রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান এখনই করা সম্ভব: প্রধান উপদেষ্টা

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ২২:৩০ আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ২৩:৪৬

রোহিঙ্গাদের প্রান্তিকীকরণের প্রক্রিয়া আর চলতে দেওয়া যাবে না উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘যেসব বৈষম্যমূলক নীতি ও কর্মকাণ্ড আজকের এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তার সমাধান এবং প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা এখনই গ্রহণ করা সম্ভব। তার জন্য পূর্ণাঙ্গ জাতীয় রাজনৈতিক মীমাংসার অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই।’

শুক্রবার (২৬ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘রাখাইনের সমস্যাগুলোর চূড়ান্তভাবে রাজনৈতিক সমাধান করাও অপরিহার্য। তবে এর জন্য রাখাইন অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট সকল জাতিসত্তার অংশগ্রহণে এমন একটি বন্দোবস্ত প্রয়োজন যেন রোহিঙ্গারা সমঅধিকার ও নাগরিকত্বসহ সমাজের অংশ হতে পারে।’

ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আমাদের প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে চলমান সংঘাত সমগ্র অঞ্চলের জন্য এক গভীর উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এটি যে শুধু আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকেই ঝুঁকিতে ফেলছে না তা নয়, বরং বাংলাদেশে আশ্রয় পাওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনকেও কঠিন করে তুলেছে। ৮ বছর পার হলেও রোহিঙ্গা সংকটের কোনও সমাধান দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। উপরন্তু, বাংলাদেশ প্রতিনিয়তই মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে বাধ্য হচ্ছে। স্পষ্টতই, সাংস্কৃতিক পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির কারণে রোহিঙ্গাদের ওপর অধিকার বঞ্চনা ও নির্যাতন রাখাইনে অব্যাহত রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী রোহিঙ্গারা, আর তাদের পরেই বৃহত্তম ভুক্তভোগী হল বাংলাদেশ। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, রোহিঙ্গা সংকট কোনোভাবেই মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনও দ্বিপাক্ষিক বিষয় নয়। আমরা শুধু একটি দায়িত্বশীল প্রতিবেশী এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে আমাদের মানবিক দায়িত্ব পালন করে আসছি।’

তহবিল সংকটের কারণে ক্যাম্পগুলোতে ন্যূনতম জীবনমান বজায় রাখার প্রয়াসও ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি তাদের জরুরি সহায়তা কার্যক্রমে মারাত্মক তহবিল ঘাটতির বিষয়ে ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে। অবিলম্বে নতুন তহবিল না এলে, মাসিক রেশন অর্ধেকে নামিয়ে এনে মাথাপিছু মাত্র ৬ মার্কিন ডলারে নামতে পারে, যা রোহিঙ্গাদের অনাহার ও অপুষ্টিতে নিমজ্জিত করবে, যা তাদের আগ্রাসী কোনও পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতে পারে। তহবিলের অতিরিক্ত কাটছাঁট হলে তা নিঃসন্দেহে সুরক্ষা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি করবে, যা ক্যাম্পের সীমানা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাই আমি বিদ্যমান দাতাদের সাহায্য বাড়াতে এবং সম্ভাব্য নতুন দাতাদের অনুদান দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি, যাতে এ বিপর্যয়কর পরিস্থিতি এড়ানো যায়।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘মানবিক সহায়তার জন্য নতুন ও বর্ধিত তহবিলের বাইরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই মিয়ানমার সরকার বা রাখাইনের অন্যান্য অংশীদারদের ওপর ইতিবাচক পরিবর্তন ও দ্রুত রাজনৈতিক সমাধানের জন্য চাপ প্রয়োগ করতে হবে। অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোকেও তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। রাখাইনে স্থিতিশীলতা আনতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যেকোনো যৌথ প্রচেষ্টায় সহযোগিতা দিতে বাংলাদেশ সদাপ্রস্তুত। আমরা আশা করি, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন বিশ্বব্যাপী দৃঢ় সংকল্প তৈরি করবে এবং রোহিঙ্গাদের জন্য বাস্তবসম্মত আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করবে, যেখানে তহবিল সংগ্রহ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। একইসঙ্গে, আন্তর্জাতিকভাবে একটি রোডম্যাপ গৃহীত হবে এবং সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।’

