ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় (বাজেট) অধিবেশনের ৬৮ বিধিতে মঙ্গলবার আলোচনায় গুরুত্ব পায় ইসলামী ব্যাংক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতাসহ বেশ কয়েকজন এমপি বিষয়টি কথা বলেন। তবে আলোচনার শুরুতেই এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয় যাতে বিরোধী দলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ আবু তাহের স্পিকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বক্তব্য না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এছাড়া কবিতার ছন্দে বিরোধী দলকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর খোঁচা, জামায়াত আমিরের এতগুলো কামানের জবাবে আট মিনিট মন্তব্য ছিল উল্লেখযোগ্য।
‘অসুস্থ মানুষ তো, আবেগে দাঁড়ায়া গেছেন’
বক্তব্যের ক্রম ও সময় নির্ধারণের স্পিকার বিরোধী দলীয় উপনেতাকে বক্তব্য দিতে সাত মিনিট সময় দেন। স্পিকার সময় দেওয়ার পর সৈয়দ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ তাহের নিজের চেয়ারে বসেছিলেন। তখন পাশ থেকে অপর এক এমপিকে বলতে শোনা যায়, বসে বলবেন?
তখন স্পিকার জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কি বসে বলতে চান?’ তখন ‘জ্বি না’ বলে আবু তাহের উঠে দাঁড়াতে চাইলে পাশে থাকা বিরোধী দলীয় নেতাও তখন উঠে দাঁড়ান এবং তাকে বলেন, আপনি বসে বলেন। একটু চাপ হয়ে যাবে। আমার রিকুয়েস্ট শোনেন।
আবু তাহের বসার পর জামায়াত আমির তখন স্পিকারের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘অসুস্থ মানুষ তো। আবেগে দাঁড়ায়ে গেছেন।’ এ সময় স্পিকার একটু হাসেন। জামায়াত আমির বলে চলেন, আপন সুযোগ দিলে উনি বসেই কথা বলতে পারেন।
স্পিকার তখন বলেন, বিরোধী দলীয় উপনেতাকে মাইক দিন। উনি বসে বসেই বলবেন।
বক্তব্যের ক্রম পরিবর্তন করলেন সরকারি চিফ হুইপ
আলোচনার শুরুতে সরকারি দলের চিফ হুইপ বক্তব্যের সময় বণ্টন নিয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, সরকারি দলের পক্ষ থেকে দুই সদস্য ও দুই মন্ত্রী বক্তব্য দেবেন। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে পাঁচ বা ছয়জন বক্তা থাকতে পারেন বলে উল্লেখ করে তিনি সময় বণ্টনের বিষয়টি পরিষ্কার করার আহ্বান জানান।
এ সময় স্পিকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদের নাম ঘোষণা করলে চিফ হুইপ দাঁড়িয়ে জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন বক্তব্য দেবেন না; তিনি বিরোধীদলীয় নেতার আগে কথা বলবেন। আর অর্থমন্ত্রী সবশেষে বক্তব্য দিয়ে পুরো আলোচনা উপসংহারে আনবেন।
স্পিকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আবু তাহেরের প্রতিবাদ
এরপর স্পিকার বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ আবু তাহেরের নাম ঘোষণা করে তাকে সাত মিনিট সময় দেন। অসুস্থতার কারণে বসে বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি পেয়ে তিনি স্পিকারের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ‘আপনি তো এই সংসদের একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি। কিন্তু একটু আগে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। স্পিকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়ার পর সিট থেকে দাঁড়িয়ে আবার সেটি পরিবর্তন করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে আমি আজ কোনও বক্তব্য রাখব না।’
এর জবাবে স্পিকার বলেন, বক্তব্য দেওয়া বা না দেওয়া সম্পূর্ণ সদস্যের নিজস্ব বিষয়। তবে সংসদীয় রেওয়াজ অনুযায়ী সরকারি ও বিরোধী দলের চিফ হুইপ বক্তাদের ক্রমে কিছু পরিবর্তনের সুপারিশ করতে পারেন। তিনি বিরোধীদলীয় উপনেতাকে বক্তব্য চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানান।
পরে আবার বক্তব্য দিতে উঠে আবু তাহের বলেন, “বক্তাদের তালিকা ও ক্রম নির্ধারণের পূর্ণ এখতিয়ার স্পিকারের। কিন্তু ঘোষণার পর পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে একটি অপ্রিয় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। আপনি এলাও করেছেন এবং আপনি আপনার নিরপেক্ষতা হারিয়েছেন।”
