আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপতথ্য মোকাবিলা, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, এলপিজির বাজার পরিস্থিতি, তথ্য কমিশন পুনর্গঠন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফর এবং সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলা-ভাঙচুরের ঘটনাসহ সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব বিষয়ে কথা বলেন। পরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও জবাব দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরে প্রায় ৮০ কর্মসূচি
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক নিউইয়র্ক সফরের বিভিন্ন কর্মসূচির তথ্য তুলে ধরে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘সফরে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সংশ্লিষ্ট আটটি এবং ১১টি প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসূচি ছিল। প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা সম্মিলিতভাবে প্রায় ৮০টি কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।’
এসব কর্মসূচিতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রফতানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক শান্তির মতো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে বলে জানান তিনি।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর বাংলায় দেওয়া ভাষণ প্রসঙ্গে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘ভাষণটিতে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোর মধ্যে ভারসাম্য ছিল। বিশ্বের বিভিন্ন সংকট ও ভবিষ্যৎ পথনির্দেশনার পাশাপাশি একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার দেশের জনগণের জন্য কী করতে চায়, তারও প্রতিফলন ছিল সেখানে।’
৫৫ লাখ পরিবার পাচ্ছে ১৫ টাকা কেজির চাল
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়া এবং এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পড়ার প্রসঙ্গ টেনে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দেন তথ্য উপদেষ্টা।
তিনি জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় দেশের ৫৫ লাখ দরিদ্র ও অতিদরিদ্র পরিবারকে প্রতি কেজি ১৫ টাকা দরে মাসে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে।
আগের তুলনায় এ কর্মসূচির আওতা বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে সরকার বড় অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সামর্থ্য অনুযায়ী ভবিষ্যতে সুবিধাভোগীর সংখ্যা আরও বাড়ানোর চেষ্টা থাকবে। অপুষ্টি মোকাবিলায় দেশের ৩০০ উপজেলায় ভিটামিন ও খনিজসমৃদ্ধ ফর্টিফাইড রাইস বিতরণ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
‘দেশে এলপিজির কোনও সংকট নেই’
দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) কোনও সংকট নেই বলে ব্রিফিংয়ে জানান তথ্য উপদেষ্টা। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এলপিজি আমদানিকারক ও অপারেটররা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত সরবরাহ ও মজুত রয়েছে।’
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে এ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন।
তবে পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও কোথাও কোথাও দাম বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অসৎ উদ্দেশ্যে কেউ যেন এলপিজি মজুত করে কৃত্রিম সংকট বা জনভোগান্তি সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়েছে।’
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘বিশ্ববাজারেও বিভিন্ন পণ্যে জল্পনানির্ভর মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যায়। তবে দেশে কেউ মজুতদারি করে বাজারে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করলে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম প্রসঙ্গে উপদেষ্টা জানান, উন্মুক্ত জলাশয়ে পোনা অবমুক্তকরণসহ নিয়মিত কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে মৎস্য আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় অভিযান ও জরিমানা করা হচ্ছে।
শিগগিরই কার্যকর হবে তথ্য কমিশন
আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবসের প্রসঙ্গ টেনে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘অপতথ্যের বিস্তার মোকাবিলায় মানুষের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি বলেন, ‘তথ্যের প্রবেশাধিকার যত বেশি বাড়ানো যাবে, গুজব ও অপতথ্যের বিস্তার মোকাবিলা তত সহজ হবে। এ ক্ষেত্রে তথ্য কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।’
তথ্য কমিশন পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া খুব অল্প সময়ের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর জনগণ যেসব ক্ষেত্রে তথ্য পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, সেসব বিষয়ে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই হওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার, প্রযুক্তি বিনিময়, পারমাণবিক নিরাপত্তা এবং বেসামরিক জ্বালানি খাতে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা বাড়ানো এ সমঝোতার অন্যতম উদ্দেশ্য।
তথ্য উপদেষ্টার ভাষ্য, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে পারমাণবিক শক্তির যুগে প্রবেশ করেছে। ভবিষ্যতে এ খাতে প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, জনবল প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই সমঝোতার কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তেমন কোনও প্রভাব পড়বে বলে তিনি মনে করেন না।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বার্থ ও প্রয়োজন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ভারত, তুরস্কসহ প্রয়োজনীয় সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ সম্পৃক্ত থাকবে। পারমাণবিক খাতেও দেশের সামনে বিভিন্ন বিকল্প খোলা রাখা প্রয়োজন।’
ইউরেনিয়াম পরিবহনে পাকিস্তানের আকাশসীমা নিয়ে ‘তথ্য নেই’
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য রাশিয়া থেকে ইউরেনিয়াম পরিবহনের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ার প্রসঙ্গও ওঠে ব্রিফিংয়ে।
এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের কোনও প্রভাব ছিল কিনা সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, এ বিষয়ে তার কাছে নিশ্চিত কোনও তথ্য নেই। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে অনুমাননির্ভর কোনও মন্তব্য করতে চান না তিনি।
পরিবেশ ও ‘ওয়ান হেলথ’ উদ্যোগ
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তুলে ধরে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থা ও ‘ওয়ান হেলথ’ কার্যক্রমসংক্রান্ত সম্মেলনে বাংলাদেশের পরিবেশমন্ত্রী অংশ নিয়েছেন।’
মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ ও বাস্তুতন্ত্রকে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় রেখে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়াই ‘ওয়ান হেলথ’ ধারণার অন্যতম দিক বলে জানান তিনি। পরিবেশ সুরক্ষাকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে দাবি করে বৃক্ষরোপণসহ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন জাহেদ উর রহমান।
প্রকল্প অনুমোদনের জটিলতা কমানোর চেষ্টা
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নতুন প্রকল্প গ্রহণ, অর্থছাড় এবং বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজ। একই সঙ্গে প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতা যতটা সম্ভব কমিয়ে প্রক্রিয়াটি দ্রুত করার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
‘পুলিশ-বিজিবিসহ বাহিনীগুলো দায়িত্বের সঙ্গে কাজ করছে’
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিফিংয়ে বিস্তারিত কথা বলেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, অবৈধ অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার, আসামি গ্রেফতার, মাদক উদ্ধারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, বিজিবি এবং অন্যান্য বাহিনী নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের উপস্থিতিতে ভাঙচুর, আসামি পালিয়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন তোলেন। জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, দেশে আইনশৃঙ্খলাজনিত কোনও সমস্যা হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে নাগরিকদের প্রত্যাশা ও অভিযোগ জানানোর পূর্ণ অধিকার রয়েছে। সরকারও দাবি করছে না যে কোনও ঘটনা ঘটছে না বা কোথাও দায়িত্বে অবহেলা হচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘যেখানে গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং তদন্তের মাধ্যমে আরও কারও দায় পাওয়া গেলে তাকেও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।’
‘এনার্কির অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছি’
বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গে ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ের তুলনা করে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, পুলিশ বাহিনীকে একটি অত্যন্ত কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে পুনরায় স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে হয়েছে।
তার ভাষায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে অপরাধ ঘটছে এবং কোনও কোনও অপরাধ বেড়েছে, আবার কিছু অপরাধ কমেছে। কিন্তু পরিস্থিতিকে তিনি ‘এনার্কি’ বা নৈরাজ্যের অবস্থা বলে মনে করেন না।
আগের বিভিন্ন ঘটনায় পত্রিকা অফিসে হামলার ঘোষণা, মাজার ভাঙচুর, মেয়েদের ফুটবল ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ করে দেওয়ার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, তখনকার মতো ধারাবাহিক ও ‘সিস্টেমেটিক’ পরিস্থিতি এখন নেই।
তিনি দাবি করেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা এসেছে এবং যেসব ঘাটতি এখনও আছে, সেগুলোও ধীরে ধীরে কমবে।
‘পারসেপশন ম্যাটার্স’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, মানুষের ধারণা বা ‘পারসেপশন’ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ এবং সরকার বিষয়টিকে ছোট করে দেখছে না।
তবে তার দাবি, সাম্প্রতিক ছয় মাসের অপরাধের তথ্য আগের ছয় মাসের সঙ্গে তুলনা করলে কিছু অপরাধের সংখ্যা কমেছে, আবার কিছু বেড়েছে। সেই হিসাবে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘অনেক বেশি খারাপ হয়ে গেছে’ এমন মূল্যায়নের সঙ্গে সরকার একমত নয়।
বিশেষ কোনও বাহিনী বা অভিযান চালানোর পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের কার্যক্রম আরও বাড়াচ্ছে। জনগণ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনে প্রয়োজন হলে আইনি কাঠামোর মধ্যে সরকার অন্য সিদ্ধান্তও নিতে পারে।
সালমান মুক্তাদিরের ঘটনা ও অপতথ্য
কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার পর চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে দেওয়া তার প্রাথমিক বক্তব্য এবং পরে অবস্থান পরিষ্কার করার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘হামলার শিকার হিসেবে সালমান মুক্তাদিরের প্রতি সরকারের সহানুভূতি রয়েছে। কোনও ব্যক্তির স্থাপনায় হামলা বা ভাঙচুরের পক্ষে সরকার সাফাই দিচ্ছে না এবং এ ধরনের ঘটনা হওয়া উচিত নয়।’
তবে প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য যাচাই না করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি জামায়াতে ইসলামীর আমিরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, নতুন তথ্য সামনে আসার পর আগের অবস্থান সংশোধন করাও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণের অংশ হতে পারে।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরে ‘সরকার দুঃখিত ও বিব্রত’
মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ভাঙচুর এবং এ ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজনের নাম আসার অভিযোগ প্রসঙ্গেও কথা বলেন তথ্য উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের যেকোনও নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে, কোনও স্থাপনা ভাঙচুর বা কেউ হামলার শিকার হলে সরকার দুঃখিত। নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব হওয়ায় এ ধরনের ঘটনা সরকারকে বিব্রত করে।’
ঘটনার সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের কেউ জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে কী হবে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তদন্তে যারই সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।’
ডা. জাহেদ বলেন, ‘সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ হলেও পুলিশের তদন্তই শেষ পর্যন্ত অভিযোগপত্রের ভিত্তি হবে। তদন্তে কারও নাম ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে পুলিশ নিশ্চিত হলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘এমন ঘটনার মানুষের ওপর প্রভাব গুরুতর। রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব অপরাধ ঠেকানো; অপরাধ ঘটে গেলে দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা না ঘটে।’
‘অপতথ্য দিয়ে ন্যারেটিভ তৈরি উদ্বেগজনক’
সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের নাম জড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে— এমন প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল।’
তিনি বলেন, ‘সরকারকে সমালোচনা বা বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা উচিত নয়। যৌক্তিক ও সত্য তথ্যের ভিত্তিতে সরকারের সমালোচনা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারই অংশ এবং এমন সমালোচনা সরকারকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করতে পারে।’ কিন্তু মিথ্যা বা অপতথ্যের ভিত্তিতে একটি ‘ন্যারেটিভ’ তৈরির চেষ্টা উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে তিনি একটি ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানের তথ্য উল্লেখ করে বলেন, ‘সরকারের প্রথম ছয় মাসে সরকারকে কেন্দ্র করে ৪৬৪টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে কেন্দ্র করে ছিল ১৫৭টি।’ তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী নিজেও সামাজিক ও মূলধারার গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণ করেন এবং কোনও কোনও সংবাদ দেখে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেন।
সাইবার সুরক্ষা আইনের কাঠামোয় অপতথ্য মোকাবিলা
অপতথ্য মোকাবিলায় সরকার কী ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নেবে, এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকার প্রথমে একটি যথাযথ আইনি কাঠামো নিশ্চিত করতে চায়।
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে মতবিনিময় চলছে এবং আরও আলোচনা হবে বলে জানান তিনি।
আইনটি হলে তার কাঠামোর মধ্যে অপতথ্য ও ডিজিটাল অপরাধ মোকাবিলার চেষ্টা করা হবে উল্লেখ করে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, শুধু আইন দিয়েই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। রাজনৈতিক ও সামাজিক সদিচ্ছা এবং নাগরিক সচেতনতাও জরুরি।
এনসিপির ‘গণভিক্ষা’ কর্মসূচি নিয়ে যা বললেন
চাঁদাবাজির প্রতিবাদে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ‘গণভিক্ষা’ ধরনের কর্মসূচি প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, অহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচিকে সরকার স্বাগত জানায়।
কোনও রাজনৈতিক দল যদি মনে করে এমন কর্মসূচির মাধ্যমে তারা জনগণের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারবে, সেটি তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
একই সঙ্গে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠলে কারা জড়িত এবং তাদের রাজনৈতিক পরিচয় কী— তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শেখ হাসিনাকে ফেরত আনা ‘বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপক্ষীয় বিষয়’
ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত আনার প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান বলেন, বাংলাদেশ তাকে ফেরত চাইছে এবং বিষয়টি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় ইস্যু।
তিনি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেশের আদালতের রায় ও মামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, তাকে ফেরানোর বিষয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ ও আলোচনা চলছে।
তথ্য উপদেষ্টা জানান, ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে নিজের বৈঠকেও তিনি এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন। অন্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গেও ভারতীয় প্রতিনিধিদের আলোচনায় বিষয়টি তোলা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় পক্ষ হিসেবে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রয়োজন নেই— এমন বক্তব্যের প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকারও বিষয়টিকে মূলত বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় বিষয় হিসেবেই দেখে।
বোয়িং-এয়ারবাস: ‘চাপের কারণে নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত’
বাংলাদেশ বোয়িংয়ের পাশাপাশি এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কিনবে কিনা এবং এ নিয়ে ইউরোপের কোনও চাপ রয়েছে কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘কোনও দেশের চাপ বা শর্তের কারণে বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত নেবে না।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের বিমানবহর সম্প্রসারণ ও বৈচিত্র্য আনার প্রয়োজন হলে এয়ারবাস কেনার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে। কিন্তু সেটি হবে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রয়োজন ও বাণিজ্যিক বিবেচনায়।’
তার ভাষায়, বোয়িং কেনা হোক বা এয়ারবাস, বাংলাদেশ তার স্বার্থ ও প্রয়োজন বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবে; কোনও বিদেশি চাপের কারণে নয়।