রোজা এলেই দেশের রাজনৈতিক দলগুলো শুরু করে ‘ইফতার রাজনীতি’। প্রায় প্রতিটি দলই ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে। এর মধ্য দিয়ে ভিন্ন মতাদর্শের দলগুলোকে নিয়ে ইফতারের টেবিলে বসে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করা হয়। তবে রাজনৈতিক দলগুলো সম্পর্ক উন্নয়নে ব্যস্ত থাকলেও ইফতার আয়োজনে শ্রেণি বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। দলের নেতাকর্মীদের জন্য নানা পদের ইফতার আয়োজন থাকলেও গাড়িচালকদের থাকে সাধারণ মানের ইফতার। মূল আয়োজনস্থলের বাইরে ঘাস অথবা মাটিতে বসেই তাদের ইফতার করতে হয়।
বিগত বছরগুলোতে এ ধরনের বৈষম্য ছিল চোখে পড়ার মতো। চলতি রমজানেও রাজনৈতিক দলের প্রতিটি ইফতারে এই বৈষম্য দেখা গেছে।
আলেমরা বলছেন, ইসলামে ইফতারের নানা তাৎপর্য আছে। এক্ষেত্রে খাবার আয়োজনে শ্রেণি বৈষম্য হওয়া ঠিক নয়।
রাজনৈতিক নেতাদের মত, ইফতারে বৈষম্য সৃষ্টি করা পরিকল্পিত নয়। আয়োজনের চেয়ে উপস্থিতির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় গাড়ি চালকদের দ্রুত খাবার সরবরাহ করতেই মূল আয়োজন ও চালকদের ইফতারে মিল থাকে না। এছাড়া বসার জায়গার অভাবে অনেক সময় গাড়িচালকরা বসতে পারেন না।
আওয়ামী লীগের ইফতার
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ইফতার মাহফিলে প্রতিবারের মতো এবারও শ্রেণি বৈষম্য দেখা গেছে।
গত ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা রাজনৈতিক নেতাদের সম্মানে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেন। সেখানেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ভিড় ছিল। প্রত্যেক নেতারা আসেন তাদের ব্যক্তিগত গাড়িতে করে। ফলে তাদের গাড়ির চালকও ছিলেন একজন করে। তাদের জন্য ইফতারি বরাদ্দ থাকলেও বসার কোনও জায়গা ছিল না।
চালকরা সবাই গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে গণভবন থেকে পাঠানো ইফতারি প্যাকেট হাতে পান। গাড়িতে বসেই তারা ইফতার করেন। জায়গা না থাকায় অনেকে গাড়ি নিয়ে চলে যান সংসদ প্লাজায়। সেখানে মাঠে বসে ইফতার করেন।
এছাড়া ২৮ জুন প্রধানমন্ত্রীর ইফতার মাহফিলেও একই দৃশ্য দেখা গেছে।
আওয়ামী লীগের এক সাংগঠনিক সম্পাদকের গাড়ি চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এগুলো এখন আমাদের কাছে কোনও ব্যাপার নয়। এ বৈষম্য আমরা সহ্য করেই থাকি। অনেক জায়গায় স্যারদের (নেতা) নিয়ে যাই। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাইরে বসে থাকি। কোথাও ইফতারের প্যাকেট পাই, কোথাও পাই না। বসার ব্যবস্থা তো থাকেই না।’
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানকের গাড়িচালক সম্রাট বলেন, ‘আমি স্যারকে নামিয়ে দিয়ে গণভবনের মূল গেট থেকে একটা কুপন নিয়ে ইফতারির প্যাকেট নিয়ে গাড়ি চালিয়ে সংসদ প্লাজায় চলে যাই, সেখানে গাড়িতে বসেই ইফতার করি।’
অপর যগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব উল আলম হানিফের গাড়িচালক সোহেল বলেন, ‘আমিও স্যারকে নামিয়ে দিয়ে ইফতারির প্যাকেট নিয়ে সংসদ প্লাজায় চলে যাই। সেখানে আরও অনেক ড্রাইভার ছিল। আমরা সবাই নিজ নিজ গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে ইফতার করি।’
