২৫ মার্চের সবচেয়ে বড় টার্গেট ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবী শিক্ষক ও ছাত্ররা। এর কারণ হিসেবে সে সময়ের আন্দোলনকে দমিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টাকেই চিহ্নিত করছেন ইতিহাসবিদরা। আর অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন, যখন বাঙালি প্রতিরোধ শুরু করছে, তখন প্রতিরোধের স্বর নিশ্চিহ্ন করতেই ছাত্র- শিক্ষকদের ওপর হামলার পরিকল্পনা হয়েছে। এর সঙ্গে স্বাধীনতাকামী গণমাধ্যম ও প্রশিক্ষিত বাহিনীও ছিল টার্গেট।
বুদ্ধিজীবী হত্যার কথা মনে পড়লেই মাথায় আসে ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১। অথচ এর শুরু হয়েছিল সেই ২৫ মার্চের কাল রাত্রিতে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালো রাতে গণহত্যার প্রথম প্রহরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্বর পাকবাহিনী নির্মমভাবে অন্তত ২০ শিক্ষকসহ দুই শতাধিক ছাত্র-কর্মচারীকে হত্যা করেছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ড. অজয় রায় বলেন, অসহযোগ আন্দোলন মূলত গড়ে উঠেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহরুল হক হলের স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন পরিষদকে কেন্দ্র করে। তাই, পাকবাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের প্রথম লক্ষ্য ছিলো এই হলটি। কোন সুনির্দিষ্ট হিসেব না থাকলেও শিক্ষকরা বলছেন, এই হলের কম-বেশি ২০০ জন ছাত্রকে পাকবাহিনী হত্যা করেছিল। কেন আন্দোলনরত ছাত্ররা হলে ছিল জানতে চাইলে অজয় রায় বলেন, খুব জোর গ্রেফতার করে নিয়ে যাবে, এরচেয়েও বেশিকিছু হবে সেই ভাবনা সেসময় কারোর মাথায় ছিল না।
বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমনকারী পাকিস্তান বাহিনীতে ছিল ১৮ নং পাঞ্জাব, ২২ নং বেলুচ, এবং ৩২ নং পাঞ্জাব রেজিমেন্টের বিভিন্ন ব্যাটেলিয়ন। ২৫ মার্চের রাত্রি থেকে বিশেষ মোবাইল বাহিনী স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, ট্যাংক বিধ্বংসী রাইফেল, রকেট লাঞ্চার মার্টার ভারি ও হালকা মেশিনগানে সজ্জিত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে ফেলে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কালো রাতের ঘটনা বলতে গিয়ে ভয়াবহতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রাত বারোটার পর পাকসেনারা জগন্নাথ হলে প্রবেশ করে এবং প্রথমে মর্টার আক্রমণ চালায়, সেই সঙ্গে চলতে থাকে অবিরাম গুলি বর্ষণ। প্রথম আঘাতে ৩৪ জন ছাত্র প্রাণ হারান। ছাত্রদের কাছে আসা অনেক অতিথিও এই সময় প্রাণ হারান। এদের মধ্যে ভৈরব কলেজের হেলাল, বাজিতপুর কলেজের বাবুল পল, জগন্নাথ হলের বদরুদ্দোজা, নেত্রকোনার জীবন সরকার, মোস্তাক, বাচ্চু ওঅমর।
ওই কালো রাতেই হত্যা করা হয় ক্ষণজন্মা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দার্শনিক অধ্যাপক ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, ড. জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরদা, ড. ফজলুর রহমান খান, অধ্যাপক এম মনিরুজ্জামান, অধ্যাপক এম এ মুক্তাদির, অধ্যাপক এম আর খাদেম, ড. মোহাম্মদ সাদেক প্রমুখ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে। রোকেয়া হলের মেয়েদের ধরে নিয়ে যাওয়া হলো ক্যান্টনমেন্টে। রোকেয়া কবীর বলেন, নারীদের সরে যেতে বলা হয়েছিল। আমরা অনেক আগেই হল ত্যাগ করেছিলাম। কিন্তু ছাত্রীরা কেউ কেউ ছিলেন আন্দোলনের স্বার্থেই।
এই ভয়াবহ হামলার বিষয়ে জানাতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনতাসির মামুন বলেন, সাত মার্চ পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। মানুষ জেনে গিয়েছিল, যুদ্ধ করতে হবে, বাংলাদেশ আর পূর্ব পাকিস্তান নয়, বাংলাদেশ। ২৩ মার্চ ছিল পাকিস্তান প্রজাতন্ত্র দিবসে ঢাকায় ক্যান্টনমেন্ট ছাড়া কোথাও পাকিস্তানের পতাকা উড়েনি। এসব একদিকে যেমন প্রতিরোধের ভাষা হয়ে উঠছে, তেমনই পাকিস্তান শাসকরা ছক কষতে শুরু করেছে কীভাবে পুরো বিষয়টাতে শুরুতেই থামানো যায়। আর তারই অংশ হিসেবে ২৫ মার্চের গণহত্যার পথকে একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নেয় , এই জায়গা থেকে যে তারা বিশ্বাস করতো না, বাঙালি সম্মুখ সমরে যেতে পারবে। তিনিআরও বলেন, ২৫ মার্চে হত্যাযজ্ঞের প্রথম আক্রমনের লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ তারা এই বিশ্ববিদ্যালয়কে বাঙালির জাতীয়তাবাদের মূলকেন্দ্র বলে বিবেচনা করত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি এইদিন ভস্মীভূত করা হয় দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদ, সাপ্তাহিক গণবাংলা এবং দৈনিক পিপলের দফতর। রাতারাতি ঢাকা পরিণত হল মৃত মানুষের শহরে। ২৬ মার্চের সূর্য উঠলে দেখা গেল ঢাকা শহরজুড়ে ছিন্নভিন্ন লাশ আর ভস্মীভূত ঘরবাড়ি।
/এপিএইচ/