প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুস বলেন, ‘শুধু মিয়ানমার নয়, এ বছর আমরা পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রান্তেই সংঘাত প্রত্যক্ষ করেছি- ইউরোপ, দক্ষিণ এশিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে। বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে আমরা বাস করি। বিশ্বের আর কোনও অঞ্চলেই এত সংখ্যক পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র এত অল্প দূরত্বে অবস্থান করছে না। তাই নিরস্ত্রীকরণ ও পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তাররোধের গুরুত্ব আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারি। আমরা সময়ের সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়া বৈশ্বিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার জোর দাবি জানাচ্ছি। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানাচ্ছি। একইসঙ্গে আমরা পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের যে অধিকার প্রতিটি দেশের রয়েছে তার প্রতি সমর্থন জানাই। একটি দায়িত্বশীল দেশ হিসেবে, আমাদের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করার আগেই, এই বছর, আমরা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার আওতাধীন পারমাণবিক নিরাপত্তা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত যৌথ কনভেনশন-এ যোগদান করেছি। এই যোগদানের মাধ্যমে সর্বোচ্চ মানের পারমাণবিক নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার প্রতি আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছি।’

/এসও/এমএইচআর/
সম্পর্কিত
মিয়ানমারের বিরল খনিজ রফতানিতে জোয়ার
পাঁচ বছর পর মা সু চির সঙ্গে ফোনে কথা বলে যা জানালেন তার ছেলে
জাতিসংঘ দিবস বিভেদের বদলে সংলাপ, সংঘাতের বদলে সহযোগিতা: জাতিসংঘ মহাসচিব
সর্বশেষ খবর
জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা: উপকূলে নিঃসঙ্গ দিন কাটছে প্রবীণদের
জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা: উপকূলে নিঃসঙ্গ দিন কাটছে প্রবীণদের
ব্যালন ডি’অর জিতলে কত টাকা মেলে, সোনার বলটির আসল দাম কত?
ব্যালন ডি’অর জিতলে কত টাকা মেলে, সোনার বলটির আসল দাম কত?
‘আমাদের নীরব কান্না দেখার মতো কেউ নেই’
‘আমাদের নীরব কান্না দেখার মতো কেউ নেই’
নোবেল না পাওয়ায় নরওয়েকে ‘নোংরা’ দেশ বললেন ট্রাম্প
নোবেল না পাওয়ায় নরওয়েকে ‘নোংরা’ দেশ বললেন ট্রাম্প
সর্বাধিক পঠিত
জাপানে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হচ্ছেন কারা
জাপানে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হচ্ছেন কারা
একসঙ্গে ২৫ জেলে আটক, ৮০ কেজি ইলিশ গেলো এতিমখানায়
একসঙ্গে ২৫ জেলে আটক, ৮০ কেজি ইলিশ গেলো এতিমখানায়
ভোট দেওয়া নিয়ে অনুশোচনা ও বিএনপি সরকারের সমালোচনা করা নারী আটক
ভোট দেওয়া নিয়ে অনুশোচনা ও বিএনপি সরকারের সমালোচনা করা নারী আটক
‘শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল’-কমেন্ট কেন করেছিলেন, আদালতকে জানালেন সেই যুবক
‘শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল’-কমেন্ট কেন করেছিলেন, আদালতকে জানালেন সেই যুবক
মিয়ানমারের বিরল খনিজ রফতানিতে জোয়ার
মিয়ানমারের বিরল খনিজ রফতানিতে জোয়ার