ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে আরও বড় ভূমিকম্প হবে, বলছেন বিশেষজ্ঞরা

আতিক হাসান শুভ
২১ নভেম্বর ২০২৫, ২২:৪২ আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০২৫, ২৩:০৯

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবারও ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। তবে অন্যান্য সময়ের তুলনায় এবারের ভূমিকম্পের তীব্রতা ছিল অনেকটা বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে বাংলাদেশ বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে।

শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট ২৬ সেকেন্ড অনুভূত হওয়া এই ভূমিকম্প মাঝারি আকারের হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবদ্দশায় তারা এমন কম্পন আগে অনুভব করেননি।

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশ ব্যাপক ভূমিকম্পের ঝুঁকির মুখোমুখি। এখানকার ঘনবসতি, পুরোনো অবকাঠামো এবং বিল্ডিং কোডের দুর্বল প্রয়োগ এই বিপদগুলোকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। অবিলম্বে পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ভবিষ্যতের জন্য একটি ভয়াবহ দৃশ্য অপেক্ষা করছে।

আজ সারা দেশে যে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, এর উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদী। এর আগেও জানুয়ারি মাসের প্রথম সাত দিনে দেশে দুবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে ৭ জানুয়ারি সকালে অনুভূত হওয়া ভূমিকম্প ছিল তীব্র ধরনের। আর গত ৩ জানুয়ারি হওয়া ভূমিকম্পটি ছিল মাঝারি মাত্রার। তবে এই দুটি ভূমিকম্পেরই উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশের বাইরে ছিল।

আজকের ভূমিকম্পের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার জীবদ্দশায় এমন ভূমিকম্প আগে অনুভব করিনি। আজকের ভূমিকম্প সামনের দিনের আরও বড় ভূমিকম্পের সতর্কবাণী দিচ্ছে। এখন থেকে সাবধান না হলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে।’

ভুমিকম্পে হেলে পড়েছে ভবন

অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ূন আখতার আরও বলেন, ‘সামনে আরও বড় ভূমিকম্প হতে পারে। আজকের এই ভূমিকম্প সেই সতর্কবাণী দিচ্ছে। প্লেট যেটা আটকে ছিল, সেটা আটকানো অবস্থা থেকে খুলে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে আরও বড় ভূমিকম্প হবে। যেটা আমরা ২০১৬ সাল থেকে বলে আসছি।’

ভূমিকম্পে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শহরের তালিকায় ঢাকা

ভূমিকম্পে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি শহরের তালিকায় ঢাকা অন্যতম। ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধসের ভয়াবহ ঘটনা এখনও স্মরণ করিয়ে দেয়। ওই ঘটনায় ১ হাজার ১০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। এই ঘটনাটি দুর্বলভাবে নির্মিত ভবনগুলোর সৃষ্ট বিপদের ভয়াবহ উদাহরণ।

২০১৮ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, পল্লবী, রামপুরা, মতিঝিল ও খিলগাঁওয়ের মতো এলাকার অনেক স্থাপনা কাঠামোগত ও নকশার মান পূরণে ব্যর্থ। এর মধ্যে পুরান ঢাকার ৯০ শতাংশ ভবন ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ধসে পড়ার শঙ্কা রয়েছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

এছাড়াও চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের জৈন্তাপুর চরম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় একটি উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প অকল্পনীয় মাত্রার বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

বেশ কয়েকটি সক্রিয় ফল্ট লাইনসহ টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান দেশটিকে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকিতে ফেলেছে। ঐতিহাসিকভাবে, এই অঞ্চলে বিধ্বংসী ভূমিকম্প হয়েছে, ১৮৬৯ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে পাঁচটি বড় ঘটনা রিখটার স্কেলে ৭-এর ওপরে রেকর্ড করা হয়েছে। এরপর থেকে উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প স্তিমিত হয়ে আসছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে ভূমিকম্পে বিপর্যয়ের আগে এই নীরবতা থাকতে পারে।

ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে আরও বড় ভূমিকম্প হবে, বলছেন বিশেষজ্ঞরা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূমিকম্পের আঘাত উদ্বেগজনকভাবে বাড়তে দেখা গেছে। ২০২৪ সাল থেকে রেকর্ড করা ৬০টি ভূমিকম্পের মধ্যে তিনটি ৪ মাত্রার ওপরে এবং ৩১টি ৩ থেকে ৪ মাত্রার মধ্যে ছিল। এই ঊর্ধ্বগতি, শহর এলাকায় বিস্তৃতি এবং অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত জাতিকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে তুলে ধরছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

নগর পরিকল্পনায় ঘাটতির ফলে বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে বাংলাদেশ

২০২৪ সালের মার্চে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় (এমওডিএমআর) বাংলাদেশে আন্তদেশীয় ভূমিকম্প ঝুঁকি মূল্যায়ন চালু করে। যা জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কার্যালয় (ইউএনডিআরআর) এবং গ্লোবাল ভূমিকম্প মডেল (জিইএম) ফাউন্ডেশনের সহায়তায় একটি কার্যকর পদক্ষেপ। এই উদ্যোগটি দুর্বলতাগুলোকে চিহ্নিত করতে এবং কার্যকর কৌশলগুলোর সুপারিশ করার জন্য উন্নত সম্ভাব্য ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ ধরন, ভবনের ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং ভঙ্গুরতার মূল্যায়নকে তুলে ধরেছে।

মূল্যায়ন থেকে মূল অভ্যন্তরীণ উল্লেখযোগ্য কয়েক ত্রুটি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ত্রুটি হিসেবে উল্লেখ করা হয় নগর পরিকল্পনায় ঘাটতি। "বিল্ডিং কোডের দুর্বল প্রয়োগ এবং দ্রুত অপরিকল্পিত নগরায়ণের ঝুঁকি বাড়ায় ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়াও হাসপাতাল, জরুরি প্রতিক্রিয়া কেন্দ্র এবং সরকারি দফতরগুলোর ভঙ্গুর অবকাঠামোর কারণে ভূমিকম্পে অনেক বেশি ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে। এক্ষেত্রে জরুরি পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন।

এদিকে বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে বিশেষজ্ঞরা একটি সমন্বিত, বহুমাত্রিক ক্ষেত্রভিত্তিক পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী বিল্ডিং কোড প্রয়োগ করা, ভূমিকম্প প্রস্তুতি সম্পর্কে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের জন্য সম্পদ বরাদ্দ করা, দক্ষতার সঙ্গে বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য বেসামরিক-সামরিক সমন্বয় বৃদ্ধি করা ইত্যাদি।

হিডেন ফল্ট বাংলাদেশে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে পারে

২০১৬ সালে প্রকাশিত কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় একটি গোপন ফল্ট রয়েছে, যা বাংলাদেশে ৯ মাত্রার মতো ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে পারে। এই প্রতিবেদনে গোপন এই ফল্টকে মেগাথার্স্ট ফল্ট নামে উল্লেখ করে বলা হয়, মাইলের পর মাইল বিস্তৃত পললের নিচে এই মেগাথার্স্ট অবস্থিত। এটি দুই প্লেটের সাবডাকশন জোন বা দুই প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত মেগাথার্স্ট।

ফায়ার সার্ভিসের ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা দেশে ছয় তলা বা এর ওপরে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে ৩৬৭টি। ফাইল ছবি

এ বিষয়ে ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশে অসংখ্য ফল্ট রয়েছে। কিন্তু সেসব ফল্ট নিয়ে ভূতাত্ত্বিকরা খুব একটা চিন্তিত নয়। পার্বত্য অঞ্চলে অসংখ্য ভূ-চ্যুতি আছে। সমতল এলাকাতেও অসংখ্য চ্যুতি রয়েছে। তবে এগুলো মারাত্মক নয়। বাংলাদেশে সবচেয়ে মারাত্মক হচ্ছে সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত দুই প্লেটের সংযোগস্থল। এই অঞ্চলে গত ৮০০ থেকে হাজার বছরের মধ্যে জমে থাকা শক্তিটা বের হয় নাই। এ কারণে এ অঞ্চল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাবডাকশন জোন বা দুই প্লেটের সংযোগস্থলে যে ভূমিকম্প হয় তা খুবই ভয়াবহ। ভূমিকম্পের জন্য পরিচিত রিং অব ফায়ার, যেটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত, সেটিও সাবডাকশন জোনের অন্তর্ভুক্ত। এই অঞ্চলে যে ভূমিকম্পগুলো হয় সেগুলোর বেশিরভাগই ৭.৫-এর উপরে হয়ে থাকে। এগুলো শক্তিমত্তার দিক থেকে সবসময়ই ধ্বংসাত্মক।’

