ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার রূপকল্প প্রণয়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
২৫ জুন ২০২৪, ১১:৪৭আপডেট : ২৫ জুন ২০২৪, ১৩:২৭

সম্প্রতি ভারত সফর প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এই সফরে ভারতের নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল নব-নির্বাচিত দুটি সরকার কীভাবে সহযোগিতামূলক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, সে বিষয়ে একটি রূপকল্প প্রণয়ন। এ সফর ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত ফলপ্রসূ। আমি মনে করি, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান চমৎকার সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে এ সফর সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে।’

মঙ্গলবার (২৫ জুন) সকাল ১১টায় গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে ২১-২২ জুন ভারত সফর নিয়ে লিখিত বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, ‘‘যেহেতু নতুন সরকার গঠনের মাধ্যমে ঢাকা ও দিল্লি নতুনভাবে পথ-চলা শুরু করেছে, সে ধারাবাহিকতায় ‘রূপকল্প ২০৪১’ এর ‘স্মার্ট-বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা এবং ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’ নিশ্চিত করার জন্য ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করার ব্যাপারে আমরা আলোচনা করেছি।’’

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পর প্রথম বিদেশ সফরে ভারত যাওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘ভারতের লোকসভা নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠনের পর ভারতেও ছিল এটি প্রথমবারের মতো কোনও রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের দ্বিপাক্ষিক সফর। এটি অবশ্যই আমার এবং বাংলাদেশের মানুষের জন্য অত্যন্ত সম্মানের। পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সহযোগিতামূলক। বিশেষ সম্পর্কেরই বহিঃপ্রকাশ। ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও নিকটতম প্রতিবেশী, বিশ্বস্ত বন্ধু এবং আঞ্চলিক অংশীদার। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে সম্পর্কের সূচনা হয় তাকে বাংলাদেশ সবসময়ই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়সহ উচ্চপর্যায়ের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে।’

ভারতের টানা তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তার নবগঠিত মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হয় গত ৯ জুন। এই সফরে ভারতের রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে কুশল বিনিময়ের পাশাপাশি ওই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত দক্ষিণ এশিয়াসহ অন্যান্য দেশগুলোর একাধিক সরকার প্রধানের সঙ্গে মতবিনিময় করার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আলাদাভাবে আমার সঙ্গে ভুটান এবং শ্রীলঙ্কার সরকার প্রধানদের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়। এসব আলোচনা ও বৈঠক আমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ককে সুদৃঢ় করতে সহায়ক হবে।’

২১ ও ২২ জুন ভারতে দ্বিপাক্ষিক সফর করায় একই মাসে দুবার দিল্লি সফরের ঘটনাকে অভূতপূর্ব মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এসবই আমাদের দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠভাবে একে অপরের সঙ্গে কাজ করার প্রমাণ বহন করে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আমার একাধিক বৈঠক হয়। 

দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্পৃক্ততার পথ এবং কার্যপন্থা নিয়ে আলোচনা করার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা আমাদের দুই দেশের এবং জনগণের কল্যাণের জন্য আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করার বিষয়ে সম্মত হয়েছি। বৈঠকে আমরা অন্যান্য পারস্পরিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ের মধ্যে রাজনীতি ও নিরাপত্তা, শান্তিপূর্ণ ও সুরক্ষিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং সীমান্তে হতাহতের ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনা, বাণিজ্য ও সংযোগ, অভিন্ন নদীর টেকসই ব্যবস্থাপনা ও পানি বণ্টন, জ্বালানি ও শক্তি এবং আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করি। আমি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তার সুবিধাজনক সময়ে যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশে দ্বিপাক্ষিক সফরে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছি।

তিনি জানান, বৈঠক শেষে উভয় দেশের মধ্যে পাঁচটি নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত ও বিনিময় হয় এবং তিনটি নবায়িত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত ও বিনিময় হয়। এছাড়া, দুটি রূপকল্প ঘোষণা (ভিশন স্টেটমেন্ট) স্বাক্ষরিত ও বিনিময় হয়। বৈঠকে ভবিষ্যৎ কাজের ক্ষেত্র হিসেবে ১৩টি যৌথ কার্যক্রমের ঘোষণা দেওয়া হয়।

সফরের গুরুত্বপূর্ণ দিক

প্রধানমন্ত্রী জানান, উভয়দেশ ‘শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিতকরণে একটি রূপকল্প ঘোষণা' গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি ‘ডিজিটাল অংশীদারত্ব’ (ডিজিটাল পার্টনারশিপ) এবং ‘টেকসই ভবিষ্যতের জন্য সবুজ অংশীদারত্ব’ (গ্রিন পার্টনারশিপ ফর সাসটেইনেবল ফিউচার) বিষয়ক দুটি সমন্বিত রূপকল্পকে সামনে রেখে কাজ করতে আমরা দুপক্ষই সম্মত হয়েছি।

