মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় আজ দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। শ্রম সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে উভয় নেতা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কের গুরুত্ব স্বীকার করে বলেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুবিধার্থে দুই নেতা তাদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এমবিএফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরুর ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছে, তাকে দুই নেতা স্বাগত জানান। উভয় পক্ষই পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট, সর্বাঙ্গীণ ও ভবিষ্যতমুখী একটি চুক্তি ২০২৭ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে, যা বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্য অনুশীলনকে প্রতিফলিত করবে।
দুই প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল (জেবিসি) প্রতিষ্ঠায় অর্জিত অগ্রগতিকে স্বাগত জানান। এটি দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে কাঠামোগত সংলাপ ও সক্রিয় সহযোগিতা সহজতর করার পাশাপাশি ধারণা বিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও সম্প্রসারিত হবে।
বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং স্থিতিশীল অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বৃদ্ধির গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে নেতারা টেলিযোগাযোগ, জ্বালানি, অবকাঠামো (যেমন সড়ক, সেতু, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার), বন্দর ও লজিস্টিক, হালাল শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং এবং অন্যান্য উচ্চমূল্যের শিল্প খাতে বৃহত্তর সহযোগিতাকে উৎসাহিত করেন।
দুই দেশের সরকারি সংস্থা, বিনিয়োগ প্রসার সংস্থা, শিল্পসংগঠন ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে বিনিয়োগের সুযোগ, কারিগরি সহযোগিতা, দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, মেধা বিকাশ, বাণিজ্যিক সংযোগ এবং কৌশলগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
হালাল শিল্প
নেতারা বৈশ্বিক ইসলামী অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক সম্ভাবনার কথা স্বীকার করেন। হালাল ইকোসিস্টেমের উন্নয়নে মালয়েশিয়ার দক্ষতা ও ব্যাপক অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি দিয়ে তারা বাংলাদেশের হালাল খাতের উন্নয়নে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারে সম্মত হন।
তারা হালাল ইকোসিস্টেমে সহযোগিতা বিষয়ক নোট বিনিময়কে স্বাগত জানান এবং মালয়েশিয়ার ডিপার্টমেন্ট অব ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট (জেএকিআইএম) ও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের মধ্যে চলমান সহযোগিতার প্রশংসা করেন। হালাল সনদ, নিয়ন্ত্রক কাঠামোর উন্নয়ন, পেশাজীবীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, গবেষণা ও উদ্ভাবন, প্রশিক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও জোরদারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন তারা।
ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রতিযোগিতার চালিকাশক্তি হিসেবে ডিজিটাল রূপান্তরের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের স্বীকৃতি দিয়ে দুই দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল অর্থনীতি, আর্থিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল প্রশাসন, সাইবার নিরাপত্তা এবং অন্যান্য উদীয়মান প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারে সম্মত হয়।
এ প্রসঙ্গে দুই দেশের সরকারি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি খাতের অংশীদারদের মধ্যে সহযোগিতা ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে স্বাগত জানান নেতারা। তারা সক্ষমতা বৃদ্ধি, জ্ঞান বিনিময়, ডিজিটাল উন্নয়নে মালয়েশিয়ার দক্ষতার ব্যবহার এবং বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে একমত হন।
সেমিকন্ডাক্টর প্যাকেজিং, টেস্টিং এবং আউটসোর্সড সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলি অ্যান্ড টেস্ট (ওস্যাট) সেবায় মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক অবস্থানকে স্বীকৃতি দিয়ে নেতারা বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল আইটি ও প্রকৌশল খাতের সঙ্গে এই পরিপক্ব ইকোসিস্টেমের সেতুবন্ধন গড়ে তোলার বিষয়ে সম্মত হন।
বাংলাদেশ একটি দ্বিপাক্ষিক প্রতিভা সহযোগিতা কাঠামোর প্রস্তাব দেয়, যার আওতায় উভয় দেশ যৌথভাবে কাঠামোবদ্ধ কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশি প্রকৌশল স্নাতকদের দক্ষতা বৃদ্ধি করবে। এতে বিশেষজ্ঞ বিনিময় এবং সর্বোত্তম অনুশীলন ভাগাভাগির বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এ ধরনের সহযোগিতা সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিস্থাপকতা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে ভূমিকা রাখতে পারে।
শিক্ষা ও পর্যটন সহযোগিতা
