ঢাবিতে পুলিশের বহুতল ভবন নির্মাণ

আলোচনায় বসছে দু’পক্ষ, আন্দোলনের হুঁশিয়ারি ছাত্র সংগঠনগুলোর

সাদিকুর রহমান
১০ এপ্রিল ২০১৬, ০১:৫৩আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০১৬, ০৮:১৯

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল ও আনোয়ার পাশা ভবনের পাশের বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়ির জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশ প্রশাসন উভয়েই জমিটি তাদের মালিকানার বলে দাবি করছে। ফাঁড়ির জায়গায় পুলিশের জন্য ২০ তলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা এই ভবন নির্মাণ না করতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। তাদের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে ভবনের নির্মাণ কাজ চলতে থাকলে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো। অন্যদিকে জমির মালিকানা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ প্রশাসন আলোচনায় বসতে চাচ্ছে। বিভিন্ন মহলের বিরোধিতায় ভবন নির্মাণ স্থগিত রয়েছে।  
এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়ির জমিটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই। যেহেতু পুলিশও ওই জমির মালিকানা দাবি করছে তাই তাদের (পুলিশ) সঙ্গে এ বিষয়ে দ্রুত আলোচনায় বসবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।’
পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক(এস্টেট) শোয়েব রিয়াজ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভবন নির্মাণের কাজ এখন স্থগিত রয়েছে। আমরাও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে বসবো। তার সঙ্গে আলোচনার পর জমির মালিকানার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। ভবন নির্মাণ কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে কিনা সেটা ওই আলোচনার পরই বোঝা যাবে।’
জমির মালিকানা বিশ্ববিদ্যালয়েরই দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট বিভাগের ব্যবস্থাপক সুপ্রিয়া দাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠাকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ যে ৬০০ একর জমির কথা বলা হয় তা বিশ্ববিদ্যালয়কে কখনও বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।  ১৯৩৪-৩৫ সালের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়কে ২৫২ একর জায়গা বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পরে এর মধ্যে অনেক জায়গা সরকার নিয়ে সরকারি অফিস আদালত করে। তখনও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার কোনও সীমানা প্রাচীর ছিল না। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকারের তৎকালীন গভর্নর আজম খানের কমিশন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একটি সীমানা প্রাচীর করে দেয়। এ প্রাচীর ফজলুল হক হলের পাশে এখনও রয়েছে। বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়ি এই সীমানার মধ্যেই পড়েছে। সে হিসেবে তো এটি বিশ্ববিদ্যালয়েরই জায়গা।’
জমির মালিকানার বিষয়ে আজম খান কমিশনের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (এস্টেট) বলেন, `বিশ্ববিদ্যালয় এস্টেট কর্তৃপক্ষ আজম খান কমিশনের কথা বলে জমির মালিকানা দাবি করছেন। কিন্তু ১৯৩৪ সালে গণপূর্ত অধিদফতর পুলিশকে জমিটি বরাদ্দ দেয়। সিএস এবং আরএস রেকর্ডে এটি পুলিশের নামে রয়েছে। এখন যদি তারা জমিটির মালিকানা চায় তাহলে তাদের কিছু প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। শুধু কমিশনের কথা বললেই কি জমি তাদের হবে? পুলিশ যদি এখন কোনও কমিশনের কথা বলে তাহলে কি তারা সেটা মেনে নেবেন?'
বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিন বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়িতে দেখা যায়, ভবন নির্মাণ স্থগিত রয়েছে। নির্মাণ সামগ্রী এখনও সেখানে রয়েছে। ভেতরে পড়ে আছে ভবন নির্মাণ করার জন্য কেটে ফেলা শতবর্ষী গাছের কয়েকটি গুড়ি। ফাঁড়িতে মোট ঘর রয়েছে ৫টি।

ফাঁড়িতে দায়িত্বরত এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেড় মাস আগে এখানে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। প্রথমে ফাঁড়ির জন্য যে ঘর রয়েছে সেটিকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য তার পাশে একটি ঘর নির্মাণের কাজ শুরু হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নেতারা ও ফজলুল হক হলের আবাসিক শিক্ষকরা এসে বাধা দেওয়ায় গত সপ্তাহ থেকে নির্মাণ কাজ স্থগিত রয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, যে ঘরের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে সেখানে ফাঁড়ি স্থাপন করা হবে। আর এখন ফাঁড়ি যে জায়গায় আছে সেখানে হবে ভবন নির্মাণের কাজ। তবে মূল ভবন নির্মাণের কাজ এখনও শুরু হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হলে তা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হবে বলে মনে করছেন হলের শিক্ষার্থীরা। তারা বলছেন বহুতল ভবন নির্মিত হলে একদিকে যেমন হলটি আবদ্ধ হয়ে যাবে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশও।

ফজলুল হক হলের ভূতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফ হোসেন বলেন, `ভবন যেখানে নির্মাণের কথা হচ্ছে তার পাশেই হলের ছাত্রদের থাকার জন্য ভবন রয়েছে। সুতরাং এখন যদি ওখানে পুলিশের কোয়ার্টার নির্মাণ করা হয় তাহলে হলের এই ভবনটা আড়ালে পড়ে যাবে। একটি বদ্ধ পরিবেশের সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি নির্মাণ কাজের ধকল তো আছেই।'

আরিফ হোসেন আরও বলেন,` যতটুকু নির্মাণ কাজ হয়েছে তার সবটাই রাতের বেলা করা হয়েছে। দিনের বেলায় কোনও কাজ হয়নি। গাছগুলোও রাতের বেলায় কাটা হয়েছে। কিন্তু ভবন যখন নির্মাণ হবেই তখন এতো লুকোচুরি কেন?'

বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মাজহারুল কবির শয়ন বলেন,‘ দিনদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়তন কমে যাচ্ছে। ক্যাম্পাস এখন অনেকটাই খামারে পরিণত হচ্ছে। এর কারণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার অনেক জায়গা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ছেড়ে দিচ্ছে। এখন আবার ক্যাম্পাসের ভেতর পুলিশের ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। দাবি করা হচ্ছে জায়গাটি পুলিশের। প্রশাসন যদি ক্যাম্পাসের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে চায় তাহলে এ ভবন নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। এর জন্য প্রশাসনকে আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে হবে। মূলত এর মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত হবে জায়গাটি কার।' 

ক্যাম্পাসে পুলিশের বহুতল ভবন নির্মাণ কাজ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা না হলে আগামীতে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো। পাশাপাশি এটিকে সূদুর প্রসারী চক্রান্ত হিসেবেও দেখছেন তারা।

ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি লিটন নন্দী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, `এই ভবন নির্মাণের পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও অনুমতি নেওয়া হয়নি। একদিক থেকে এটি একটা অন্যায় কাজ। আমাদের ক্যাম্পাসে শতবর্ষী গাছ কাটারও একটা নিয়ম আছে। কেউ চাইলেই এ গাছগুলো কেটে ফেলতে পারবে না। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ভেতরে এত বড় একটি ভবন নির্মাণ করা কতটা যৌক্তিক! এটা ক্যাম্পাসের পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তাই আশা করি অতি সত্ত্বর তারা এ কাজ করা থেকে দূরে সরে আসবে।'

তিনি আরও বলেন, ‘ক্যাম্পাসের ভেতর বাবুপুরা আর নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে। কিন্তু এগুলো থাকার কোনো যৌক্তিকতা নেই। কেননা এখন ক্যাম্পাসের পাশেই নিউমার্কেট থানা আছে, আবার এদিকে শাহবাগ থানা, বংশাল থানাও আছে। এতগুলো থানার মধ্যে এই ফাঁড়িগুলোর আর কোনও প্রয়োজন নেই। এটি একটি সূদুর প্রসারী চক্রান্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশকে থানা দিয়ে ঘিরে ফেলা হচ্ছে।'

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার একাংশের সভাপতি ইভা মজুমদার বলেন,শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন আন্দোলন দমন করার জন্য ক্যাম্পাসের চারপাশে পুলিশের ফাঁড়ি ও থানা বসানো হচ্ছে। এখন আবার পুলিশের কোয়ার্টারও নির্মাণ করা হবে। যা ক্যাম্পাসের গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। নির্মাণ কাজ চলতে থাকলে ঢাবি সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের পক্ষ থেকে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।’ 

একই কথা বলেন ঢাবি ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ত্বাসীন মাহমুদ। তিনি বলেন,‘পুলিশের ভবন নির্মাণ বন্ধ ও শতবর্ষী গাছ কাটার প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে বেশকয়েকবার মানববন্ধন হয়েছে।ফেডারেশনের পক্ষ থেকেও তাতে অংশগ্রহণ ছিলো। নির্মাণ কাজ আবার শুরু হলে তখন ছাত্র ফেডারেশনের পক্ষ থেকেই এর প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করবো।’ 

এদিকে ভবন নির্মাণের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভুল ধারণ রয়েছে বলে মনে করেন রিয়াজ আলম।। তিনি বলেন,পুলিশের কোয়ার্টার শিক্ষার্থীদের থাকার ভবনের কাছে হবে না।এটি হবে শিক্ষকদের যে আবাসিক ভবন রয়েছে তার পাশে।ফাঁড়ি থাকবে শিক্ষার্থীদের ভবনের পাশে। এটি প্রথমে ২ তলা পর্যন্ত করা হবে, ১০-১২ বছর পর এটি ১০ তলায় উন্নীত হবে।অন্যদিকে কোয়ার্টারে প্রথমে ৪-৫ তলার কাজ হবে। পরে সেটি ২০ তলায় উন্নীত করা হবে।শিক্ষার্থীদের হলের ভেতরেও তো ২টি উচ্চ ভবন রয়েছে। তাতে যদি পরিবেশের সমস্যা না হয় তাহলে এই ভবনের জন্যও কোনও সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

/এসআর/এমপি/এমএসএম/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম