ঢাকা শহরে সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টির পর সৃষ্ট পরিস্থিতিকে বন্যা নয়, জলাবদ্ধতা হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন, ঘনবসতিপূর্ণ এই শহরে কয়েক ঘণ্টার জলাবদ্ধতাই মানুষের জন্য মারাত্মক সংকট তৈরি করে। অপরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণ এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ের খুব সামান্য অংশ কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় দীর্ঘদিনেও সমস্যার সমাধান হয়নি।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
অপরিকল্পিত উন্নয়নে সুফল মেলেনি
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “ঢাকা শহরে যেটা হয়েছে, সেটা ঠিক বন্যা নয়; এটা জলাবদ্ধতা। আমরা অনেক সময় এটাকে বন্যা হিসেবে সংবাদে বলি। কিন্তু এখানে বিপুল সংখ্যক মানুষ একসঙ্গে বসবাস করেন বলে কয়েক ঘণ্টার জলাবদ্ধতাই বড় ধরনের সংকট তৈরি করে।”
জলাবদ্ধতা নিরসনে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, “বর্তমান সরকার মাত্র দায়িত্ব নিয়েছে। তবে অতীতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি দৃশ্যমান হয়নি।”
তিনি বলেন, “আমাদের তথাকথিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অনেকগুলো অপরিকল্পিতভাবে নেওয়া হয়েছে। আবার যে পরিমাণ টাকা ব্যয় করা হয়েছে, তার খুব ছোট একটি অংশ কার্যকর হয়েছে। এসব সংকট সরকার পর্যালোচনা করবে।”
এইচএসসি পরীক্ষাকেন্দ্র কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ
জলাবদ্ধতার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান বলেন, “এই বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য জানাবে। তবে তিনি অনানুষ্ঠানিকভাবে জেনেছেন, যেসব এলাকায় পরিস্থিতি খুবই গুরুতর ছিল, সেখানে পরীক্ষা স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি কেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের ছবি ও ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে সংকটের ব্যাপ্তি বাস্তবের তুলনায় অনেক বড় বলে মনে হতে পারে। তবে কোনও শিক্ষার্থীর কষ্টকে সরকার ছোট করে দেখছে না।”
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “মোট পরীক্ষার্থী ও পরীক্ষাকেন্দ্রের তুলনায় গুরুতর সমস্যায় পড়া কেন্দ্রের হার খুব বেশি ছিল না। যেখানে সংকট অত্যন্ত বেশি ছিল, যেমন চট্টগ্রামের কিছু এলাকায়, সেখানে পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে।”
তিনি জানান, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও স্থানীয় পরিস্থিতির ভিত্তিতে পরীক্ষাকেন্দ্রগুলো কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। একই ধরনের সংকটের আশঙ্কা দেখা দিলে পরীক্ষা স্থগিত বা পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আদালতের
শেখ হাসিনার বক্তব্য টেলিভিশন ও গণমাধ্যমে প্রচারের বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “এ-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা সরকার দেয়নি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আদালত নির্দেশ দিয়েছেন।”
তিনি বলেন, “এটা সরকারের বিষয় নয়, আদালতের নির্দেশনা। সরকার বা নির্বাহী বিভাগের দায়িত্ব হচ্ছে আদালতের নির্দেশনা মানা হচ্ছে কিনা, তা দেখা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।”
জাহেদ উর রহমান জানান, কোনও রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক বা গণমাধ্যম যদি মনে করে এই নির্দেশনার কারণে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাহলে তারা আদালতে সেটি চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
তিনি বলেন, “আদালত যদি নির্দেশনা প্রত্যাহার করেন, তাহলে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে। কিন্তু যতক্ষণ নির্দেশনা বহাল থাকবে, রাষ্ট্রের আইন মেনে সেটি অনুসরণ করতে হবে।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার বাস্তবতা স্বীকার করে তিনি বলেন, “বর্তমান সময়ে কোনও বক্তব্য পুরোপুরি আটকে রাখা কঠিন। তারপরও গণমাধ্যমকে আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।”
ভারতগামী রেল যোগাযোগে নাগরিকের সুবিধা বিবেচনা
ভারতের সঙ্গে বন্ধ থাকা যাত্রীবাহী ট্রেন পুনরায় চালু করার উদ্যোগ প্রসঙ্গে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, “এই বিষয়ে রেল মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক তথ্য তার কাছে নেই। তবে ভিসা জটিলতা কমে মানুষের যাতায়াত শুরু হলে নাগরিকদের সুবিধার জন্য প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া স্বাভাবিক।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের নাগরিকেরা যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাচ্ছন্দ্যে কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে যেতে পারেন, সরকার সেই বিষয়টি বিবেচনা করবে। একই সঙ্গে রেল যোগাযোগ চালু হলে বাংলাদেশ রেলওয়েরও আয় হবে।”
এনআইডি সংশোধনে ভোগান্তি নিরসনের আশ্বাস
জাতীয় পরিচয়পত্রে ভুল সংশোধনের জন্য হাজার হাজার আবেদন জমে থাকা এবং আবেদনকারীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির বিষয়ে তথ্য উপদেষ্টা জানান, তিনি নিজেও এই ধরনের বহু অভিযোগ পেয়েছেন।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এনআইডিতে নাম, জন্মতারিখ, জন্মস্থানসহ বিভিন্ন ভুল সংশোধনের জন্য অনেক মানুষ ব্যক্তিগতভাবে তার কাছে সহায়তা চেয়েছেন। এসব ভুলের কারণে কেউ পাসপোর্ট করতে পারছেন না, কেউ বিদেশে বা অন্য সেবা গ্রহণে সমস্যায় পড়ছেন।”
তিনি বলেন, “আমি আজই বিষয়টি নোট করছি। দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টদের বলবো। আবেদন ৮৪ হাজার হোক বা ৮৪টি হোক— মানুষকে সেবা দিতে হবে।”









