শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কুরিয়ার ইউনিটে প্রতিনিয়ত প্রতারণার শিকার হচ্ছেন গ্রাহকরা। শাহজালালের কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলো ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের যোগসাজশে দিন-দিন বাড়ছে প্রতারণা। প্রতারক চক্র কুরিয়ারের মালামালের সরবরাহে শুল্ক ও বিভিন্ন চার্জের নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে অর্থ।একই সঙ্গে গায়েব হচ্ছে কুরিয়ারে আসা মালামালও। প্রতিনিয়ত প্রতারণার অভিযোগ আসায় প্রায় ৪০টি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশও করেছে ঢাকা কাস্টম হাউজ।
বিমান বন্দর সূত্রে জানা গেছে, দেশি-বিদেশি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কুরিয়ারে মালামাল দেশে আসে। বেশির ভাগ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে কুরিয়ার সেবা না থাকায় তারা পণ্য সরবরাহ করে দেশি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। বিমানবন্দর থেকে মালামাল ছাড়াতে সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের সেবাও নিতে হয়।ফলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে সেবা না থাকার সুযোগ নেয় প্রতারক চক্র।বিমানবন্দরের কুরিয়ারে কোনও পণ্য এলে ঠিকানা ও ফোন নম্বর জেনে গ্রাহককে ফোন করে প্রতারক চক্র। মালামাল ছাড়াতে শুল্ক ও অন্যান্য চার্জের কথা বলে হাতিয়ে নেয় অর্থ। শুধু অর্থ নিয়েই থেমে যায় না প্রতারক চক্র, ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে গ্রাহকের মালামাল আত্মসাৎও করে। এছাড়া, অনেক সময় এই প্রতারক চক্র কুরিয়ার থেকে মূল্যবান পণ্যও চুরি করে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কাস্টম হাউজ সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাজ্য থেকে গত ২৩ জানুয়ারি কুরিয়ারে রাঙ্গামাটির একটি সরকারি স্কুলের শিক্ষক জয়নব আরা বেগমকে প্রায় ৮ লাখ টাকা মূল্যের মালামাল পাঠান ফ্রেডরিক স্যামনুল। ২৪ জানুয়ারি দুটি মোবাইল নম্বর (০১৭০১৮৬৪৩৭৯, ০১৯৩৬৪৪৪৯৩৮) থেকে জয়নব আরা বেগমকে জানানো হয়, কুরিয়ারে তার নামে পণ্য এসেছে এবং সেগুলো ছাড়াতে ব্যাংকের মাধ্যমে ৫৮ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হবে। জয়নব আরা বেগম ‘মেসার্স মিম-রো ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’-এর ব্যাংক হিসাবে (হিসাব নম্বর-০০১০১৭৮০৯, সোনালী ব্যাংক, উত্তরা শাখা) ৩১ জানুয়ারি ৫৮ হাজার ৫৩ টাকা জমা দেন। পরবর্তী সময়ে আবারও ফোনে কাস্টম ফি বাবদ ৯২ হাজার ২৫০ টাকা দিতে বলা হলে জয়নব তা জমা দেন ভিন্ন আরেকটি ব্যাংক হিসাবে (মোহাম্মদ আলী চৌধুরী, এ/সি-১১১ ১০১ ০১১০৮৭২, ডাচ বাংলা ব্যাংক, গুলশান শাখা)। এরপর আবারও ৩ ফেব্রুয়ারি ফোন করে জয়নবকে ডাচ বাংলা ব্যাংক হিসাবে আরও ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিতে বলে প্রতারক চক্র। এতে তার সন্দেহ হয়। তিনি আর টাকা না দিয়ে কাস্টমস হাউজ ও র্যাব-১ এ অভিযোগ করেন।
এ প্রসঙ্গে ভুক্তভোগী জয়নব আরা বেগম বলেন, কুরিয়ারে আমার পণ্য আসবে, সেটা কুরিয়ারের লোক ছাড়া অন্য কেউ জানার কথা নয় ভেবেই আমি তাদের কথা মতো টাকা দিয়েছি। কিন্তু এখন পণ্য তো পাইনি বরং আমার টাকা হারিয়েছি। র্যাবে এ বিষয়ে অভিযোগ করেছি।
জানা গেছে, ভারতীয় নাগরিক সঞ্জীব বাংলাদেশে বাণিজ্য মেলায় প্রদর্শনীর জন্য জামা-জুতাসহ অন্যান্য সামগ্রী কুরিয়ারের আনেন। কিন্তু প্রতারক চক্রের কারণে বাণিজ্য মেলায় অংশ গ্রহণ করতে পারেননি সঞ্জীব। পাশাপাশি মালামাল বুঝে পেয়ে পুনরায় তা ভারতে ফিরিয়ে নিতেও দুর্ভোগে পড়েন তিনি। পরে ঢাকা কাস্টম হাউজে ৩১ জানুয়ারি সঞ্জীব একটি লিখিত অভিযোগ করার পর পণ্য ফেরত নেওয়ায় সহায়তা পান। মূলত কুরিয়ারের মালামাল ছাড়াতে সিঅ্যান্ডএফ ফার্ম নাসিমা এন্টারপ্রাইজকে দায়িত্ব দেন সঞ্জীব। নাসিমা এন্টারপ্রাইজের স্বত্ত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম সুজন গত ২৫ জানুয়ারি ভারত থেকে আমদানিকৃত পণ্য শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই পণ্য খালাসের চেষ্টা করেন। এ সময় কুরিয়ার গেটে দায়িত্বরত কাস্টমস কর্মকর্তারা পণ্য খালাসের জন্য প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র চাইলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন নজরুল ইসলাম সুজন। এ সময় তিনি কাস্টমস কর্মকর্তা মো. ইয়াকুত জাহিদ ও মো.আবুল হাসনাতকে লাঞ্ছিত করেন। সিঅ্যান্ডএফ ব্যাবসায়ী হলেও সুজন বিমানবন্দরের নানা প্রতারণার সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় কাস্টম হাউজ থেকে বিমানবন্দর থানা (জিডির নং-১৪২/৩-২-২০১৬) সাধারণ ডায়েরি করা হয়।
প্রতারণা রোধে কাস্টম হাউজ সর্তক আছে বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান ঢাকা কাস্টম হাউজের কমিশনার মো. লুৎফর রহমান। তিনি বলেন, আগে যতটা প্রতারণার ঘটনা ঘটত, এখন তা কমেছে। আমরা সব সময় চেষ্টা করছি, গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে। প্রতারণার অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রতারণার কারণে কয়েকটি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশও করা হয়েছে।
কুরিয়ার সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি হাফিজুর রহমান পুলক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিমানবন্দরে পণ্য চুরি হওয়া বা খোয়া যাওয়ার জন্য শুধু কুরিয়ারের দোষ দেওয়া যাবে না। কাস্টমস, বিমান, সিভিল এভিয়েশনের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গ্রাহকের ব্যাগ বা লাগেজ কেটে চুরি করেন। বেশি চার্জ নেওয়ার অভিযোগ আমরাও পেয়েছি, কিন্তু কেউ প্রতারিত হয়েছেন, এমনটা আমাদের জানা নেই। তবে কেউ যদি অভিযোগ নিয়ে আসেন, আমরা যথাযাথ ব্যবস্থা নেব।
/সিএ/ এমএনএইচ/আপ- এপিএইচ/








