চিপস, চকোলেট, ওয়েফারসহ নানা রকমের শিশুখাদ্যে এখন বাজার সয়লাব। দোকানগুলোতে থরে থরে সাজানো থাকে এগুলোর আকর্ষণীয় প্যাকেট। আর বিক্রি বাড়াতে এসব শিশুখাদ্যের সঙ্গে থাকছে খেলনা উপহার। টেলিভিশনে ওইসব খাদ্যের সঙ্গে বিভিন্ন রকম খেলনা উপহারের আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখে শিশুরা অভিভাবকদের কাছে এসব খাদ্যের আবদার করে। বিভিন্ন কোম্পানির শিশুখাদ্যের সঙ্গে উপহার হিসেবে থাকে অতিক্ষুদ্র আকৃতির খেলনা। এই ক্ষুদ্র আকৃতির খেলনা শিশুরা মুখ দিলে প্রাণহানিও ঘটতে পারে ।
জানা গেছে, গত ২৯ ফেব্রুয়ারি চিপসের প্যাকেটের ভেতরে ক্ষুদ্র আকৃতির খেলনার কারণে প্রাণ হারায় শিশু তামিম। অন্য শিশুদের মতোই চিপস খেতে পছন্দ করতো মাত্র ৯ মাস বয়সী তামিম। সেই চিপসের প্যাকেটের ভেতরে ক্ষুদ্র আকৃতির খেলনা প্রাণ কেড়ে নিল শিশু তামিমের। তামিমের চাচা মোনাছেপ বেপারী জানান, চিপসের প্যাকেটের মধ্যে থাকা খেলনা তামিমের গলার ভেতরে ঢুকে যায়। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আশঙ্কাজনক হওয়ায় চিকিৎসকরা বরিশাল মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। বেলা ১১টায় সদর হাসপাতালে তামিমের মৃত্যু হয়। তামিম খেলনা আর খাবারের পার্থক্য বোঝেনি। তাই সে খেলনাটিই খেতে চেয়েছিল। যা তার গলায় আটকে মৃত্যুর কারণ হয়েছে।
জানা গেছে, বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির নানা নামের শিশুখাদ্য আছে। বিক্রি বাড়াতে এসব শিশু খাদ্যের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া হয় খেলনা। আর বিক্রি বাড়াতে টেলিভিশনেও প্রচার করা হয় লোভনীয় বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে শিশুরা খেলনার জন্য অভিভাবকদের কাছে এসব খাদ্য কিনে দেওয়ার আবদার করে। অভিভাবকরাও না জেনে শিশুর হাতে তুলে দেন এসব ঝুঁকিপূর্ণ খেলনাসহ শিশুখাদ্য।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার থেকে সংগ্রহ করে দেখা গেছে, বেশ কিছু প্যাকেটজাত খাবার পাওয়া গেল যেগুলোর সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে ফ্রি খেলনা। কোয়ান্টাম করপোরেশন লিমিটেডের কোকোমো প্রিমিয়াম ফান বিস্কুটস, এটির দাম ১০ টাকা। প্যাকেটের ভেতরে পাওয়া গেল লাল রঙের এক ইঞ্চি আকারের প্ল্যাস্টিকের হরিণ। একই কোম্পানির পার্কি কোকোমো অরেঞ্জ বিস্কুটের প্যাকেটেও রয়েছে ক্ষুদ্র আকৃতির খেলনা বাঘ। প্রাণ কোম্পানির উইন পিলো চকোলেট ওয়েফারের সঙ্গেও দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন রকমের ক্ষুদ্র আকৃতির প্রাণী। কোকোবিস চকোলেট ফিল্ড বিস্কুটের প্যাকেটেও দেওয়া হচ্ছে হলুদ রঙের সাপ। এসব প্যাকেটের গায়ে কোন সতর্ক বার্তা নেই, এসব খেলনা কত বছর বয়সী বাচ্চাদের উপযোগী।
মগবাজারে থাকেন লাইলী বেগম। তার সাড়ে তিন বছরের মেয়ে লামিয়ার প্রতিদিন চাই একটি করে কোকোমো প্রিমিয়াম ফান বিস্কুট এর প্যাকেট। দাম ১০ টাকা হওয়াতে মেয়েকে কিনে দেন লাইলী বেগম। লামিয়ার কাছে বিস্কুটটা যতটা প্রয়োজন তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো প্যাকেটের ভেতরে থাকা প্লাস্টিকের খেলনা। খেলনার লোভে প্রতিদিন একটি প্যাকেট কিনতে হয় লাইলী বেগমকে।
