‘নারী-শিশুদের সহায়তা দেওয়া কলসেন্টারের কর্মরতরা তিন বছর বেতন পান না’ 

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
১০ জুন ২০২৬, ২০:৪৩আপডেট : ১০ জুন ২০২৬, ২০:৪৩

নারী ও শিশুদের তাৎক্ষণিক সহায়তার জন্য হেল্পলাইন (১০৯) কলসেন্টারের কর্মরতা দুই থেকে তিন বছর যাবত কোনও বেতন পান না বলে সংসদকে জানিয়েছেন মহিলা ও শিশু বিষয়কমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন। 

বুধবার (১০ জুন) সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরীর ৭১ বিধিতে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশের প্রেক্ষিতে এই তথ্য জানান তিনি। 

নিপুণ রায় চৌধুরী বলেন, “নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা আজ আমাদের সমাজের গভীরতম উদ্বেগগুলোর একটি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউএনএফএ-এর ভায়োলেন্স অ্যাগেইস্ট ওমেন সার্ভে ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে ৭৬ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার স্বামী বা ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন এবং ৬২ শতাংশ ভুক্তভোগী কখনও তাদের অভিজ্ঞতা কারও কাছে প্রকাশ করেননি। এই নীরবতা শুধু ভয় বা লজ্জার বিষয় নয়; এটি সহায়তা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা, নিরাপত্তা ও সহজপ্রাপ্যতার প্রশ্নও সামনে আনে। একজন নারী হিসেবে, একজন মা হিসেবে আমি প্রশ্ন করতে চাই, একজন নারী যদি ঘরেও নিরাপদ না হন, একটি কন্যাশিশু যদি পরিচিত পরিবেশেও নিরাপদ না থাকে, তবে আমরা তাকে স্বাধীনভাবে বাঁচার কোন সাহস দেবো?”  

নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়, “নির্যাতনের পর একজন ভুক্তভোগীকে আমরা শুধু মামলার বাদী বা প্রমাণের অংশ হিসেবে দেখতে পারি না। তিনি একজন মানুষ, যার শরীরের চিকিৎসা যেমন জরুরি, তেমনি তার মনের আঘাত, নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক ভয়, শিক্ষা বা জীবনে ফিরে যাওয়ার পথও সমান জরুরি। বিচার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে, কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়ার পাশাপাশি ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো, তাকে মানসিক সহায়তা দেওয়া, নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা, আইনি সহায়তা দেওয়া এবং মর্যাদার সঙ্গে সমাজে পুনর্বাসনের পথ তৈরি করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।  

“মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারও ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেল ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুকে এক স্থান থেকে চিকিৎসা, ফরেনসিক সহায়তা, পুলিশি ও আইনি সহায়তা, মনোসামাজিক পরামর্শ, আশ্রয়-রেফারেল এবং পুনর্বাসন সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা। এখন জনস্বার্থে জরুরি হলো, এই কেন্দ্র ও সেলগুলো কতটি জেলায় কার্যকরভাবে সেবা দিচ্ছে, সর্বশেষ প্রতিবেদিত বছরে কতজন ভুক্তভোগী কোন কোন সেবা পেয়েছেন, কতটি কেন্দ্রে প্রশিক্ষিত জনবল ও রেফারেল ব্যবস্থা রয়েছে এবং সেবার মান কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে হালনাগাদ জেলা-ভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করা।  

“অতএব, দেশের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারও ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেলের বর্তমান কার্যকারিতা, জেলা-ভিত্তিক হালনাগাদ তথ্য, সেবাভিত্তিক পরিসংখ্যান এবং ভুক্তভোগীবান্ধব সমন্বিত সহায়তা সেবা শক্তিশালী করতে মন্ত্রণালয় কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বা গ্রহণ করতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে মাননীয় মন্ত্রীর বিবৃতি প্রার্থনা করছি।”  