অভিযোগের পক্ষে ভারতের সংসদের একটি ঘটনার উদাহরণও তুলে ধরেন বিরোধী দলের উপনেতা। তিনি বলেন, সেখানে স্পিকারের আচরণ নিয়ে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছিল এবং বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা হয়েছিল। একইভাবে বাংলাদেশের সংসদেও ঘোষিত ক্রম পরিবর্তনের কারণ ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জবাবে স্পিকার বলেন, সংসদে বক্তাদের ক্রম নির্ধারণের ক্ষমতা স্পিকারের রয়েছে। তবে এতে কোনও নিয়মভঙ্গ হয়নি। তিনি বলেন, ‘সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতার নির্ধারিত ক্রম ভাঙা হয়নি। উভয় দলের মধ্যে এখনও সহযোগিতার পরিবেশ রয়েছে।’
ভারতের সংসদের উদাহরণের প্রসঙ্গ টেনে স্পিকার বলেন, সংসদ নেতার কিছু বিশেষাধিকার থাকে। সে কারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সময় বা অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে।
পরে তিনি বলেন, ‘এটা অত্যন্ত তুচ্ছ বিষয়। দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে। আমি মনে করি, এ ধরনের ছোটখাটো বিষয় পাশ কাটিয়ে মূল আলোচনায় মনোযোগ দেওয়া উচিত। এতে জাতি উপকৃত হবে।’
স্পিকারের ব্যাখ্যা ও অনুরোধের পর বিরোধীদলীয় উপনেতা আবার বক্তব্য দিতে সম্মত হন। তবে তিনি বলেন, ‘আপনি যেহেতু অনুরোধ করেছেন, আমি আপনার অনুরোধ রাখব। তবে আলোচনা করার যে মুড আমার ছিল, সত্যি বলতে আমি সেটা হারিয়ে ফেলেছি।
কবিতায় বিরোধী দলকে খোঁচা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
‘আলহামদুলিল্লাহ, আসসালাতু আসসালামু আলা রাসুলিল্লাহ। আবারও আলহামদুলিল্লাহ, অন্ততপক্ষে মাননীয় বিরোধী দল জামায়াত ইসলাম ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা দাবি করেন নাই’ স্যুটের বোতাম লাগাতে লাগাতে এই কথাগুলো বলে বক্তব্য শুরু করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ। তিনি যখন এই কথাগুলো শেষ করেন তখন সরকার দলীয় এমপিরা টেবিল চাপড়িয়ে তার কথাকে সমর্থন জানান।
তিনি বলে চলেন, ‘আপনারা বলেছেন যে ন্যায়নীতির পথে ফেরত আসতে হবে। ওই ন্যায়নীতির পথে ফেরত আসার জন্যই বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, আমরা মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতার এবং জামায়াত ইসলামের দুঃখ বুঝবো না, মাননীয় স্পিকার।’
সালাহ উদ্দিন বলেন, “ওই আছে না, ‘চিরসুখীজন ভ্রমে কি কখন/ ব্যথিতবেদন বুঝিতে পারে।/ কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে/ কভূ আশীবিষে দংশেনি যারে।’
এসময়ও সরকার দলীয় এমপিদের টেবিল চাপড়াতে দেখা যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখনও না থেমে বলেন, এটি বাঙালি কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের কবিতা। তার আরও কয়েকটা লাইন আছে, ‘যতদিন ভবে, না হবে না হবে/তোমার অবস্থা আমার সম।/ঈষৎ হাসিবে, শুনে না শুনিবে/বুঝে না বুঝিবে, যাতনা মম।’
কবিতার পংক্তি পাঠ শেষে বাঁ দিকে কাউকে হাত দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে কবি বেশি আছে মাননীয় স্পিকার।’ তার এই কথাতেও টেবিল চাপড়ান সরকারি দলের এমপিরা।
‘আপনাকেও কামান দেওয়া হবে’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পর বক্তব্যের সুযোগ পান বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াত ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। স্পিকার তাকে আট মিনিট সময় দেন। উঠে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘এতগুলো কামানোর পরে মাত্র আট মিনিট।’ তার এই কথায় এমপিদের মধ্যে হাসির রোল ওঠে।
তখন স্পিকার বলেন, ‘আপনাকে...আপনাকে কামান দেওয়া হবে। বলতে থাকেন।
তখন বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ‘আমি বলতে থাকি, আপনি যখন থামায়ে দিবেন আমি থামে যাবো।’ তখন স্পিকার তাকে ধন্যবাদ জানান। জামায়াত আমিরও স্পিকারকে পাল্টা ধন্যবাদ দিয়ে বক্তব্য শুরু করেন।









