কর্মপরিবেশ নিয়ে শঙ্কায় সচিবরা, সংস্কার হবে কীভাবে?

শফিকুল ইসলাম
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ২৩:০০আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ২৩:০০

প্রশাসনের সব পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সংস্কারের লক্ষ্যে কাজ করতে সচিবদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত ৪ আগস্ট সচিবদের নিয়ে করা বৈঠকে এই নির্দেশ দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সচিবদের দ্রুত কাজ করারও নির্দেশ দেন তিনি।  এই নির্দেশনা মানলেও কাজের পরিবেশ নিয়ে ‘শঙ্কিত’ সচিবরা। তাদের কয়েকজন জানিয়েছেন, সরকারের শীর্ষ প্রশাসনিক দফতর বাংলাদেশ সচিবালয়ের চেইন অব কমান্ড এখনও টালমাটাল। আনসার বিদ্রোহের পরে সরকারি আদেশ জারি করে সচিবালয়ের বাইরে বিভিন্ন গোষ্ঠীর দাবি-দাওয়ার মিছিল-মিটিং বন্ধ করা গেলেও সচিবালয়ের ভেতরে কর্মপরিবেশ ফিরিয়ে আনা যায়নি। ফলে সংস্কারের উদ্যোগ শুরু করা নিয়েই তারা অনিশ্চয়তায়।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এরপর থেকেই প্রশাসনের সব স্তরে শুরু হয় অস্থিরতা। ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলেও সচিবালয়ে কর্মপরিবেশ ফিরে আসেনি।

সচিবালয়ে একাধিক সচিব, বিভিন্ন পর্যায়ের করমকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি রাজনৈতিক দলের সরাসরি সমর্থক তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দাপটে সচিবালয়ে আতঙ্কের পরিবেশ বিরাজ করছে।

সরকারের শীর্ষ মহল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোনও কোনও বৈঠকে ইতোমধ্যেই বলা হয়েছে— শেখ হাসিনার মদদপুষ্ট প্রশাসন ভেঙে ফেলতে হবে। সেখানে নিয়োগ দিতে হবে পদ বঞ্চিতদের। এর অংশ হিসেবে কাউকে কাউকে নিয়োগ দেওয়াও হয়েছে। আলোচনা চলছে আরও নিয়োগ দেওয়ার। এমন পরিস্থিতিতে নিজের পদ-পদবী ঠিক থাকবে কিনা, এ নিয়ে সারাক্ষণই আতঙ্কে রয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশ বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় তারা।

গত ৪ আগস্টের বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকারের সব পর্যায়ে সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের জন্য সচিবদের দ্রুত কাজ করার নির্দেশ (মার্চিং অর্ডার) দেন। তিনি সংস্কার কর্মসূচি প্রণয়নে প্রয়োজন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা এবং মতামত গ্রহণেরও পরামর্শ দেন। সৃষ্টিশীল ও নাগরিকবান্ধব মানসিকতা নিয়ে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কর্মসূচির কর্মপরিকল্পনা দাখিল করতে বলেন।

এছাড়া ড. ইউনূস সচিবদের সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা, দুর্নীতির মূলোৎপাটন, সেবা সহজীকরণ, সরকারি কেনাকাটায় যথার্থ প্রতিযোগিতা-স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করার তাগিদ দেন।

কিন্তু সচিবালয়ে এখনও অস্থিরতা চলছে। যোগ্যতা থাক আর না থাক, মনের মতো পদ না পাওয়া নিয়ে সচিব থেকে শুরু করে পিয়ন পর্যন্ত সবাই এখন আগের সরকারের ‘বৈষম্যের শিকার’ বলে দাবি করছেন। নিজের কাজ বাদ দিয়ে প্রশাসনের শীর্ষ পদে বিদ্যমানদের সরানোর দাবিতে সরব তারা। তাদের দাবি ও বিক্ষোভের মুখে অনেকেই পদ ছেড়ে দিয়ে চলে গেছেন স্বেচ্ছায়। যারা আছেন, তারাও ভয়ে দিন পার করছেন– কখন বুঝি তাদের সরিয়ে দেওয়া হয় বা সরে যেতে হয়।