পরে এই বিষয়ে মহিলা ও শিশু বিষয়কমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, “দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন সেই সময় খুরশিদ জাহান হক শিশু এবং মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। ওই সময় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বের সরকার সর্বপ্রথম ক্রাইসিস সেন্টার প্রচলন করেছে। কাজেই এর ধারাবাহিকতায় ননস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারগুলো তখন সর্বপ্রথম আটটি পুরনো মেডিক্যাল কলেজে স্টার্ট হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এটি ১৪ অর্থাৎ আরও ছয়টি যে নতুন মেডিক্যাল কলেজ সেখানে চালু হয়েছিল। এখানে চিকিৎসাও যেমন দেওয়া হবে, আইনি সহায়তা তেমন দেওয়া হবে এবং এই আইনি সহায়তা পাওয়ার জন্য যে আপনার ডিএনএ অর্থাৎ সাপোর্ট বা ফরেনসিক সহায়তা যাকে আমরা বলি সেটি এবং সেই সঙ্গে তাদেরকে পুনর্বাসন করা এবং সমাজে পুনর্বাসিত করার সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্যই ক্রাইসিস সেন্টার চালু করা হয়। ১৪টি ওসিসি ছিল। পরবর্তীকালে শুধুমাত্র একটি যোগ হয়েছে এখন ১৫টি ওসিসি রয়েছে। প্রত্যেকটির জন্য ২২ জন করে জনবল থাকার কথা। তার মধ্যে চার জন চিকিৎসক, ছয় জন নার্স, চার জন পুলিশ কর্মকর্তা, একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, একজন আইন কর্মকর্তা, একজন সহায়ক মানে কম্পিউটার অপারেটর সহায়ক আরও পাঁচ জন।”   

এই পর্যন্ত ওসিসির মাধ্যমে ৮১ হাজার ৯২৮ জনকে সেবা দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের শিকার ৪৯ হাজার ৭৬৭ জন, যৌন নির্যাতনের শিকার ৩১ হাজার ৫৯৬ জন এবং বিভিন্নভাবে অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন এমন ৫৬৫ জনকে সেবা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।  

মন্ত্রী বলেন, “বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর ৩৭টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) চালু করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। অচিরে এটার সুফল পাওয়া যাবে। আমাদের টার্গেট হচ্ছে যে আগামীতে ৬৪টি জেলা এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের প্রত্যেকটি উপজেলায় পর্যায়ক্রমে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেল এবং ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার করা। আগে ছিল ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেল, পরবর্তী সময়ে হয়েছে মাল্টি সেক্টর এপ্রোচ। আর এখন এটার নতুন নামকরণ হয়েছে কুইক রেসপন্স টিম। অর্থাৎ ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে যাতে সেখানে তড়িৎ গতিতে সেই ভিকটিমের পাশে ঘটনার সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত তাদেরকে আইনে  সোপর্দ করা এবং যারা ক্ষতিগ্রস্ত তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য কিউআরটি প্রোগ্রাম নেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যেই এখন আমাদের মন্ত্রণালয় কাজ করছে।”  

নিপুণ রায় চৌধুরীর আরেক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, “এটি একটি সামাজিক ব্যাধি এবং সেজন্য প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমরা আলোচনা করেছি। এটার জন্য একটি জনসচেতনতা বা গণআন্দোলন তৈরি করতে চাই। গণসচেতনতা যদি তৈরি করা না যায়। তাহলে সমাজে নারী এবং শিশুদের অধিকার সুরক্ষা করা এবং তাদের বিরুদ্ধে যে সহিংসতা ঘটনাগুলো ঘটছে তা প্রতিরোধ করা শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সম্ভব নয়। সামগ্রিকভাবে সরকারি ও বিরোধী দল, সংসদের বাইরে যারা আছে তাদের সবাইকে নিয়ে আমরা একটি সচেতনামূলক প্রোগ্রাম ফর্মুলেট করেছি। কেন্দ্রীয়ভাবে সেন্ট্রাল থেকে শুরু করে একদম প্রত্যেক ইউনিয়নের প্রত্যেকটি ওয়ার্ডের কিশোর কিশোরীদের ক্লাব, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষক সবাইকে নিয়ে এই ধরনের গণসচেতনতা কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে।”  

