ব্রিটিশ লেবার পার্টির বহিষ্কৃত এমপি ও ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্ত সায়মন ড্যানজাক ঢাকায় বিএনপির সম্মেলনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার আহ্বান এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপে ক্ষুব্ধ হয়েছে বাংলাদেশ সরকার। যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের এক মুখপাত্রের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান এ তথ্য জানিয়েছে।
লন্ডনে অবস্থিত বাংলাদেশি হাইকমিশনের এক মুখপাত্র গার্ডিয়ানকে জানান, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে সায়মন দেশের চরমপন্থী গ্রুপসহ বিরোধীদলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে কথা বলা মানে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা। বাংলাদেশে একটি সমৃদ্ধ গণতন্ত্র রয়েছে। ২০১৯ সালে পরবর্তী নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
মুখপাত্র আরও বলেন, ড্যানজাকের মন্তব্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি’র বক্তব্যের সঙ্গে মিলে যায়। যে দলটি সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী জোটবদ্ধ আর জামায়াতে ইসলামী একটি ‘অপরাধী সংগঠন’ হিসেবে চিহ্নিত এবং সব উগ্র সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
গত শুক্রবার বিএনপির সম্মেলনে যোগ দিতে ঢাকা আসেন সায়মন ড্যানজাক। সম্মেলনের বক্তব্যে তিনি বিএনপি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে বর্তমান সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘনের পাশাপাশি আতঙ্কের সংস্কৃতি চালু করেছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গুম করা হচ্ছে।’
ব্রিটেন ও বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন সায়মন ড্যানজাক। তিনি বলেন, ‘সম্পর্কটা এখন তিক্ত হয়ে গেছে। যদি সত্যিকার গণতন্ত্র না ফেরে তাহলে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা দরকার।’
গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, ড্যানজাকের মতোই বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চান লন্ডনে নির্বাসিত থাকা বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালতে একাধিক মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলা রয়েছে মানিলন্ডারিং নিয়ে।
উইকিলকসের ফাঁস করা নথির বরাত দিয়ে গার্ডিয়ানের খবরে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের ঢাকায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস ২০০৮ সালে তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করে। তারেকের গুরুতর রাজনৈতিক দুর্নীতি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের ওপর ব্যাপক বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে এ নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করা হয়।
বিএনপির সম্মেলনেও তারেক রহমান নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ড্যানজাক। বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, ‘তারেক রহমান খুব ভালো এবং তার চেতনাও খুব ভালো। আমি সম্প্রতি তার সঙ্গে সাক্ষাত করেছি। এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই যে, শিগগিরই তিনি দেশে ফেরার চিন্তা করছেন।’
গার্ডিয়ানের খবরে আরও বলা হয়েছে, রচডেলে বাংলাদেশিদের ভোট পেতে নির্বাচনের আগে কমিউনিটি নেতাদের নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরে ড্যানজাক বলেছিলেন, বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে কথা বলার জন্য সংসদে আমাদের মানুষ দরকার।
তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাত এবং বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে ড্যানজাকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতে দোষের কিছু নেই। কারণ সরকারই ‘এখানে তাকে থাকতে দিচ্ছে।’ ড্যানজাক বলেন, ‘এটা হস্তক্ষেপ নয়। বাংলাদেশে যা ঘটছে তার জন্য আমি নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছি। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অনেক খবর পাওয়া যায়। এ বিষয়ে বাংলাদেশের ওপর ব্রিটিশ সরকারের চাপ প্রয়োগ করা দরকার।’
গত বছরের শুরুতে বিএনপি-জামায়াত জোটের সহিংসতার পরও ব্রিটিশ সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেনি। নিয়মিত দেশটির মন্ত্রীরা বাংলাদেশ সফর করেছেন। বছরে ১৮০ মিলিয়ন পাউন্ড সহায়তা দিয়ে বাংলাদেশে সবচেয়ে বৃহত্তম দাতা দেশ হিসেবে আছে ব্রিটেন।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র গার্ডিয়ানকে বলেন, বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলকে গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক জবাবদিহীতার জন্য একত্রে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছে ব্রিটিশ সরকার। যুক্তরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বাংলাদেশ। আরও স্থিতিশীল, সমৃদ্ধশালী ও গণতান্ত্রিক আগামীর আকাঙ্ক্ষার জন্য আমরা বাংলাদেশের মানুষকে সহযোগিতা করে যাব।
উল্লেখ্য, যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশ বিষয়ক সর্বদলীয় পার্লামেন্টারি গ্রুপের সহসভাপতি ড্যানজাক। গত বছর ডিসেম্বরে ড্যানজাককে লেবার পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয়। ১৭ বছরের তরুণীকে যৌন উত্তেজক বার্তা পাঠানোর খবর পত্রিকায় প্রকাশ হলে তার বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে এখন ধর্ষণের একটি অভিযোগের তদন্ত করছে পুলিশ। এছাড়া গত শুক্রবারই (১৮ মার্চ) ভুয়া খরচ দেখিয়ে ১১ হাজার পাউন্ড উত্তোলন করায় তা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেয় দেশটির ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্লামেন্টারি স্ট্যান্ডার্ড অথরিটি (ইপসা)। ড্যানজাকও এক বিবৃতিতে তা ফেরত দিতে সম্মত হয়েছেন।
/এমপি/এএ/ এএইচ/








