দেশের প্রতিটি জেলায় হচ্ছে ‘শিশু স্বর্গ’, থাকছে কী কী সুবিধা

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
১৩ আগস্ট ২০২৬, ১৮:৩৩আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১৮:৩৩

দেশের প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সমন্বিত সেবা নিশ্চিত করতে প্রতিটি জেলায় পর্যায়ক্রমে ‘শিশু স্বর্গ’ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন। এসব কেন্দ্রে চিকিৎসা, শিক্ষা, থেরাপি, পুনর্বাসন, আবাসন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ একই ছাতার নিচে নিশ্চিত করা হবে।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সচিবালয়ে বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন বলেন, প্রতিবন্ধী শিশুদের অনেকেই সময়মতো চিকিৎসা, বিশেষ শিক্ষা বা পুনর্বাসনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে তাদের সম্ভাবনা বিকাশের পথ বাধাগ্রস্ত হয়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার সমন্বিত সেবাকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘শিশু স্বর্গ’।

তিনি বলেন, ‘প্রতিবন্ধী শিশুরা সমাজের বোঝা নয়, তারা আমাদের সম্পদ। সঠিক পরিচর্যা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে পারলে তারাও দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। সেই লক্ষ্যেই আমরা প্রতিটি জেলায় শিশু স্বর্গ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছি।’

স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা

প্রতিমন্ত্রী জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শিশুদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করবে।

এরপর সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় তাদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, শিক্ষা, থেরাপি, প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

ওয়ান-স্টপ সার্ভিস

ফারজানা শারমীন বলেন, ‘আমরা চাই একটি পরিবার যেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঘুরে বেড়াতে বাধ্য না হয়। একটি শিশুর যেসব সেবা প্রয়োজন, সেগুলো যেন একই জায়গা থেকে পাওয়া যায়। শিশু স্বর্গ মূলত একটি ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার হিসেবে পরিচালিত হবে।’

বর্তমানে অনেক পরিবার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানকে নিয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, স্পিচ থেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট কিংবা বিশেষ শিক্ষকের অভাবে অনেক শিশু তাদের প্রাপ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে এসব সীমাবদ্ধতা ধীরে ধীরে দূর করা হবে।

থেরাপি ও বিশেষ শিক্ষা

প্রতিমন্ত্রী বলেন, একজন অটিজম বা প্রতিবন্ধী শিশুর বিকাশের জন্য শুধু চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। তার শিক্ষা, মানসিক বিকাশ, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শিশু স্বর্গে এসব বিষয়কে সমন্বিতভাবে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

এসব কেন্দ্রে শিশুর বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী পৃথক সেবা পরিকল্পনা তৈরি করা হবে। থাকবে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ফিজিওথেরাপি, স্পিচ থেরাপি, মনোসামাজিক কাউন্সেলিং, বিশেষ শিক্ষা এবং অভিভাবকদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা।

অভিভাবকদের জন্যও প্রশিক্ষণ

ফারজানা শারমীন বলেন, শুধু শিশুদের নয়, তাদের অভিভাবকদেরও সচেতন ও দক্ষ করে তুলতে হবে। পরিবারের সহযোগিতা ছাড়া কোনো পুনর্বাসন কার্যক্রম সফল হয় না। তাই শিশু স্বর্গে অভিভাবকদের জন্যও নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ সেবা থাকবে।

দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান

সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কেবল ভাতার আওতায় সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না। বরং তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাই সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।

তিনি বলেন, ‘আমরা চাই প্রতিবন্ধী শিশুরা বড় হয়ে আত্মনির্ভরশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠুক। এজন্য ছোটবেলা থেকেই তাদের উপযুক্ত শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং জীবনমুখী প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।’

বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে কাজ করছে সরকার। যারা হস্তশিল্প বা অন্য কোনো পণ্য উৎপাদন করবেন, তাদের উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণেও সহায়তা দেওয়া হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য দাননির্ভর সমাজ গড়া নয়; বরং এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা মর্যাদার সঙ্গে নিজের যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারবেন।’

ভাতার পাশাপাশি স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ

ফারজানা শারমীন বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় প্রতিবন্ধী ভাতাসহ বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রম চলমান থাকলেও সরকার এখন আরও টেকসই উদ্যোগের দিকে এগোচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘ভাতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো একজন মানুষকে স্বাবলম্বী করে তোলা।’

প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ

প্রতিবন্ধী শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করতে বিভিন্ন আইন ও নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়নেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস, গণপরিবহন এবং অন্যান্য সেবাক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, অনেক সময় সামাজিক কুসংস্কার ও সচেতনতার অভাবে প্রতিবন্ধী শিশুদের পরিবারগুলো সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শিশু স্বর্গ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শুধু সেবা প্রদান নয়, সমাজে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার কাজও করা হবে।

