আলোচনায় রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ, এরপর বঙ্গভবনে যাবেন কে

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
২৩ জুলাই ২০২৬, ১৫:৪০আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২৬, ১৫:৪২

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে অপসারণের দাবি জানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। তাকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তারা এ নিয়ে বঙ্গভবনের সামনে গিয়ে আন্দোলন করেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকার সাংবিধানিক কারণে তাকে সরাতে রাজি হয়নি। তাছাড়া দেশের অন্যতম বড় দল বিএনপিও তখন এ বিষয়ে সায় দেয়নি। শেষ পর্যন্ত সেই দাবি স্তিমিত হয়ে যায়। এখন আবারও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের আলোচনা জোরালো হয়েছে। একইসঙ্গে কে হবেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি তা নিয়েও চলছে কানাঘুষা।

২০২৪ সালের ৭ আগস্ট রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অধীনেই শপথ নেন অন্তর্বর্তী সরকার-প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় একাধিকবার আলোচনায় ওঠে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ কিংবা অপসারণের বিষয়টি। মো. সাহাবুদ্দিনকে  নিয়ে মাঝে-মাঝে উত্তপ্ত হয়েছে রাজপথ। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি বহাল থাকেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞাপন ও নিয়মিত রুটিন কাজ ছাড়া তার আর কিছুই করার ছিল না। সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ এড়াতে রাষ্ট্রীয় অনেক আচার অনুষ্ঠানেও তার উপস্থিতি ছিল না। রাষ্ট্রীয় দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি ছিলেন অপাংক্তেয়। এমনকি জাতীয় ঈদগাহেও তিনি নামাজ পড়তে যেতে পারেননি।

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। এবারও অনেকে মনে করেছিলেন— বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করতে পারে সরকার। সেক্ষেত্রে হয়তো দলীয় কাউকে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। তবে এই সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের কোনও ইঙ্গিত দেয়নি সরকার।  সরকার-প্রধান তারেক রহমানের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সব অনুষ্ঠানেই যোগ দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আলোচনা ছিল রাষ্ট্রপতি পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারবেন কিনা। আর এখন বিষয়টি টক অব দ্য কান্ট্রি—তিনি পদত্যাগ করতে পারেন। এছাড়া পরবর্তী রাষ্ট্রপতি বিএনপি থেকে কেউ হচ্ছেন? নাকি দলের বাইরে থেকে কাউকে রাষ্ট্রপতি করা হবে, এমন আলোচনাও গুরুত্ব পাচ্ছে। অনেকে বলছেন, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে বিএনপি তাদের পছন্দ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নিয়োগের সুযোগ পাবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, বিএনপিতেই রাষ্ট্রপতি হওয়ার মতো ক্যারিয়ারসম্পন্ন যোগ্য প্রার্থী আছেন। হয়তো তাদের মধ্য থেকেই বাছাই করা হতে পারে। আর দলের বাইরে কাউকে আনার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপকালে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বর্তমান রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার আগ পর্যন্ত এ নিয়ে চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।

আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ক্ষেত্রে তাকে স্পিকারের উদ্দেশে নিজ স্বাক্ষরে পদত্যাগপত্র জমা দিতে হবে। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। 

বিএনপি’র একাধিক সিনিয়র নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, তারা মন্তব্য করতে অপারগত প্রকাশ করেন। তারা এও জানান, এ নিয়ে তাদের কাছে কোনও তথ্য নেই।

পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে আলোচনায় কারা

পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে  হতে পারেন—এমন আলোচনা শুরু হয়েছে সবখানে। বিএনপির ভেতর থেকেই কাউকে বেছে নেওয়া হবে, নাকি দলনিরপেক্ষ কাউকে করা হবে, তা নিয়ে দলটির ভেতরে-বাইরে নানা হিসাব-নিকাশ চলছে। দলীয় আস্থাভাজনদের বাইরে সরকারের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত একজন সচিবের নামও আলোচনায় আছে।

দলীয় সূত্র জানায়, পরবর্তী রাষ্ট্রপতির বিষয়ে দলের হাইকমান্ডে এখনও কোনও আলোচনা হয়নি। ভবিষ্যতের সম্ভাব্য কঠিন পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে দলের ক্লিন ইমেজধারী ও সিনিয়র নেতাদের প্রাধান্য দেওয়া হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আলোচনায় আছেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সূত্র জানায়, বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে অবদানের কারণে হাইকমান্ডের গুডবুকে রয়েছেন তিনি।

এর বাইরে নতুন সরকারের কোনও পদে না থাকলেও আলোচনায় রয়েছেন আরও দুই বর্ষীয়ান নেতা। তারা সবাই স্থায়ী কমিটির সদস্য। তারা হলেন, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ড. আব্দুল মঈন খান। বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার মতে, উল্লিখিত তিন শীর্ষ নেতাই দলের পরীক্ষিত। যোগ্যতার দিক থেকেও অবিসংবাদিত। আলোচনায় ছিলেন আরেক বর্ষীয়ান নেতা ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার ছিলেন। গত ১২ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