মালয়েশিয়ায় প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর উপস্থিতি এবং দুই দেশের একাডেমিক বিনিময় ও আর্থসামাজিক সংযোগে তাদের ইতিবাচক অবদানের স্বীকৃতি দেন দুই নেতা।
তারা কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (টিভিইটি) খাতে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়-টু-ইউনিভার্সিটি অংশীদারত্ব, যৌথ গবেষণা কার্যক্রমসহ শিক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারে একমত হন।
উভয় পক্ষ পারস্পরিক স্বীকৃত যোগ্যতা, যৌথ ডিগ্রি পাঠক্রম এবং নমনীয় শিক্ষণপদ্ধতি সম্প্রসারণের ওপর জোর দেয়। দুই দেশের শ্রমবাজারের চাহিদা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর সঙ্গে শিক্ষা কর্মসূচির সমন্বয়ের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়।
উভয় নেতা পর্যটন সহযোগিতা সম্প্রসারণে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার ‘ভিজিট মালয়েশিয়া ২০২৬’ (ভিএম ২০২৬) এবং ‘মালয়েশিয়া ইয়ার অব মেডিকেল ট্যুরিজম ২০২৬’ (এমওয়াইএমটি ২০২৬) প্রচারণার আলোকে মালয়েশিয়া বাংলাদেশি পর্যটকদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। একইসঙ্গে দুই দেশের মধ্যে পর্যটন উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বৃদ্ধিতে সম্মতি জানানো হয়।
জ্বালানি সহযোগিতা
দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে জ্বালানি খাতে সহযোগিতা জোরদারের গুরুত্ব স্বীকার করে উভয় পক্ষ। পেট্রোনাস ও পেট্রোবাংলার মধ্যে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে এলএনজি সরবরাহ, এলএনজি অবকাঠামো, পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা বিষয়ে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারককে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।
বঙ্গোপসাগরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান, কয়লা ও চুনাপাথরের মতো অনাবিষ্কৃত খনিজ সম্পদ উত্তোলন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরসহ বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে মালয়েশিয়ার কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়।
উভয় পক্ষ সংশ্লিষ্ট জাতীয় জ্বালানি সংস্থা ও বেসরকারি খাতের অংশীদারদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে এবং দীর্ঘমেয়াদি ও পারস্পরিক সুবিধাজনক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার বিষয়ে একমত হয়।
প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা
দুই দেশের নেতারা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের চমৎকার সম্পর্কের প্রশংসা করেন। নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের সামরিক সফর, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং নৌবন্দর সফরের মাধ্যমে এ সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
সামরিক বিজ্ঞান, কারিগরি দক্ষতা ও প্রতিরক্ষা শিল্পে কৌশলগত সহযোগিতা সম্প্রসারণে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন তারা। একটি কাঠামোবদ্ধ প্রতিরক্ষা রোডম্যাপ প্রণয়নের জন্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্পর্কিত দ্বিপাক্ষিক যৌথ কমিটি (জেসিডিসি) আহ্বানের প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন।
নিজ নিজ ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ এবং কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজে পারস্পরিক আসন বরাদ্দ, পাঠ্যক্রম ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন দুই নেতা।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা অভিযানে যৌথ কৌশলগত মহড়া, মোতায়েন-পূর্ব প্রশিক্ষণ সহযোগিতা এবং বিশেষজ্ঞ ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং সর্বোত্তম পদ্ধতি ভাগাভাগির মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস চরমপন্থা মোকাবিলায় দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়েও একমত হন তারা।
আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা
উভয় নেতা দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার প্রশংসা করে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের প্রতি সংহতি পুনর্ব্যক্ত করে।
মিয়ানমারে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে সংকটের স্থায়ী সমাধান অর্জনের প্রচেষ্টায় সমর্থন অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে মালয়েশিয়া। আসিয়ান, ওআইসি, জাতিসংঘ এবং অন্যান্য বহুপাক্ষিক ফোরামে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মালয়েশিয়ার ধারাবাহিক সমর্থনের জন্য বাংলাদেশ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা, মানব পাচার এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধের মতো প্রচলিত ও অপ্রচলিত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগের গুরুত্বের ওপর জোর দেন দুই নেতা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত ও সর্বাঙ্গীণ উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন তারা।