‘আমরা চাই মানুষ প্রতিবন্ধিতাকে করুণা নয়, মানবিকতা ও অধিকারের দৃষ্টিতে দেখুক। সমাজের প্রতিটি শিশুর সমান মর্যাদা ও সমান সুযোগ পাওয়ার অধিকার রয়েছে,’ বলেন তিনি।

খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড

প্রতিমন্ত্রী জানান, শিশু স্বর্গে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা উপকরণ, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সৃজনশীল প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা থাকবে। এর মাধ্যমে শিশুরা আনন্দের মধ্য দিয়ে শিখতে এবং আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে পারবে।

ফারজানা শারমীন বলেন, ‘একটি শিশুর মানসিক বিকাশে আনন্দময় পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই শিশু স্বর্গ শুধু একটি সেবাকেন্দ্র হবে না, এটি হবে এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ যেখানে শিশুরা নিজেদের সক্ষমতা বিকাশের সুযোগ পাবে।’

পর্যায়ক্রমে সব জেলায়

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের পরিবারগুলো যাতে সহজে এসব সেবা পায়, সে বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। পর্যায়ক্রমে জেলা পর্যায়ে কেন্দ্র স্থাপনের ফলে রাজধানীকেন্দ্রিক সেবার ওপর নির্ভরতা কমবে এবং মানুষ নিজ জেলাতেই প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবে।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্য, সমাজকল্যাণ, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে একটি কার্যকর সেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় সরকার।

‘প্রতিবন্ধী শিশুদের উন্নয়ন কোনো একক মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। এটি একটি সমন্বিত জাতীয় দায়িত্ব। সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে,’ বলেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রী জানান, সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য নতুন নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। এর মাধ্যমে তারা সমাজের মূলধারায় আরও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে কোনো প্রতিবন্ধী শিশু অবহেলিত থাকবে না। প্রতিটি শিশুর প্রতিভা বিকাশের সুযোগ থাকবে এবং তারা মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারবে।’

সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘শিশু স্বর্গ প্রকল্প শুধু একটি অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নয়; এটি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ার কর্মসূচি। সরকারের লক্ষ্য হলো প্রতিটি জেলায় ধাপে ধাপে এই সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের সব প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।’

/ইউএস/
সম্পর্কিত
নদীমাতৃক বাংলাদেশে ব্যাকওয়াটার ট্যুরিজম ঘিরে নতুন সম্ভাবনা
তথ্য-উপাত্তে গড়মিল হলে কঠোর ব্যবস্থা: পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী
‘শিশুদের কাছে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে কাজ করছে সরকার’
সর্বশেষ খবর
বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে তারেক রহমান
বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে তারেক রহমান
চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পুকুর ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা, সাঁতারে নামলেই ব্যবস্থা
চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পুকুর ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা, সাঁতারে নামলেই ব্যবস্থা
মেঘ-পাহাড়ের রাজ্যে সুংসাংপাড়া, যেখানে পথের প্রতিটি বাঁকেই নতুন গল্প
মেঘ-পাহাড়ের রাজ্যে সুংসাংপাড়া, যেখানে পথের প্রতিটি বাঁকেই নতুন গল্প
হাসপাতালে রোগীকে ধর্ষণের অভিযোগে বাংলাদেশি চিকিৎসককে খুঁজছে এফবিআই
হাসপাতালে রোগীকে ধর্ষণের অভিযোগে বাংলাদেশি চিকিৎসককে খুঁজছে এফবিআই
সর্বাধিক পঠিত
আদালতে ঢুকে সেই ওসির ৩ স্যালুট, বিচারক বললেন ‘আপনি এখানে কেন’
আদালতে ঢুকে সেই ওসির ৩ স্যালুট, বিচারক বললেন ‘আপনি এখানে কেন’
শাহজালালে দুই যাত্রীর লাগেজে মিললো ৩ লাখ টাকার বিদেশি মদ
শাহজালালে দুই যাত্রীর লাগেজে মিললো ৩ লাখ টাকার বিদেশি মদ
দলে নতুন পদ পেলেন এমপি মাহমুদুল হোসাইন
দলে নতুন পদ পেলেন এমপি মাহমুদুল হোসাইন
বিদ্যুৎ সংযোগ দিতেই পুড়ে গেলো ৩ মহল্লার টিভি-ফ্রিজসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস পণ্য
বিদ্যুৎ সংযোগ দিতেই পুড়ে গেলো ৩ মহল্লার টিভি-ফ্রিজসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস পণ্য
সব চূড়ান্ত, এখন অপেক্ষা ইধিকা পালের
সব চূড়ান্ত, এখন অপেক্ষা ইধিকা পালের