আলোচিত নেতারা নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকা থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে মির্জা ফখরুল সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। বিএনপির সূত্র বলছে, দল চাইলে তাঁকে রাষ্ট্রপতি করা হতে পারে। আর ড. মোশাররফ হোসেন ও ড. আব্দুল মঈন খান সরকারের কোনও পদে স্থান পাননি। তাঁরা বিএনপির আগের সরকারে একাধিকবার মন্ত্রী-এমপির দায়িত্ব পালন করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, বড় পদের জন্য হয়তো তাদের রিজার্ভ রাখা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া

৯০ দশকের আগে সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার বিধান ছিল। ১৯৯১ সালে সংসদীয়-ব্যবস্থা চালুর পর আগের পদ্ধতি বাতিল হয়ে যায়। তখন থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হচ্ছেন এমপিদের পরোক্ষ ভোটে। তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত হয়ে পড়ে প্রধানমন্ত্রীর ওপর। সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। এ ক্ষেত্রে কেউ দুইবারের বেশি এ পদে থাকতে পারবেন না।

মেয়াদ শেষ, পদত্যাগ বা অভিসংশনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হয়ে থাকে। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই তাকে ৩৫ বছরের বেশি ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মতো যোগ্য হতে হবে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ অবসানের কারণে পদ শূন্য হলে মেয়াদ-সমাপ্তির তারিখের পূর্ববর্তী ৯০ হতে ৬০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। আর বিপক্ষে প্রার্থী না থাকলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন। তফসিল ঘোষণার পর সংসদ অধিবেশন চলাকালীন এই নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হয়। তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রয়োজনীয় সময়ে যদি অধিবেশন না থাকে, তাহলে নির্বাচন কমিশন স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে ভোটগ্রহণের কমপক্ষে সাত দিন আগে অধিবেশন আহ্বান করবেন।

পদ শূন্য হয় কীভাবে?

সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মৃত্যু, পদত্যাগ, শারীরিক অসামর্থ্য বা অভিশংসন হলে এই পদ শূন্য হয়। এ ছাড়া গুরুতর অসদাচরণ বা সংবিধান লঙ্ঘনের কারণেও রাষ্ট্রপতি অপসারিত হতে পারেন। আর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত এ পদে দায়িত্ব পালন করবেন স্পিকার।

যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

শারীরিক অসুস্থতা বা অন্য কোনও কারণে রাষ্ট্রপতি চাইলে পদত্যাগ করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘সংবিধানে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সুযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রপতি ইচ্ছা করলে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারবেন।’

বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি।

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘শারীরিক অসুস্থতা বা অন্য কোনও কারণে রাষ্ট্রপতি চাইলে পদত্যাগ করতে পারবেন। সংবিধানে সেই সুযোগ রয়েছে। তিনি চাইলে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র দিতে পারবেন। এর বেশি কিছু জানা নেই।’

/এসও/জেইউ/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
শেখ হাসিনা-সাহাবুদ্দিন ফোনালাপের তথ্য নেই: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
রাষ্ট্রপতি চাইলে পদত্যাগ করতে পারবেন, সেই সুযোগ আছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করবেন, গুঞ্জন নাকি বাস্তবতা?
সর্বশেষ খবর
কম্বোডিয়া থেকে ফিরে আসা নারীর মামলায় পাচারচক্রের হোতা গ্রেফতার
কম্বোডিয়া থেকে ফিরে আসা নারীর মামলায় পাচারচক্রের হোতা গ্রেফতার
১৭ বছর পর লর্ডসে বাংলাদেশের টেস্ট
১৭ বছর পর লর্ডসে বাংলাদেশের টেস্ট
শেখ হাসিনা-সাহাবুদ্দিন ফোনালাপের তথ্য নেই: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
শেখ হাসিনা-সাহাবুদ্দিন ফোনালাপের তথ্য নেই: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, সাময়িক বিরতি নেওয়ার ঘোষণা
অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, সাময়িক বিরতি নেওয়ার ঘোষণা
সর্বাধিক পঠিত
ভুলে চার মাস কারাভোগ, ৩০ লাখ টাকা পেলেন ভুক্তভোগী
ভুলে চার মাস কারাভোগ, ৩০ লাখ টাকা পেলেন ভুক্তভোগী
হত্যাকাণ্ডের শিকার সেই শিক্ষিকার চার সন্তান নিয়ে দিশেহারা পরিবার
হত্যাকাণ্ডের শিকার সেই শিক্ষিকার চার সন্তান নিয়ে দিশেহারা পরিবার
দিল্লিতে আন্দোলন চলা যন্তর মন্তর আসলে কী
দিল্লিতে আন্দোলন চলা যন্তর মন্তর আসলে কী
আদালতে বিচার চলাকালে শিক্ষানবিশ নারী আইনজীবীর মাথা ফাটালেন বিচারক
আদালতে বিচার চলাকালে শিক্ষানবিশ নারী আইনজীবীর মাথা ফাটালেন বিচারক
জামায়াতের আরেক নেতার পদ স্থগিত
জামায়াতের আরেক নেতার পদ স্থগিত