মন্ত্রী বলেন, “বিগত ১৭ বছর যারা ক্ষমতায় ছিলেন, তারা এই প্রোগ্রামটির প্রতি কোন গুরুত্ব দেয়নি। তারা অনেক কথা মুখে বলেছে কিন্তু ক্রাইসিস সেন্টার বাড়ানোর জন্য কোনও চেষ্টা করে নাই। এটাকে গলা টিপে বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এতে মোটিভেট করার জন্য সংশ্লিষ্টদের সুযোগ-সুবিধা কিছুই করা হয় নাই। আমরা এসে দেখেছি কল সেন্টারের নাম্বার হচ্ছে ১০৯ নম্বরে (হেল্পডেস্ক) যারা কাজ করছে। দুই-তিন বছর যাবৎ তারা কোনও বেতন পাচ্ছেন না। আমরা এইবার আসার পর উদ্যোগ গ্রহণ করেছি তাদের থোক বরাদ্দ থেকে বেতন চালু করার জন্য। কাজেই এখানে একটি অত্যন্ত সুচতুরভাবে এই দেশের মানুষকে সেবা পাওয়া থেকে বিরত রাখা এবং এক ধরনের প্রতিহিংসার মানসিকতা থেকে দেশের মানুষকে এই সমস্ত কর্মসূচি থেকে যাতে কোনও সেবা গ্রহণ করতে না পারে। সেই লক্ষ্যে কাজ করা হয়েছে।”  

মন্ত্রী আরও বলেন, “আমরা একদিকে যেমন আমাদের কার্যক্রমকে ব্যাপ্তি ঘটানোর জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। অপরদিকে কী কী প্রতিকার নেওয়ার ব্যবস্থা আছে, সেটি ছড়িয়ে দেওয়া এবং প্রতিরোধ করার জন্য মানুষকে উৎসাহিত করা, জনগণকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার কাজ করছে।”  

/এসএমএ/এসটি/ 
সম্পর্কিত
প্রবাসীদের সুরক্ষা ও কল্যাণে কাজ করছে সরকার: শামা ওবায়েদ 
প্রবাসীদের সুরক্ষায় সংসদীয় কমিটি গঠনের আহ্বান হান্নান মাসউদের
এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে নতুন শ্রমবাজার খুঁজছে সরকার: প্রতিমন্ত্রী
সর্বশেষ খবর
হাইতিতে জাতিসংঘের নতুন বাহিনীতে অংশ নেবে বাংলাদেশ: সেনাপ্রধান
হাইতিতে জাতিসংঘের নতুন বাহিনীতে অংশ নেবে বাংলাদেশ: সেনাপ্রধান
প্রবাসীদের সুরক্ষা ও কল্যাণে কাজ করছে সরকার: শামা ওবায়েদ 
প্রবাসীদের সুরক্ষা ও কল্যাণে কাজ করছে সরকার: শামা ওবায়েদ 
ঘৃণ্য অপরাধের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে: আইনমন্ত্রী 
ঘৃণ্য অপরাধের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে: আইনমন্ত্রী 
ঢাকার খাল রক্ষায় বিশেষ কমিটি
ঢাকার খাল রক্ষায় বিশেষ কমিটি
সর্বাধিক পঠিত
একসময় আমদানিনির্ভর রেলের ১৬০ ধরনের যন্ত্রপাতি তৈরি হচ্ছে এক উপজেলাতেই
একসময় আমদানিনির্ভর রেলের ১৬০ ধরনের যন্ত্রপাতি তৈরি হচ্ছে এক উপজেলাতেই
যে যুক্তিতে খালাস পেলেন নাসির-তামিমা
যে যুক্তিতে খালাস পেলেন নাসির-তামিমা
সচিবালয়ে টেলিফোন তার চুরির পর এবার প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ল্যাপটপ চুরি
সচিবালয়ে টেলিফোন তার চুরির পর এবার প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ল্যাপটপ চুরি
বাজেটের আগে স্বর্ণের ভরিতে কমলো ৬ হাজার ৫৯১ টাকা
বাজেটের আগে স্বর্ণের ভরিতে কমলো ৬ হাজার ৫৯১ টাকা
ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, ঘুরে দাঁড়ালো শেয়ারবাজার
ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, ঘুরে দাঁড়ালো শেয়ারবাজার