লাইলী বেগম বলেন, টিভিতে দেখে বাচ্চা কান্নাকাটি করে, তাই না কিনে দিয়েও পারি না। বিস্কুট কিনলে অল্প খেয়ে আর খায় না, তার দরকার খেলনা। খেলনা দিয়ে খেলতে খেলতে অনেক সময় মুখেও দেয়। ভয়ে থাকি ভেতরের খেলনা আবার মুখে আটকে যায় কিনা।
শুধু লামিয়ার মা লাইলী বেগম নয়, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেও জানা গেছে একই রকম তথ্য।
রাজধানীর বিয়ামে ক্লাস ওয়ানে পড়ে নুসাইবা। তাকেও প্রতিদিন একটি করে উইন পিলো চকোলেট ওয়েফার কিনে দিতে হয় বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানালেন মা লাবনী। তিনি বলেন, এই প্যাকেটের ভেতরেও রয়েছে প্লাস্টিকের কোনও একটি খেলনা। নুসাইবা খেলনার জন্য এটি কিনতে চায়। মেয়েকে খুশি করার জন্য কিনে দেই। শুধু তাই না আমার দুই বছর বয়সী ছেলে নুবাইদও এসব খেলনা পছন্দ করে। অনেক সময় খেয়াল করে দেখাও হয় না ভেতরে কি আছে। একদিন নুবাইদ ছোট খেলনা মুখে দেয়, পরে তা বের করি। খেয়াল না করলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারতো।
নুসাইবা ও নুবাইদের মায়ের অভিযোগ, শিশুখাদ্যের ভেতরে বেশিরভাগ খেলনা থাকে লাল রংয়ের। শিশুরা লাল রংয়ের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয় বলেই কোম্পানিগুলো এই ব্যবসায়িক কৌশল নিয়ে থাকে। শিশুদের নিরাপত্তার স্বার্থে এ বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভেবে দেখা উচিত।
অভিভাবকদের অভিযোগ, কম বয়সী শিশুদের খাদ্যে উপহার হিসেবে খেলনা দিলে এতো ক্ষুদ্র হওয়া উচিত নয়। এত ক্ষুদ্র খেলনা যে কোনও সময় মুখে দিলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সরকারেরও উচিত এসব পর্যবেক্ষণ করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু বর্ধণ ও পারিবারিক সর্ম্পক বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান মানসুবা তাবাসসুম হক এ প্রসঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাচ্চার বয়স উপযোগী খেলনা শিশুদের দেওয়া উচিত । না হলে খেলনাও শিশুর জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে।এমনিতেই শিশুরা হাতের কাছে যা পায় তা মুখে দেওয়ার প্রবণতা থাকে। ১ থেকে তিন বছর বয়সী শিশুদের জন্য এসব খেলনা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
মানসুবা তাবাসসুম হক বলেন, খাবারের সঙ্গে খেলনার অফার দিয়ে শিশুদের এক ধরণের ফ্যান্টাসির ভেতর ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যেটা তার ভবিষ্যতের জন্য প্রচণ্ড হুমকিস্বরূপ। তার মধ্যে এক ধরণের আগ্রহ তৈরি হবে পরের চিপসের জন্য, যেটা অনেকটা গ্যাম্বলিংয়ের মতো।
এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রাণ- এর কাস্টমার রিলেশনস এক্সিকিউটিভ মিজানুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা মনে করিনা এটা শিশুদের জন্য হুমকিস্বরূপ। কারণ, যেসব শিশুদেরকে বাবা মায়েরা আমাদের পণ্য কিনে দেন, তারা বুঝেশুনেই কিনে দেন। আর যেসব শিশুরা নিজেরাই কিনে খায়, তারা নিজেরাই বুঝতে পারে যে, এটা আসলে খেলনা খাওয়ার জন্য নয়।
এপিএইচ/