 

ইতোমধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকেও দাবি তোলা হয়েছে— বিগত সরকারের সময় যারা প্রশাসনের শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন বা যাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের সরিয়ে দিতে হবে। দাবি অনুযায়ী, অনেককে সরানোও হয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে থেকে জানা গেছে, আগামী অক্টোবরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেনের চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। চুক্তি বাতিল করা হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরীর।

আরও যাদের চুক্তির মেয়াদ শেষের পথে তাদের মধ্যে রয়েছেন– তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব হুমায়ুন কবীর খোন্দকার, বিমানসচিব মো. মোকাম্মেল হোসেন, ওএসডি সচিব খাজা মিয়া, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী, ধর্মসচিব মু. আবদুল হামিদ জমাদ্দার, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য আবদুল বাকী, ভূমিসচিব খলিলুর রহমান, পূর্তসচিব নবীরুল ইসলাম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব ফরিদ আহাম্মদ, আইএমইডি সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন, সংস্কৃতি সচিব খলিল আহমদ ও বাণিজ্য সচিব মোহা. সেলিম উদ্দিন, যুব ও ক্রীড়াসচিব ড. মহীউদ্দীন আহমেদ ও বিদ্যুৎ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব হাবিবুর রহমান। চুক্তির মেয়াদ শেষে শিগগিরই তাদের অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে। এরইমধ্যে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান জ্যেষ্ঠ সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন অবসরোত্তর ছুটিতে চলে গেছেন।

এই পদগুলোতে আবার নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ এবং তাদের কাজ শুরু করায় সময় লাগতে পারে। ফলে সংস্কার প্রক্রিয়া এখনই শুরু করা কঠিন হবে কিনা– এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবন ও ৩ নম্বর ভবনে অবস্থিত একাধিক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, অতীতে কখনও এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে বলে শুনিনি। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে সরকারের নির্দেশ তামিল করা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমরা পদে থেকে সেই দায়িত্বই পালন করেছি। কিন্তু বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মচারী রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে এসে নানা ধরনের হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। তারা বলার চেষ্টা করছেন, আমরা নাকি বিগত সরকারের বেনিফিশিয়ারি। এসব বলে নানা ধরনের ফন্দিফিকির আঁটছেন।

তারা আরও জানান, এভাবে চলতে পারে না। এর তো নিরসন হওয়া প্রয়োজন। কাজের পরিবেশ না ফিরলে সংস্কারের উদ্যোগ সফল হবে না বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।

 

/এফএস/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
লুটপাট চললে সরকারের হাতে হারিকেন ধরিয়ে দেওয়া হবে: তারিকুল
ঈদুল আজহায় গণমুখী ১০ বিষয় নিশ্চিত করেছে সরকার: মাহদী
ঈদের ছুটি শেষে সচিবালয়ে অফিস করছেন প্রধানমন্ত্রী
সর্বশেষ খবর
শেষ মুহূর্তেও একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলেন তারা
শেষ মুহূর্তেও একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলেন তারা
ছোট ছেলে শ্বশুরবাড়ি, বড় ছেলের ঘরের মেঝে খুঁড়ে মায়ের লাশ উদ্ধার
ছোট ছেলে শ্বশুরবাড়ি, বড় ছেলের ঘরের মেঝে খুঁড়ে মায়ের লাশ উদ্ধার
‘শাহজালালে হাজিদের লাগেজ কেটে চুরির অভিযোগ সঠিক নয়’
‘শাহজালালে হাজিদের লাগেজ কেটে চুরির অভিযোগ সঠিক নয়’
৩০০ ফিটে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় চীনা নাগরিকের মৃত্যু
৩০০ ফিটে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় চীনা নাগরিকের মৃত্যু
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের