২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো। তারা আগেই দেশের মেধাবী সন্তানদের টার্গেট করেছিল। তাই ওই রাতে জগন্নাথ হলে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদাররা। শিক্ষক, ছাত্র ও কর্মচারীসহ হত্যা করা হয়েছিল কয়েকশ মানুষকে। হত্যার জন্য মানুষ খুঁজে বের করতে হলের কোনও জায়গাই বাদ রাখেনি তারা। মানুষগুলোকে হত্যার পর সেই লাশ গণকবর দিয়ে হল এলাকায় গান পাউডার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় হানাদাররা। সেই নৃশংসতা ও বর্বরতা আজও ভুলতে পারেন না স্বজনহারা মানুষেরা। তাদের তাড়িয়ে বেড়ায় প্রিয় স্বজনের গগণ-বিদারী আর্তনাদ।
এখনও সেই ভয়াল রাতের সাক্ষী হয়ে আছেন কয়েকটি পরিবার। শুক্রবার রাতে তাদের কয়েকজন কথা বলেছেন বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে।
জগন্নাথ হলের তৎকালীন দারোয়ান সুনীল চন্দ্র দাস ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় হলের দক্ষিণ গেটে দায়িত্ব পালন করার জন্য বাসা থেকে বের হয়ে যান।
এরপর স্ত্রী বকুল রানী দাস চার বছরের বড়মেয়ে কুমকুম রানী দাস ও ছোট ছেলে শ্যামল চন্দ্র দাস হল স্টাফদের টিনশেডের বাসায় ঘুমিয়ে পরেন। হঠাৎ রাত ১১টার দিকে গুলির শব্দে ঘুম ভাঙে তার। পাশের বাসার এক পরিচিত ব্যক্তিকে ডাকলে তিনি ঘর থেকে বের না হওয়ার অনুরোধ করেন। এরপর দুই বাচ্চা নিয়ে ঘরে স্রষ্টাকে ডাকতে থাকেন তিনি।
ওই রাতে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বকুল রানী দাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১১টার দিকেই পুরো হল এলাকা ঘেরাও করে ফেলে পাকিস্তানি বাহিনী। রাত ১২টার দিকে হল-সংলগ্ন ইউওটিসির (বর্তমান বিএনসিসি) দেয়াল ভেঙে মিলিটারিদের সাঁজোয়া ট্যাংক হলের ভেতর ঢুকে পড়ে। একের পর এক গুলির শব্দ। এক পর্যায়ে এলাকার ভেতরে আগুন ধরিয়ে দেয় হানাদাররা। তখন সবাই ঘর থেকে বের হয়ে যায়। এরপর বাসার পুরুষদের ধরে নিয়ে যায় মাঠের দিকে। সেখানেই তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়। এসময় ভয়ে কেউ চিৎকার করে ওঠে, কেউবা পানি চায়। কিন্তু হানাদাররা কাছ থেকে গুলি করে তাদের হত্যা করে।’
বকুল রানীর পাশেই বসা তার মেয়ে কুমকুম বলেন, ‘সেদিন সারারাত গোলাগুলি চলে। এরপর ওরা চলে যায়। সকালে আমাকে আর ভাইকে নিয়ে মা হলের মাঠে যায়। কিন্তু গিয়ে বাবার লাশ পাইনি। তারপর আমরা গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় ফিরে যাই। পরে স্বাধীনতার পর আবার ঢাকায় আসি। ওই সময় বাবার চাকরি স্থায়ী না হওয়ায় আমরা কোনও পেনশন পাইনি। এখন ভাই এখানে চাকরি করে। মা আমাদের নিয়ে অনেক কষ্ট করছে। আমরা কোনও সাহায্য পাইনি।’
জগন্নাথ হলের তৎকালীন ওয়ার্ড বয় রাখাল চন্দ্র দাস ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘হায়েনারা প্রথমেই গোলা ছুঁড়ে শহীদ মিনার গুঁড়িয়ে দেয়। গোলার আঘাতে শহীদ হন গার্ড দুঃখীরাম। এরপর তারা মর্টার ছোড়ে উত্তরবাড়ির দিকে। ক্রমশ আক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র হল এলাকায়। উত্তর ও দক্ষিণবাড়ির প্রতিটি কক্ষে তারা অভিযান চালায়, যেখানে যাকে যে অবস্থায় পেয়েছে, তাকে সে অবস্থাতেই বেয়োনেট চার্জ ও গুলি করে হত্যা করে। আতঙ্কিত ছাত্ররা দিগ্বিদিক ছুটে পালাতে চেষ্টা করে, কিন্তু রেহাই পায়নি কেউই। এমনকি দোকানঘর, টয়লেট, ছাদ, কার্নিশ কোনও কিছুই শকুনদের দৃষ্টি থেকে বাদ যায়নি সেই রাতে।’
জগন্নাথ হলের এই গণহত্যার বিষয়ে বিভিন্ন বই ও সংকলন থেকে জানা যায়, হানাদারদের হামলার সময় হলের ছাদে আশ্রয় নিয়েছিলেন তৎকালীন জগন্নাথ হল ছাত্র ইউনিয়ন শাখার সভাপতি সুরেশ দাস, প্রখ্যাত ছাত্রনেতা মৃণাল কান্তি বোস, সত্যরঞ্জন দাসসহ মোট ১০ জন। হানাদার বাহিনী সেখানেই তিনজন করে লাইনে দাঁড় করিয়ে বলে, ‘আব জয় বাংলা বোল’, ক্ষীণকণ্ঠে প্রত্যুত্তর দিতে না দিতে গুলি করে হত্যা করা হয় তাদের। পরে মৃতদেহগুলো ছাদ থেকে ফেলে দেয় ওই শকুনরা। আত্মরক্ষার জন্য ছাদ থেকে লাফ দেন শিক্ষার্থী উপেন্দ্র চন্দ্র রায়। কিন্তু তারও শেষ রক্ষা হয়নি। শেষ পর্যন্ত তাকেও মরতে হয়েছে হানাদার বাহিনীর গুলিতে। যাদের মধ্যে অলৌকিকভাবে রক্ষা পান একমাত্র সুরেশ চন্দ্র দাস।’
আরও জানা যায়, ধ্বংসযজ্ঞ চলতে থাকে রাতজুড়ে। আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয় ছাত্রাবাসে। গোলার আঘাতে সুড়ঙ্গের মতো গর্ত সৃষ্টি হয় ছাত্রদের কক্ষে। তারা গোয়ালঘরে জমায়েত করে কর্মচারীদের। তাদের ব্যবহার করে সমস্ত লাশ জড়ো করার কাজে। এদের মাঝে ছিলেন বিদ্যুমিস্ত্রি চিতবল্লি, মনভরন, শিবু, শঙ্কর, রবি, বুধধিরাম, মুন্নিলাল, জোয়াহর, বসু, মোহন, শ্যামলালসহ আরও অনেকেই। প্রাণ বাঁচানোর আশায় দিন-রাত লাশ টেনেও মৃত্যু ঠেকাতে পারেননি অধিকাংশই।
শিক্ষকদের মধ্যে হামলার শিকার হন মানবতাবাদী দার্শনিক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, তৎকালীন প্রভোস্ট গোবিন্দচন্দ্র দেব, অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য, ড. সন্তোষকুমার ভট্টাচার্য ও ড. মনিরুজ্জামান।
ভোরের দিকে আক্রান্ত হন ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব। বর্তমান ফিজিক্স ইনস্ট্রাক্টরের আবাস ছিল তার কোয়ার্টার। নিজ জামাতাকে চোখের সামনেই শহীদ হতে দেখেছেন তিনি। তবুও শান্ত স্বরে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘বাবারা, তোমরা কী চাও?’ সঙ্গে সঙ্গে হায়েনারা বন্দুকের গুলিতে ঝাঁঝরা করে ফেলে তাকে। তার পালিতা কন্যা বেগম রোকেয়ার সামনেই মৃতদেহ বেয়নেট দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে উল্লাস করতে থাকে তারা।
৩৪ নম্বর বিল্ডিংয়ের ১ নম্বর কক্ষে থাকতেন জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা। গলায় গুলিতে তার স্পাইনাল কর্ড ছিঁড়ে যায়। ২৭ মার্চ হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও বিনা চিকিৎসায় অবস্থার অবনতি হলে ৩০ মার্চ তিনিও মারা যান। মৃত্যুর পরপরই জীবিতদের মারতে হাসপাতাল ঘেরাও করে পাকিস্তানি বাহিনী। লাশ না নিয়েই পাথরচাপা বুকে হাসপাতাল ত্যাগ করেন পরিবারের সদস্যরা। পোস্টমর্টেম ঘরের পাশে চার দিন ধরে পড়ে ছিল তার দেহ।
২৫ মার্চ কালরাতে ওই ঘটনা মনে পড়লে এখনো আতঙ্কে কেঁপে ওঠেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
/এআরআর/এসএনএইচ/এমএসএম/এফএস/








