা আমরা চালু করে দিয়েছি।
‘সবাই যাতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে’, সরকারের সেই লক্ষ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বদলে গেছে বাংলাদেশ। সেটাকে ধরে রেখেই সামনে এগিয়ে যেতে চাই। সেক্ষেত্রে আপনাদের পরামর্শ, বক্তব্য আমাদের জানা দরকার। আগের মতো ঘনঘন মিটিং করা সম্ভব হয় না। কারণ, অনেক বেশি ব্যবস্থা থাকতে হয়। তারপরও ভাবলাম, উপদেষ্টা পরিষদের মিটিং করি। আগে ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং করেছিলাম। যেহেতু বাজেটটা দিয়েছি, ইলেকশনটা করলাম। ইলেকশনে যারা সহযোগিতা করেছেন, একটা টিম তৈরি করে দিয়েছিলাম। তারা সার্বক্ষণিক কাজ করেছে নির্বাচনের জন্য। তাদের ধন্যবাদ জানাই। তাদেরও এখানে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। তাদের একটা অভিজ্ঞতা আছে, ইলেকশনটা পরিচালনার ক্ষেত্রে।’