এ কারণে এই অঞ্চল নিয়ে চিন্তার বিষয় রয়েছে বলে জানান তিনি।

তবে কক্সবাজার থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত যে ফল্টলাইন রয়েছে সেখানকার শক্তি ১৭৬২ সালে বের হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। সেখানে নতুন করে শক্তি সঞ্চয় হচ্ছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। ১৯৬২ সালে টেকনাফ থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত প্রায় ৪০০ কিলোমিটার জায়গায় যে ফল্ট লাইন রয়েছে সেখানে ৮.৫ মাত্রার বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়। এর ফলে সেন্টমার্টিন আইল্যান্ড তিন মিটার উপরে উঠে আসে। এর আগে সেন্টমার্টিন আইল্যান্ড ছিল ডুবন্ত দ্বীপ। একই ভূমিকম্পে সীতাকুণ্ড পাহাড়ে কঠিন শিলা ভেদ করে নিচ থেকে কাদা বালুর উদগিরণ হয়। ওই ভূমিকম্পের কারণে বঙ্গোপসাগরে সুনামি হয়। এই সুনামির কারণে ঢাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর ধারের বাড়িঘর ভেসে গিয়ে সে সময় ৫০০ মানুষের প্রাণহানি হয়।

/এমএইচআর/এমওএফ/
সম্পর্কিত
হাসপাতালে গিয়েছিলেন মাকে দেখতে, ভবন থেকে পড়ে মেয়ের মৃত্যু
ফুটপাতে দোকান বসালেই মালামাল ক্রোক, মামলা
‘সিএনজিতে এসে’ আসিফের গাড়িতে গুলি করলো কে? যেসব তথ্য দিলো পুলিশ 
সর্বশেষ খবর
জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচের পদ থেকে সরানো হলো আশরাফুলকে
জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচের পদ থেকে সরানো হলো আশরাফুলকে
শাহজালাল মাজারের দানবাক্সে মিললো ৮৮ লাখ টাকা, বিদেশি মুদ্রা কত পেলো?
শাহজালাল মাজারের দানবাক্সে মিললো ৮৮ লাখ টাকা, বিদেশি মুদ্রা কত পেলো?
সীমান্তে ধান কাটতে বাধা, বিএসএফকে লাঠিসোঁটা নিয়ে গ্রামবাসীর ধাওয়া
সীমান্তে ধান কাটতে বাধা, বিএসএফকে লাঠিসোঁটা নিয়ে গ্রামবাসীর ধাওয়া
টঙ্গীতে মাদ্রাসায় শিশুকে যৌন নির্যাতনের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ
টঙ্গীতে মাদ্রাসায় শিশুকে যৌন নির্যাতনের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ
সর্বাধিক পঠিত
পূজার ছুটি শেষে ফিরে দেখেন বাসায় রাখা অর্ধকোটি টাকা আর ৮ ভরি স্বর্ণালঙ্কার নেই
পূজার ছুটি শেষে ফিরে দেখেন বাসায় রাখা অর্ধকোটি টাকা আর ৮ ভরি স্বর্ণালঙ্কার নেই
সাগরকন্যার সৌন্দর্যে মুগ্ধ দুই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, ঘুরলেন ভ্যানে চড়ে
সাগরকন্যার সৌন্দর্যে মুগ্ধ দুই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, ঘুরলেন ভ্যানে চড়ে
‘আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী ইউএনও’ ফেসবুকে সহকারী কমিশনারের পোস্ট
‘আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী ইউএনও’ ফেসবুকে সহকারী কমিশনারের পোস্ট
‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাত, তথ্যপ্রমাণ সামনে এনেছে বিএনপি’
‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাত, তথ্যপ্রমাণ সামনে এনেছে বিএনপি’
যাত্রীহীন নৌপথ, পেশা ছেড়ে বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছেন ট্রলার মালিক-চালকরা
যাত্রীহীন নৌপথ, পেশা ছেড়ে বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছেন ট্রলার মালিক-চালকরা