রেল যোগাযোগ, সামুদ্রিক সহযোগিতা ও সুনীল অর্থনীতি, তথ্য-প্রযুক্তিখাতে সহযোগিতা, স্যাটেলাইট ও সামরিক শিক্ষা সহযোগিতা বিষয়ে ৫টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। রেল যোগাযোগ সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন শহরসহ নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে যাত্রী ও পণ্যবাহী রেলের যোগাযোগ স্থাপিত হবে বলেও জানান শেখ হাসিনা।

স্বাস্থ্য ও ওষুধ খাতে সহযোগিতা, দুর্যোগ মোকাবিলা, সহনশীলতা ও প্রশমন এবং মৎস্যক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য তিনটি সমঝোতা স্মারক নবায়ন করা হয়েছে। এছাড়া এই সফরে দুদেশের মধ্যে গৃহীত কিছু কার্যক্রমের ঘোষণা প্রদান করা হয়। এসব ঘোষণার মধ্যে রয়েছে—

গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন ও বাংলাদেশের তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা ও পানি সংরক্ষণের প্রকল্পে ভারতের সহায়তার ব্যাপারে আমরা আলোচনা করেছি। তবে এর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে নিষ্পত্তি না হওয়া তিস্তার পানি ভাগাভাগির কোন সম্পর্ক নেই।

বাংলাদেশ থেকে ভারতে চিকিৎসার জন্য যাওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে ই-ভিসা চালু এবং রংপুরে ভারতের নতুন সহকারী হাই কমিশন প্রতিষ্ঠা করা। এতে করে মুমূর্ষু রোগীদের ভিসা আগের চেয়ে দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ করা যাবে এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে ভ্রমণ করা যাবে।

রাজশাহী ও কলকাতার মধ্যে নতুন ট্রেন সার্ভিস। চট্টগ্রাম ও কলকাতার মধ্যে নতুন বাস পরিষেবা চালু এবং গেদে-দর্শনা এবং হলদিবাড়ি- চিলাহাটির মধ্যে দলগাঁও পর্যন্ত পণ্যবাহী ট্রেন পরিষেবা চালু। এতে করে দুদেশের মধ্যে যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও বৃদ্ধি পাবে। অনুদান সহায়তার আওতায় সিরাজগঞ্জে ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) নির্মাণ।

ভারতীয় গ্রিডের মাধ্যমে নেপাল থেকে বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি, যার মাধ্যমে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতা আরও বৃদ্ধি পাবে। মুক্তিযোদ্ধা প্রকল্পের আওতায় চিকিৎসা প্রত্যাশী রোগীদের জন্য খরচ সর্বোচ্চসীমা ৮ লাখ টাকা করা এবং বাংলাদেশের পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ চালু। ‘ইউপিআই’ এর ব্যবহার শুরু করার উদ্দেশ্যে দুই দেশ, বাংলাদেশে ‘রুপি’ কার্ড এবং ভারতে ‘টাকা-পে’ কার্ড চালু।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সমঝোতা স্মারক বিনিময় শেষে আমি এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখি। পরে আমার ও আমার। সফরসঙ্গীদের সম্মানে আয়োজিত মধ্যাহ্ন ভোজে অংশ নিই।

তিনি জানান, দিল্লি ছাড়ার আগে দুপুরে আমি ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এবং উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধানখারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করি। ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎকালে, আমরা দুই দেশের বন্ধুত্ব এবং সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্কের ওপর গুরুত্বারোপ করি। তারা বিগত ১৫ বছরে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার ভূয়সী প্রশংসা করেন।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বিগত ১৫ বছরে একটি অনন্য উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। যার সুফল দুদেশের জনগণ ভোগ করছেন। বিশেষ করে ২০২৩ সালে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। গত বছর আমি এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী যৌথভাবে যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ খাতে চারটি প্রকল্পের উদ্বোধন করেছি। বাংলাদেশ-ভারত যৌথভাবে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বায়োপিক ‘মুজিব। একটি জাতির রূপকার’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র দেশ হিসেবে আমি ভারতের আমন্ত্রণে জি-২০ সম্মেলনে যোগদান করেছি। বাংলাদেশ এবং ভারত দুদেশেই নতুন সরকার গঠনের পর এ সফর অনুষ্ঠিত হলো।

/এমআরএস/ইউএস/
সম্পর্কিত
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাপানের মিতসুই কোম্পানির প্রতিনিধিদলের সাক্ষাৎ  
প্রথম সফরে মালয়েশিয়া যাবেন প্রধানমন্ত্রী
মশক নিধন বৈজ্ঞানিক বিষয়, ডোবার পাশে সমাধান নেই: আসিফ মাহমুদ
সর্বশেষ খবর
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম