প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে বিরোধীদলের সমালোচনাকে ‘খুব একটা আমলে নিচ্ছেন না’ জানিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু, নৌপরিবহন এবং রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, ‘যারা শঙ্কা প্রকাশ করছেন, তারা প্রথমবার বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করছেন। অনেক ক্ষেত্রে সমালোচনা করতে গিয়ে ভুল করেছেন। সরকারি দলের দায়িত্ব তারা এখনো পালন করেননি। আমার বিশ্বাস, আরও দুই-চারবার বিরোধী দলে থাকলে তারা সমালোচনাও আরও ভালোভাবে করতে শিখবেন।’
রবিবার (২৮ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৭তম দিনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম সভাপতিত্ব করেন।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলেন, অর্থমন্ত্রী বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে প্রায় ৩০ শতাংশ, ভৌত অবকাঠামো খাতে ১৮ শতাংশের বেশি এবং সাধারণ সেবা খাতে প্রায় ২৬ শতাংশ বরাদ্দ রেখেছেন। অর্থের বরাদ্দের অনুপাত অত্যন্ত চমৎকারভাবে সাজানো হয়েছে। তিনি বলেন, সামাজিক অবকাঠামোতে এই বরাদ্দের মাধ্যমে দেশের ১৮ কোটি মানুষকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা সম্ভব হবে। মানবসম্পদ উন্নয়নই দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত। পাশাপাশি অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা ও সাধারণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রায় ২৬ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
শেখ রবিউল আলম বলেন, রাষ্ট্র আহরিত অর্থ দুই ধরনের খাতে ব্যয় করে—অনুন্নয়ন ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয়। অনুন্নয়ন ব্যয় মূলত রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যয়। তিনি বলেন, গত অর্থবছরে রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল মোট বরাদ্দের ৭২ দশমিক ৭ শতাংশ, যা কমিয়ে এবার ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশে আনা হয়েছে। এর মাধ্যমে অপচয় রোধ করা হয়েছে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন ব্যয় গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ছিল ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ, যা বাড়িয়ে এবার ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের বিধ্বস্ত বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজন বিবেচনায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ৩ লাখ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া আরও ১৬ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই বাজেটে দেশের মানুষের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বাজেট নিয়ে সংসদে খুব বেশি সমালোচনা হয়নি উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, কিছু শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। কেউ নেতিবাচক কিছু বলেননি। প্রধান উদ্বেগ ছিল রাজস্ব আয়ে ঘাটতি হতে পারে। তবে তিনি মনে করেন, ই-চালানের মাধ্যমে রাজস্ব সংগ্রহ, কর অব্যাহতি কমানো, রাজস্ব ফাঁকি শনাক্তকরণ এবং ভ্যাট কাঠামোর নতুন বিন্যাসের মাধ্যমে রাজস্ব ঘাটতি হবে না।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৯ শতাংশ। অথচ নেপাল ও ভুটানে এই হার ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ। বাংলাদেশকেও সেই পর্যায়ে যেতে হবে এবং সে জন্য অর্থমন্ত্রী প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছেন। একই সঙ্গে ব্যাংক ঋণও কমানো হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা, যা কমিয়ে এবার ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি কমলে জনগণের সঞ্চয়ও বাড়বে। ফলে ব্যাংকিং খাতে অর্থের ঘাটতি হবে না বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘ঘাটতির বাজেট’ বলা হচ্ছে উল্লেখ করে শেখ রবিউল আলম বলেন, কর ও রাজস্ব যথাযথভাবে আহরণ করা গেলে এবং নির্ধারিত ব্যাংক ঋণ পাওয়া গেলে ঘাটতি বাজেট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ বাজেটে জিডিপির ৫ দশমিক ৫ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। চীনেও জিডিপির ৪ শতাংশ ঘাটতি বাজেট রয়েছে। সে তুলনায় বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ঘাটতি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে এবং নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করা যাবে। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাও মাত্র ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।









