আবার জেগেছে পাটের দালাল

শফিকুল ইসলাম
১০ মার্চ ২০১৬, ১৩:১৮আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৬, ১৬:২৯

ফজলুর রহমান নামের একজন মধ্যবয়সী ভদ্রলোক সোমবার সকাল থেকেই বসে আছেন সচিবালয়ে পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজমের অতিথি কক্ষে। উদ্দেশ্য প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এসেছেন জামালপুর থেকে। গতকাল রবিবারও এসেছিলেন। প্রতিমন্ত্রীর দেখা না পেয়ে বিকেলে ফিরে গেছেন। প্রতিমন্ত্রীর বাসায়ও গিয়েছিলেন তিনি। রবিবার (৬ মার্চ) বিকেলের ঝড়বৃষ্টির কারণে উদ্দেশ্য ভেস্তে গেছে। প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হয়নি। ফিরে এসেছেন। তাই সোমবার সকাল সকাল আবার এসেছেন। এবার দেখা করতেই হবে, সময় কম।

পাট সংগ্রহ

প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্য জানতে চাইলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনের এই প্রতিবেদককে বলেন, সামনে পাটের মৌসুম। মিলগুলোয় পাট সাপ্লাই দিতে হবে। এর জন্য মন্ত্রীর সুপারিশ নিতে এসেছেন তিনি। সুপারিশ লাগবে কেন-জানতে চাইলে ফজলুর রহমান বলেন,‘বোঝেন না, মন্ত্রী, সচিব বা চেয়ারম্যানের সুপারিশ থাকলে নানাবিধ সুবিধা আছে। তা ছাড়া এক সিজনের ব্যবসা দিয়া সারা বছর চলমু’। মন্ত্রীর সুপারিশ না থাকলে চলবে ? উল্টো প্রশ্ন ফজলুর রহমানের। পাশবিহীন দিবসে সোমবার সচিবালয়ের ভেতরে প্রবেশ করলেন কিভাবে-জানতে চাইলে মুখে হাসি দিয়ে বললেন, ঢুকলাম আর কি?

এভাবে শুধু ফজলুর রহমান একাই নয়, সাতক্ষীরা থেকে এসেছেন সোলায়মান হক, রাজশাহী থেকে এসেছেন আবদুর রহমান, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থেকে এসেছেন ফিরোজ মিয়া এবং সোহেল মিয়া। জামালপুরের ইসলামপুর থেকে এসেছেন হুমায়ুন কবির, শাহাদত হোসেন ও আবদুস সবুর। সবারই এক উদ্দেশ্য। প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। পাটকলগুলোয় কাঁচাপাট সরবরাহের সুপারিশ নেবেন।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আমাদের দেশে সাধারণত পাট উৎপাদনের মৌসুম শুরু হয় জুন-জুলাইয়ে। কিন্তু এ সময় সরকারি অর্থ ছাড় করতে অনেক সময় দেরি হয়ে যায়। এ সুযোগে দালাল, ফড়িয়া এবং অসৎ ব্যবসায়ীরা কৃষকের কাছ থেকে স্বল্পমূল্যে পাট কিনে জমা করে। এরপর যখন সরকার নির্ধারিত মূল্যে পাট কিনে তখন তারা সেখানে পাট সরবরাহ করে। ফলে লাভের অংশটা তারাই পায়। কৃষকেরা বঞ্চিত হয়। এই সুযোগটি ধরতেই দলে দলে পাটের দালাল রাজধানীতে আসছে। তাদের পদচারণায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন পাট মন্ত্রণালয়, পাট অধিদফতর ও বিজেএমসির চেয়ারম্যানের দফতরের কর্মচারীরা।

বিষয়টি অবগত হয়ে এবার কৃষকেরা যাতে প্রকৃত লাভ থেকে বঞ্চিত না হয় এবং তারা যাতে সরকার নির্ধারিত মূল্য পায়, সে লক্ষ্যে মৌসুমের শুরুতেই কৃষকের কাছ থেকে পাট কিনতে যাচ্ছে সরকার। প্রায় ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকার দায়দেনা পরিশোধ করে বিজেএমসির ৫টি বন্ধ পাটকল পুনরায় চালুকরাসহ মৃতপ্রায় পাটশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফলে বিজেএমসির পাটকলগুলোয় প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

পাট মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়,সোনালি আঁশ পাটের হারানো দিন ফেরাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। ইতোমধ্যেই পাটকে কৃষিপণ্য হিসেবে বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাট ও পাটপণ্যের বাজার তৈরিতে বিভিন্ন কার্যক্রমও হাতে নেওয়া হয়েছে। আগামী পাট মৌসুমের শুরুতেই কৃষকের কাছ থেকে পাট কেনাকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে দালাল চক্র। অনেক দিন পরে তাদের এই পদচারণায় অনেকটাই অতিষ্ঠ সচিবালয়, অধিদফতর ও বিজেএমসির সাধারণ কর্মচারীরা। এ সব নব্য দালালের তদবিরে দফতরের শীর্ষ ব্যক্তিদের সাধারণ কাজ-কর্ম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাটকলগুলোয় কাঁচা পাট সরবরাহের জন্য বিশেষ সুযোগ পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তারা।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সচিবালয়ে মন্ত্রীর দফতর, পাট অধিদফতরে মহাপরিচালকের দফতর এবং বাংলাদেশ জুট মিল কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) চেয়ারম্যানের দফতরে তদবিরে ব্যস্ত থাকেন তারা। তাদের কাছ থেকে যাতে মিলগুলোর কর্তা ব্যক্তিরা কাঁচাপাট কেনেন তার জন্য বিশেষ সুপারিশ নিতেই এই তদবির। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে আগেভাগেই সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে পাট কেনার ঘোষণা দিয়েছেন পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম। যাতে দালাল, ফড়িয়া কিংবা অসৎ ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে অধিক মুনাফা পকেটস্থ করতে না পারে।

