বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীমের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন। মালয়েশিয়াকে দ্রুত শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। তবে পদ্ধতিগত কারণে এখনই কিংবা আগামী কয়েকমাসের মধ্যে শ্রমবাজার খোলার সম্ভাবনা নেই। নিয়োগ পদ্ধতি চূড়ান্ত করে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর শ্রমবাজার খুলতে পারে। দুই দেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে কথা বলে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় ধরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ আছে। ২০২৪ সালের ১ জুন থেকে দেশটির শ্রমবাজার বিদেশিদের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। সেই সময় প্রায় ১৭ হাজার বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করতে পারেননি। তবে তার মধ্যে প্রায় ৮ হাজার কর্মীকে পুনরায় সেদেশে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় মালয়েশিয়া সরকার। সেসব কর্মীর মধ্যে এখনও প্রায় ৫ হাজার কর্মী মালয়েশিয়া যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়ায় সফর ঘিরে আশা করা হচ্ছে, দেশটির শ্রমবাজার দ্রুতই খুলবে। বাস্তবতা হচ্ছে খুব দ্রুত খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা নেই। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও মালয়েশিয়ার সিদ্ধান্তের কারণে শ্রমবাজার খুলতে আরও সময় লাগতে পারে। কী প্রক্রিয়ায় দেশটিতে নতুন করে কর্মী যাবে, সেই বিষয়ে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয়নি মালয়েশিয়ার সরকার।
ঢাকা ও মালয়েশিয়ার কূটনৈতিক সুত্র বলছে, সে দেশে সাধারণ বিদেশি কর্মী নিয়োগ কাঠামো সক্রিয় থাকলেও বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য গণহারে প্রবেশ চ্যানেল আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় আলোচনার অপেক্ষায় স্থগিত রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ নিয়োগ পুনরায় শুরু করতে এবং জট দূর করতে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের কর্মকর্তারা দেশটির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। তবে শ্রমবাজার পুনরায় চালু হওয়ার বিষয়টি ওই দেশের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে ।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার এখন সীমিত আকারে খোলা আছে। আবার অল্প কিছু সেক্টরে কোটা আবেদন দীর্ঘমেয়াদে চালু রাখা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে— কৃষি, বৃক্ষরোপণ, খনি এবং নির্বাচিত পরিষেবা-শিল্প উপ-খাত। মালয়েশিয়ায় বড় আকারে শ্রমিক যায় কন্সট্রাকশন ও উৎপাদন খাতে, সেটি এখন বন্ধ আছে।
যেতে না পারা কর্মীরা প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন ডিসেম্বর পর্যন্ত
গত বছরের ২১-২২ মে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার তৃতীয় জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের সভায় ১৭ হাজার ৭৭৭ জন কর্মীর মধ্যে সেদেশে যেতে না পারা মোট ৭ হাজার ৮৭৩ জন কর্মীকে পাঠানোর জন্য সরকারি সংস্থা বোয়েসেলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। শুধুমাত্র কনস্ট্রাকশন ও ট্যুরিজম— এই দুটি খাতে কর্মী পাঠানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। গত বছরের ২৫ নম্ভেম্বর এই কর্মীদের মালয়েশিয়া যাওয়া শুরু হয়। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার যেতে পেরেছেন। বাকিদের আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ দেবে মালয়েশিয়া সরকার।
এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহাদী আমিন বলেছেন, আমাদের কিছু আটকে পড়া কর্মী ছিলেন, যারা বাংলাদেশ থেকে আসতে পারেননি। এই সংখ্যাটা ৮ হাজারের মতো, এর ভেতরে একটা বড় সংখ্যা বাংলাদেশ থেকে না আসতে পারলেও আজকে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী বৈঠকের পর— মালয়েশিয়া ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, যারা বাকি রয়েছেন ৫ হাজারের মতো কর্মী, তাদের জন্য এই ডিসেম্বর পর্যন্ত টাইম দেওয়া হচ্ছে। যেকোনও সেক্টরে এসে ওনারা কাজ করতে পারবেন।’’
উপদেষ্টা বলেন, ‘‘আমাদের মূল উদ্দেশ্য নীতিগতভাবে সরকারের যে অবস্থান, তার ভেতর থেকে সর্বোচ্চ প্রাপ্তিটুকু যেন ওনারা বাংলাদেশের জন্য নিশ্চিত করতে পারেন।’’
জটিলতা আসলে কোথায়
দুই দেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মালয়েশিয়া নতুন একটি পদ্ধতিতে সব দেশ থেকেই কর্মী নিতে চায়। এই পদ্ধতিতে কর্মী নিতে মালয়েশিয়াকে নতুন একটি সিস্টেম দাঁড় করাতে হবে। আগের পদ্ধতিতে এফডব্লিউসিএমএস নামের প্ল্যাটফর্ম থাকলেও মালয়েশিয়া সেই মাধ্যমে এখন আর নতুন করে কর্মী নিতে চাচ্ছে না। নতুন পদ্ধতিতে কর্মী নেওয়ার প্রক্রিয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ করতে চাচ্ছে সে দেশের সরকার। তবে এই ব্যবস্থা এখনও চূড়ান্ত করতে পারেনি। সেজন্য মালয়েশিয়া সরকার কর্মী নেওয়ার বিষয়ে কোনও ঘোষণা দেয়নি।
২০২১ সালের সমঝোতা-চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ডিসেম্বরে
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বরাবরই আলোচনায় ছিল সিন্ডিকেট। ২০০৮ সালে বন্ধ হয় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, আট বছর পর তা চালু হয়েছিল ২০১৬ সালে। এরপর দুর্নীতির অভিযোগে ফের ২০১৮ সালে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া। ২০২১ সালের ১৮ ডিসেম্বর নতুন সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে সেই বাজার খুলতে সময় লেগেছিল তিন বছর। ২০২২ সালের আগস্টে দেশটিতে আবারও বাংলাদেশি কর্মী যাওয়া শুরু হয়। এরপর ২০২৪ সালের ১ জুন থেকে পুনরায় এই শ্রমবাজার বন্ধ হয়। অভিযোগ আছে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রিত হয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। অভিবাসন ব্যয়ের আড়ালে বিপুল পরিমাণ অর্থ চলে যায় সিন্ডিকেটের পকেটে। তাই সিন্ডিকেটমুক্ত শ্রমবাজার চান জনশক্তি রফতানিকারকদের একাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে চুক্তির পরপরই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার নজির নেই। চুক্তির পর কী পরিমাণ কর্মী যাবে, কোন প্রক্রিয়ায় যাবে, শর্ত কী থাকবে— এগুলো নিয়ে দুই দেশের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়। তারপর আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মী যাওয়া শুরু করে। এই বছর চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এই চুক্তি নবায়ন করবে সরকার। চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে এটি হালনাগাদ করার জন্য দুই দেশের ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক করতে হবে। সেগুলো চূড়ান্ত হওয়ার পর চুক্তি সই করা হবে।
চুক্তি নবায়ন প্রসঙ্গে মাহাদী আমিন বলেন, ‘‘আমরা এমওইউ যেটা শ্রমবাজারের জন্য রয়েছে, এটা নতুন করে রিনিউয়াল করবো। সেটির জন্য ইতোমধ্যে আমাদের কাজ চলমান রয়েছে। আমাদের স্বাভাবিকভাবে একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া দুটি দেশের দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন আলোচনা এবং সমঝোতা ভিত্তিতে হয়। তবে আজকে প্রধানমন্ত্রীসহ দুই দেশ যেহেতু একসঙ্গে বসেছেন, আমাদের শ্রম চুক্তি এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির দুটো প্রক্রিয়া আরও অনেক বেশি বেগবান হবে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘আমরা বিশ্বাস করি, মালয়েশিয়া মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ এবং বিশ্বের আরও যেসব দেশ আছে— আমরা আমাদের যে চলমান প্রক্রিয়া, তার মাঝে সেই সম্প্রসারণের প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকেই বাজার উন্মুক্তকরণের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি।’’
এর আগে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আল সিয়াম জানিয়েছেন, মালয়েশিয়া বর্তমানে শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তানসহ সব দেশের বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া পর্যালোচনার মধ্যে রেখেছে। আমরা আশা করি, এই রিভিউ প্রক্রিয়া শেষ হলে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার পাবে।









