সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নে ৮৬ হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনা 

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
০৮ জুলাই ২০২৬, ১৬:৫১আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৬, ১৬:৫১

দেশের সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নে প্রায় ৮৬ হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে নৌবাহিনীতে আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল ও সাবমেরিন সংযোজন এবং বিমান বাহিনীতে চতুর্থ প্রজন্মের মাল্টি রোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট (এমআরসিএ), অ্যাটাক হেলিকপ্টার, মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম যুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার। 

পাশাপাশি ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পনীতি, ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (ডিআইজেড) এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের (টিওটি) মাধ্যমে সামরিক উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। 

বুধবার (৮ জুলাই) বিকালে জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ২১তম প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত দুটি আলাদা প্রশ্নের লিখিত উত্তরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব তথ্য জানান।  

নেত্রকোনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফার প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দেশের সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়ন ও আধুনিকায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যে তিন বছর ও পরবর্তী সাত বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।”  

প্রধানমন্ত্রী জানান, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর আওতায় নতুন ট্যাংক ও সাঁজোয়া যুদ্ধযান যুক্ত করে স্থলযুদ্ধ সক্ষমতা বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে আধুনিক আর্টিলারি রকেট ব্যবস্থা, ট্যাংকবিধ্বংসী অস্ত্র, স্বল্প ও মধ্যম পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংযোজনের মাধ্যমে দূরপাল্লায় নির্ভুল আঘাত এবং আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা হবে। 

লিখিত উত্তরে আরও বলা হয়, সেনাবাহিনীতে আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকল (ইউএভি), কাউন্টার ইউএভি এবং আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, পর্যবেক্ষণ ও পরিস্থিতি অনুধাবনের সক্ষমতা বাড়ানো হবে। পাশাপাশি বিমানযোগে অভিযান পরিচালনা, আকাশপথে সৈন্য ও সরঞ্জাম স্থানান্তর এবং নদীপথে পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি করে বাহিনীর কৌশলগত ও অপারেশনাল গতিশীলতা আরও সুসংহত করা হবে।  

প্রধানমন্ত্রী জানান, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে আর্টিলারি গোলাবারুদ, এমএলআরএস রকেট, ট্যাংকের গোলাবারুদ, অ্যান্টি-ট্যাংক গাইডেড মিসাইলসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ও গোলাবারুদের প্রয়োজনীয় মজুত গড়ে তোলার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।  

তিনি বলেন, “প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে ফিউজ ও প্রাইমার, আধুনিক অ্যাসল্ট রাইফেল, অ্যান্টি-ট্যাংক গাইডেড মিসাইল, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, হেলমেটসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জামের দেশীয় উৎপাদন অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তোলা হবে। এতে বৈদেশিক নির্ভরতা কমবে এবং দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ ঘটবে।”  

প্রধানমন্ত্রী জানান, এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে আগামী ১০ বছরে প্রায় ৮৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আরও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক, আত্মনির্ভর ও যুদ্ধোপযোগী বাহিনীতে পরিণত হবে।  

নৌবাহিনী প্রসঙ্গে লিখিত উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা এবং সমুদ্রে নজরদারি জোরদারে বর্তমানে নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ও আকাশযান সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে এবং ভবিষ্যতেও এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।”  

তিনি জানান, নৌবাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট, অফশোর প্যাট্রোল ভেসেল এবং সাবমেরিন সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের মনুষ্যবিহীন প্ল্যাটফর্ম যুক্ত করা, নতুন নৌঘাঁটি নির্মাণ, বিদ্যমান ঘাঁটির উন্নয়ন, দেশীয় জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতা বৃদ্ধি, নৌসদস্যদের উন্নত প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও যৌথ মহড়া বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।  

বিমান বাহিনী সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী জানান, ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’-এর আওতায় বিমান বাহিনীতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির চতুর্থ প্রজন্মের মাল্টি রোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট (এমআরসিএ), ফাইটার এয়ারক্রাফট, অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার, অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম, ইউএভি সিস্টেম, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম, প্যাসিভ ডিটেকশন সিস্টেম, মিডিয়াম রেঞ্জ সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল সিস্টেম এবং লং রেঞ্জ রাডার ও এয়ার ট্রাফিক সার্ভেইলেন্স রাডার সংযোজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। 