এ সম্পর্কে  বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম সম্প্রতি বলেছেন,‘বিজেএমসির অব্যাহত লোকসান ঠেকাতে আগামীতে পাট কাটার মৌসুমের শুরু থেকেই পাট কেনা হবে। এর ফলে কৃষকরা যেমন পাটের ন্যায্য মূল্য পাবেন, তেমনি মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্মও কমবে। এছাড়া পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন বাস্তবায়নে শিগগির সারাদেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। তিনি বলেন,আগামী মৌসুমের শুরুতেই পাট কেনার জন্য পর্যাপ্ত অর্থের সংস্থান করা হবে।

এদিকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রথম দফায় ২২০ কোটি টাকা এবং পরবর্তী দফায় পাট শিল্পে সহায়তা প্রদানের জন্য বিশেষ করে কৃষকদের কাছ থেকে পাট কেনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের অধীনে বিজেএমসির নিয়ন্ত্রণাধীন মিলগুলোর জন্য ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

পাট মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানান, পাটনীতি ২০১৫' ও পাট আইনের খসড়া তৈরির পর এতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত গ্রহণের পর আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতসহ আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়া হয়েছে। পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় এখন খসড়াটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

জানতে চাইলে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম বলেন,পাট ও পাটপণ্যকে সুরক্ষা দিতে নতুন আইন ও নীতি করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত আইনে পাট সুরক্ষা তহবিলের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকসহ পাট ও পাটপণ্যের সুরক্ষায় কাজে লাগানো হবে।

তিনি বলেন,পাট এখন আর কেবল কৃষিপণ্য নয়। একই সঙ্গে বড় অঙ্কের মূল্য সংযোজনকারী শিল্প পণ্য। পাটের মাধ্যমে বিশ্ববাণিজ্যে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব বাড়ানোর যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগাতেই আইন ও নীতি করছে সরকার।

সূত্র জানায়, ১৯৬২, ১৯৬৪ ও ১৯৭৪ সালের অধ্যাদেশের ভিত্তিতেই চলছে পাট খাত। এসব অধ্যাদেশে কিছু পরিবর্তন ও সংযোজনের মাধ্যমে যুগোপযোগী আইন করা হচ্ছে। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে রফতানি আয়ের ৯০ শতাংশই ছিল পাটের অবদান। এখন এ হার ২ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মোট রপ্তানি আয় তিন হাজার ১২১ কোটি ডলারের মধ্যে পাটের অবদান ছিল মাত্র ৮৬ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। তবে ২০১৫-১৬ অর্থবছর এ অবদান বাড়বে বলে আশা করছে ইপিবি।

২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন কার্যকর হয়েছে। ওই আইনের আওতায় ধান, চাল, গম, ভুট্টা, চিনি ও সার মোড়কের ক্ষেত্রে পাটের বস্তার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করায় খাদ্য অধিদপ্তর,খাদ্য ও চিনি শিল্প করপোরেশন, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনসহ (বিএডিসি) বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান পণ্যের মোড়কে পাটের বস্তা ব্যবহার করছে। গ্রাহকদের চাহিদা মাফিক পাটের তৈরি ব্যাগের সরবরাহ সহজীকরণ ও নিশ্চিতকরণের জন্য বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের বিভিন্ন মিল গেট ও বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে সরাসরি সরবরাহের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ছে।

২০০৮-০৯ অর্থবছরে বিজেএমসির মিলগুলোতে পাটজাত পণ্যের উৎপাদন ছিল ১ লাখ ৭  হাজার টন। ২০০৯-১০ অর্থ বছরের উৎপাদন ছিল ১ লাখ ৪৪ হাজার টন। ২০১০-১১ অর্থ বছরের উৎপাদন ১ লাখ ৬৬ হাজার টন। ২০১১-১২ অর্থ বছরের উৎপাদন ১ লাখ ৭৬ হাজার টন। ২০১২-১৩ অর্থবছরের উৎপাদন ১ লাখ ৮৯ হাজার টন। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের উৎপাদন ১ লাখ ৯৬ হাজার টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের উৎপাদন ২ লাখ ০৮ হাজার টন।    

২০০৮-০৯ অর্থ বছরে বিজেএমসির পাটজাত পণ্য রফতানি আয় ছিল ৪৩৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। ২০০৯-১০ অর্থবছরের রফতানি আয় ৬৫৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। ২০১০-১১ অর্থ বছরের রফতানি আয় ৯৪৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা। ২০১১-১২ অর্থ বছরের রফতানি আয় ১০৫৮ কোটি ১৪ লাখ টাকা। ২০১২-১৩ অর্থ বছরের রফতানি আয় ১৩৬৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের রফতানি আয় ১৬৮২ কোটি ১২ লাখ টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের রফতানি আয় ১৮৭৩ কোটি ০৬ লাখ টাকা।

 

/এসআই/এমএসএম

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম