বাংলা নতুন বরণ করে নিতে মাঝখানে একদিন বাকি। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভেতরে ঢুকলে নতুন বছর আসতে মাঝখানে যে আরও একদিন বাকি আছে সেটা বোঝার উপায় নেই। ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো...’সহ রবীন্দ্র, নজরুল সংগীত কিংবা কখনও কালজয়ী বাংলা গানের তালে উৎসব মুখর পরিবেশে চলছে নববর্ষ বরণ আর মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি। এ মাসের প্রায় শুরু থেকে চলতে থাকা এই প্রস্তুতিযজ্ঞ এখন প্রায় শেষের দিকে। বাকি রয়েছে শুধু রং তুলির আঁচড় দেওয়ার কাজ।
এদিকে অতীতের অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে বাঙালির বর্ষবরণ উৎসবে যাতে কোনও অনাকাঙ্খিত ঘটনা সৃষ্টি না হয় সে জন্য প্রস্তুতি চলছে নিরাপত্তা বাহিনীরও। নিরাপত্তা প্রদানের দায়িত্বে থাকা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা প্রদানের।
বরাবরের মতো এবারও বর্ষবরণের অন্যতম অনুষঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হবে সকাল ৯টায়। চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হয়ে হোটেল কন্টিনেন্টাল মোড় ঘুরে যা শেষ হবে আবার চারুকলা এসে। প্রতিবছরই সমসময়িক প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়। যার ব্যত্যয় ঘটেনি এবারও। রবীন্দ্রনাথের গানের আশ্রয় নিয়ে এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে’। বাংলা ট্রিবিউনকে এটি নির্ধারণের ব্যাখ্য দিয়েছেন চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন।
তিনি বলেন, ‘এ বছরের প্রতিপাদ্যটা নির্ধারণ করা হয়েছে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হওয়ার দিকটি বিবেচনা করে। এ মূল্যবোধের অবক্ষয় আমরা দেখতে পাই মায়ের হাতে তার সন্তানের খুন হওয়ার মাধ্যমে। কিন্তু নতুন বছরে আমরা এ থেকে মুক্তি পেতে চাই। সেজন্যই এবারের মূল প্রতিপাদ্যে রবীন্দ্রনাথের ‘অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে’ এই কথার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। নতুন বছরে সবার মূল্যবোধের বিকাশ ঘটবে, অন্তরের বিকাশ ঘটবে. এই প্রত্যাশা আমাদের।’
মঙ্গলবার দুপুরে চারুকলা অনুষদ ঘুরে দেখা যায়, এখন আর নেই প্রস্তুতির কাজ শুরুর সময়ের সেই বাঁশ, হাতুড়ি আর লোহার ঠুন ঠুন আওয়াজ। শেষ হয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রায় বহনের জন্য নির্মিত বিভিন্ন প্রতিকী শিল্পকর্মের কাজ। তবে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে এসব শিল্পকর্মের গঠন তৈরি করা হলেও এখনও বাকি রয়েছে কাগজ আর রং লাগানো। এদিকে আলপনায় সাজানো হচ্ছে চারুকলা অনুষদের বাইরের দেয়ালও।
এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার কাজের প্রস্তুতিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন গ্রাফিক্স ডিজাইন বিভাগের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী খালিদ হাসান রবিন। নববর্ষের একদিন আগে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সম্পর্কে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘কাজ এখন প্রায় শেষ দিকে। এবার আমাদের নয়টি মনুমেন্ট আছে। যার মেধ্যে টেপা পুতুল, সাপ, হরিণ, ঘোড়া, পাখি-গাছ, মা ও শিশু, ষাঁড়, হাতি আর নৌকা। যেগুলোর স্ট্রাকচার তৈরি শেষ হয়েছে। এখন আজ আর কাল সেগুলোর ওপর কাগজ লাগানো হবে। এরপর রংয়ের কাজ। যেটা কালকের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।’
আরও পড়ুন: অভিষেকে জাত চেনালেন মুস্তাফিজ
বর্তমান সময়ে ঘটা বেশ কিছু ঘটনার কারণে মনে করা হচ্ছে মা ও শিশুর সম্পর্কে সৃষ্টি হয়েছে অনুভূতি শূন্যতার। যা থেকে মুক্তি পাওয়ার বাসনা থাকবে এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রথম বার্তা। যার কারণে মা ও শিশুর সম্পর্কের দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে শোভাযাত্রার শুরুতেই থাকবে টেপা পুতুলের আদলে মা ও শিশুর প্রতীকী শিল্পকর্ম। সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে থাকবে হাতি ও নৌকা। ষাঁড়কে তুলে ধরা হবে দুর্নীতি ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধ প্রতীক হিসেবে। পরিবেশ সচেতনতাসহ নানা বিষয়কে ফুটিয়ে তুলতে থাকবে গাছ ও পাখি।
বর্ষবরণের আগে আগামীকাল সন্ধ্যা ৬টায় চারুকলার বকুলতলায় অনুষ্ঠিত হবে বর্ষ বিদায়ের অনুষ্ঠান চৈত্র সংক্রান্তি। এতে বিভিন্ন আয়োজনের মধ্যে থাকবে নাচ, গান কবিতা। অন্যান্য বার এতে বিভিন্ন ব্যান্ডকে আমন্ত্রণ জাননো হলেও এবার শুধু চারুকলার বিভিন্ন বিভাগের বতর্মান শিক্ষার্থীরাই অংশগ্রহণ করবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে সুষ্ঠুভাবে নববর্ষ উদযাপনে জনসাধরণের জন্য নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ও ঢাবি কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা প্রদান সংক্রান্ত ঢাবি ও ডিএমপির এক যৌথ সংবাদ সম্মেলন থেকে বলা হয়েছে, সুষ্ঠুভাবে নববর্ষ উদযাপনের জন্য এবার ডিএমপি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের জন্য এবার রমনা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় থাকবে। নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, বিএনসিসির সদস্য ও চারুকলার নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবকরা নিয়োজিত থাকবে। এছাড়া সিটি করপোরেশনের সহযোগিতায় পর্যাপ্ত আলো ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হবে। ক্যাম্পাসে আগত কোনও ব্যক্তি সমস্যায় পড়লে দ্রুত সহযোগিতার জন্য ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় হেল্প নম্বর টানিয়ে দেওয়া হবে। বন্ধ রাখা হবে রাজু ভাস্কর্যের পাশে উদ্যানের গেট ও ছবির হাটের গেট। ভ্রাম্যমাণ বিভিন্ন খাবারে দোকান বসবে মুহসিন হলের মাঠে।
বর্ষবরণে ঢাবির আয়োজন: নববর্ষের দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট-মণ্ডল প্রঙ্গণে থিয়েটার অ্যান্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগের উদ্যোগে বিভাগের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হবে পট-গান ও দেশের গান। কলা অনুষদের সামনের মাঠে বাংলা বিভাগ, বটতলায় সংগীত বিভাগ, আমতলায় শিশু-কিশোর সংঘসহ বিভিন্ন সংগঠন নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরেও থাকবে সঙ্গীতানুষ্ঠান।
আরও পড়ুন: চেহারায় ইলিশ, আসলে ইলিশ নয়
এসআর/এজে/