তিনি আরও জানান, প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে বৃহত্তর বগুড়ায় একটি ইউএভি ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অত্যাধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। 

অপরদিকে রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক নির্ভরতা কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে সরকার দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।”  

তিনি জানান, ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পনীতি প্রণয়নের কাজ চলছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে পৃথক ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (ডিআইজেড) স্থাপনের পরিকল্পনাও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। 

প্রধানমন্ত্রী জানান, সশস্ত্র বাহিনীর উৎপাদন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন, গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং দক্ষ জনবল তৈরির কাজও চলমান রয়েছে।  

তিনি বলেন, “বর্তমানে দেশে বিভিন্ন ধরনের গোলাবারুদ, বিস্ফোরক, ক্ষুদ্র অস্ত্রের উপকরণ, সামরিক যানবাহনের যন্ত্রাংশ, যোগাযোগ সরঞ্জাম, পোশাক, সুরক্ষা সামগ্রীসহ বিভিন্ন সামরিক উপকরণ উৎপাদন ও সংযোজন করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিকস এবং উন্নত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।” এক্ষেত্রে বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্প উন্নয়নের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে বলেও জানান তিনি।   

লিখিত উত্তরে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা বাড়িয়ে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষ প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ তৈরিতে প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।”  

রংপুর অঞ্চলের তরুণদের সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সরকারের পরিকল্পনা কেবল পীরগাছা ও কাউনিয়া কিংবা বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের সব উপজেলার যুবসমাজকে জাতীয় নিরাপত্তা ও সংকট মোকাবিলায় দক্ষ ও সুশৃঙ্খল মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে একটি সমন্বিত কর্মসূচি প্রণয়নের কাজ চলছে।”  

তিনি আরও জানান, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে বিভিন্ন গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় প্রচার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। দেশের সব অঞ্চলের যোগ্য, মেধাবী ও দেশপ্রেমিক তরুণ-তরুণীদের সশস্ত্র বাহিনীতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকার সমান সুযোগ সৃষ্টিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।  

/এসএমএ/এসটি/ 
সম্পর্কিত
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে: প্রধানমন্ত্রী
বগুড়ায় ইউএভি ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট স্থাপনের কার্যক্রম শুরু    
অনার্স পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা ফ্রি করতে চান প্রধানমন্ত্রী 
সর্বশেষ খবর
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে: প্রধানমন্ত্রী
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে: প্রধানমন্ত্রী
বগুড়ায় ইউএভি ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট স্থাপনের কার্যক্রম শুরু    
বগুড়ায় ইউএভি ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট স্থাপনের কার্যক্রম শুরু    
ইসরায়েল সফর বাতিল করলেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী
ইসরায়েল সফর বাতিল করলেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী
ইরানের নারীবাদী লেখক শাহরনুশ পারসিপুরের প্রয়াণ
ইরানের নারীবাদী লেখক শাহরনুশ পারসিপুরের প্রয়াণ
সর্বাধিক পঠিত
কোয়ার্টার ফাইনালের সূচি চূড়ান্ত, কোন কোন দল মুখোমুখি
কোয়ার্টার ফাইনালের সূচি চূড়ান্ত, কোন কোন দল মুখোমুখি
পে স্কেল: মূল বেতন এক ধাপে
পে স্কেল: মূল বেতন এক ধাপে
৫ জনকে জীবিত উদ্ধার, মাটির নিচে চাপা পড়েছে আরও ২০ জন
৫ জনকে জীবিত উদ্ধার, মাটির নিচে চাপা পড়েছে আরও ২০ জন
৭ ঘণ্টা পরিবার নিয়ে ট্রেনের ভেতরে আটকা, মেয়েটা অসুস্থ হয়ে পড়েছে
৭ ঘণ্টা পরিবার নিয়ে ট্রেনের ভেতরে আটকা, মেয়েটা অসুস্থ হয়ে পড়েছে
উত্তরপত্রে নম্বর কম-বেশি দিলে দুই বছরের জেল
উত্তরপত্রে নম্বর কম-বেশি দিলে দুই বছরের জেল