২০১৫ সালে সারা দেশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারী ও শিশু নির্যাতনের ৬৯টি ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার শিকার নারী ও শিশুদের বয়স ৪ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। ৬৯ টি ঘটনার মধ্যে ৪৬ টি ঘটনায় শারীরিক ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং বাকিগুলো স্থানীয় সালিশি দ্বারা মীমাংসিত হয়েছে অথবা পুলিশের কাছে মামলা করা হয়নি। বর্ণিত তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৭৮% ঘটনা অ-ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কর্তৃক, ১৫% ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী দ্বারা সংঘটিত হয়েছে; পক্ষান্তরে ৬% এর ক্ষেত্রে ঘটনা সংঘটনকারীদের চিহ্নিত করা যায়নি এবং ১% ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। এদিকে, রিপোর্টে আরও বলা হয়, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পাঁচটি মাতৃভাষায় (প্রথমত ছয়টি) প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শিশুদের হাতে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আবারও ব্যর্থ হয়েছে যেটা ২০১৩ সালে দেওয়ার কথা ছিল। বুধবার বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানবাধিকার রিপোর্ট ২০১৫-এর প্রকাশ ও মোড়ক উন্মোচন উপলক্ষে ডেইলি স্টার ভবনের তৌফিক আজিজ খান সেমিনার হলে আয়োজিত অনুষ্ঠিত আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়।
কাপেং ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানবাধিকার রিপোর্ট ২০১৫ এ এসব তথ্য দেওয়া হয়েছে। এ রিপোর্টটি সারাংশ হিসেবে বিবেচিত হবে বলে জানিয়েছে কাপেং ফাউন্ডেশন। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানবাধিকার বিষয়ক রিপোর্ট ২০১৫-এর সম্পাদনা করেছেন প্রফেসর মংসানু চৌধুরী ও কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা। মানবাধিকার রিপোর্টের কন্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করেছেন কাপেং ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা মঙ্গল কুমার চাকমা, কাপেং ফাউন্ডেশনের প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেটর বাবলু চাকমা, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারী নেটওয়ার্কের সদস্য পার্বতী রায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অনুরাগ চাকমা, জাতীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পরিষদের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মানিক সরেন এবং কাপেং ফাউন্ডেশনের প্রজেক্ট অফিসার সিলভিয়া খিয়াং। অক্সফামের সহযোগিতায় কাপেং ফাউন্ডেশন প্রতিবছরের মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানবাধিকার বিষয়ক বার্ষিক এই রিপোর্ট প্রকাশ করেছে।
তবে আশাপ্রদ হিসেবে বর্ণনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকীর পরিকল্পনার মতো সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (২০১৬-২০২০) খসড়াতেও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র ও আইএলও কনভেনশন নং ১৬৯ বাস্তবায়নের কথা পুনরুল্লেখের মাধ্যমে সরকারের সদিচ্ছা প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৫ সালে সারাদেশে ৮৫ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারী ও কন্যাশিশু শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪৪ জন পার্বত্য চট্টগ্রামের এবং ৪১ জন সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারী ও শিশু। ২০০৭ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে মোট ৪৩৪ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারী ও কন্যাশিশু শারীরিক ও যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে। ২০১৫ সালে ২৬ টি ধর্ষণ ও গণধর্ষণ, ৩ টি হত্যা, ১১ টি শারীরিক লাঞ্ছনা, ১৬ টি ধর্ষণের চেষ্টা, ৫টি অপহরণ, ৬ টি শারীরিক ও যৌন হয়রানি এবং ২টি পাচারের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৫ সালে সংঘটিত মোট ৬৯টি ঘটনার মধ্যে ৩৮টি পার্বত্য চট্টগ্রামে এবং বাকিগুলো সমতলে সংগঠিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকালীন বছরে (২০১৫) এদেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকারের বিষয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এমন কোনও আইনগত এবং নীতিগত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধিত হয়নি। সরকার ২০১৫ সালে বেশ কিছু আইন, প্রবিধান এবং নীতিমালা পাশ করেছে, যেমন, বাংলাদেশ পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ অ্যাক্ট ২০১৫ এবং লেবার রেগুলেশন ২০১৫ সংসদে পাস হয়েছে এবং গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণনীতি ২০১৫ মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেয়েছে। এই আইন বা নীতিমালাগুলোয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ব্যাপারে স্পষ্টভাবে কোনও কিছুই বলা হয়নি।
নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার
প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০১৫ সালে কমপক্ষে ৭৪ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী যার মধ্যে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারী ও স্কুলের ছাত্রীকে পর্যন্ত ফৌজদারি অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে তাদের বেশিরভাগই পরবর্তী সময়ে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কমপক্ষে ১১৭ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও সাজানো মামলা দায়ের করার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সমতলের ১৩ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী (৩ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারী ও কন্যাশিশু হত্যাসহ) বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
২০১৫ সালে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অবৈধভাবে গ্রেফতার, আটক এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে সংঘটিত হয়েছে। ১৯১ জনের অধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৭৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যেখানে ২০১৪ সালে মাত্র ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভূমি, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং জলবায়ু পরিবর্তন, যুব, শিশু এবং শিক্ষার অধিকারের পরিস্থিতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে এক জায়গায় বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে কমপক্ষে ৪৫টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পরিবার নিজেদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের শিকার হয়েছে এবং ১ হাজার ৪০০টি পরিবার উচ্ছেদের হুমকির মধ্যে রয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের ৬৫৭ টি পরিবার। ভূমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে সমতলের অন্তত একটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী গ্রাম হামলার শিকার হয়েছে, অন্যদিকে সমতলের ১১.৫ একরসহ মোট ৫ হাজার ২১৬ একর জমি রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় পক্ষ কর্তৃক দখল করা হয়েছে।
১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত ভারত-বাংলাদেশ স্থল সীমান্ত চুক্তি ২০১৫ সালে ভারতীয় পার্লামেন্টে অনুমোদনের ফলে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী খাসি জনগোষ্ঠীর পাল্লাথল পুঞ্জির মোট ৩৬০ একর ভূমি ভারতের হাতে চলে যাওয়ার শঙ্কায় প্রায় ৩৫০ টি খাসিয়া ও গারো পরিবার চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছে। এতে তাদের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অপরাধের বিচার নিয়ে শঙ্কা
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাপ্ততথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, ২০১৫ সালে সংঘটিত মামলাগুলোর মধ্যে যেসব ঘটনার মামলা সংঘটিত হয়েছে তার কোনওটিরই যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যদিও মামলা দায়েরের পর কয়েকজন অপরাধীকে গ্রেফতার ও জেলে প্রেরণ করা হয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা বিভিন্নভাবে প্রভাব খাটিয়ে জেল থেকে মুক্তি পেয়েছে। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি ও বিচারহীনতার কারণে এ ধরনের ঘটনা দেশে ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৯৬ সালে কল্পনা চাকমা অপহরণকারীদের আজ পর্যন্ত বিচারের জন্য আদালতে হাজির করানো যায়নি।
এদিকে, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানবাধিকার রিপোর্ট ২০১৫-এর প্রকাশ ও মোড়ক উন্মোচন উপলক্ষে বুধবার দ্য ডেইলি স্টার ভবনের তৌফিক আজিজ খান সেমিনার হলে আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও মানবাধিকার রিপোর্টের অন্যতম একজন সম্পাদক পল্লব চাকমা এসব তথ্য তুলে ধরেন।
কাপেং ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারস রবীন্দ্রনাথ সরেনের সভাপতিত্বে মোড়ক উন্মেচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল। বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খানম, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সম্মানিত সদস্য নিরুপা দেওয়ান, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশ গুপ্ত, উন্নয়ন সংস্থা অক্সফামের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর এমবি আক্তার, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং।
স্বাগত বক্তব্য রাখেন কাপেং ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারপারসন চৈতালী ত্রিপুরা এবং সঞ্চালনা করেন কাপেং ফাউন্ডেশনের ফাল্গুনী ত্রিপুরা।
অনুষ্ঠানে সুলতানা কামাল বলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রান্তিকতার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আজ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সার্বিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে যে কথাগুলো বলা হয়েছে, সেগুলো অবশ্যই রাষ্ট্রকে ইতিবাচকভাবে শুনতে হবে এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসহ দেশের আপামর জনসাধারণের মানবাধিকার রক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা নারী পুরুষ যে কেউ যেখানেই থাকি, যেভাবেই থাকি যে মতের থাকি, যে দলেরই থাকি, আমরা যদি নিরাপদ থাকি তাহলে বুঝব, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে না হলে নয়।
/এসটিএস/এমএনএইচ/