ইফতার মেনুতে কী ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্যারদের জন্য কী ছিল জানি না। আমাদের প্যাকেটে ছিল- ২ টুকরা শশা, ১টি জুসের প্যাকেট, কিছু মুড়ি, ২টা খেজুর, ১টা জিলাপি, ২টা পিঁয়াজু, কিছু ভাজা ছোলা, একটি ছোট পানির বোতল ও হাফ তোহারির প্যাকেট।’
জানা গেছে, সাধারণ ইফতারির প্যাকেটের পাশাপাশি সিনিয়র নেতাদের জন্য বিশেষ খাবারের আয়োজন ছিল।
সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের গাড়িচালক হানিফ বলেন, ‘আমরা গণভবনের ভেতরে ইফতার করিনি। প্যাকেট নিয়ে বাইরেই গাড়িতে বসে ইফতার করেছি।’
বিএনপির ইফতার
সংসদের বাইরে থাকা প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপির প্রায় ইফতারেও চালকরা বৈষম্যের শিকার হয়। নেতা ও আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য বিশেষ খাবার থাকলেও গাড়িচালকদের জন্য থাকে সাধারণ খাবার। তবে এ নিয়ে গাড়িচালকদের কোনও ক্ষোভ নেই।
মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর বিএনপির আয়োজনে লেডিস ক্লাবে ইফতার মাহফিল হয়। সেখানে খালেদা জিয়ার সঙ্গে মঞ্চে থাকা নেতাদের জন্য ছিল বিশেষ খাবার। আর মঞ্চের সামনে বসা নেতাকর্মীদের জন্য বরাদ্দ ছিল দুটি খেজুর, একটি বেগুনি, একটি ডাল বড়া আর মুরগী পোলাও।
গত ১১ জুন বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারে খালেদা জিয়ার আহ্বানে রাজনীতিকদের সম্মানে ইফতার আয়োজন করা হয়। ওই ইফতারে মূল মিলনায়তনে ছিল অন্তত ১০ পদের খাবার। ওয়েটার ক্যাপ্টেন জাকির বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ওই দিনের ইফতারে চিকেন, ছোলা, হালিম, জিলাপি, খেজুর, রোল, জুস, আপেলসহ নানা পদ ছিল। মঞ্চে ছিল আরও কয়েক পদের বেশি খাবার।
একই দিন মিলনায়তনের বাইরে ইফতার করতে হয় কয়েকশ নেতাকর্মী ও নেতাদের গাড়িচালকদের। এ কারণে তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল দুই ধরনের খাবার। দেরিতে আসা নেতাকর্মীরা খেয়েছেন হালিম ও মুড়ি। অনেকটা ডালভাতের মতো খেতে দেখা গেছে তাদের।
গাড়িচালকদের কাছে ইফতারের অনেক আগেই পৌঁছে যায় মোরগ-পোলাও। বিএনপির ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সের গাড়িচালক মিজান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ওইদিনের বিরানি খুব মজার ছিল। তবে তারা আর কোনও খাবার পাননি।
এছাড়া চালক রবি, মোস্তফা কামালসহ অনেকে জানান, তাদের কাছে ইফতারের আগেই বিরানী পৌঁছে গেছে। তবে ভেতরে বসার জায়গা ছিল না।
ইফতারে বৈষম্য নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্যের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘ব্যাপারটা নিম্নমানের এবং নিম্ন মানসিকতার। প্রথম কোনও ইফতারেই চেইন অব কমাণ্ড ছিল না। খালেদা জিয়ার ইফতারে ছিল নেতাদের সেলফিবন্যা।’
প্রবীণ এই নেতার ভাষ্য, ‘কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী নেতারাও সেলফি তুলতে ব্যস্ত ছিলেন। মহাসচিবের নির্দেশ মানতে দেখা যায়নি কর্মীদের। অন্যদিকে ইফতারে অংশ নিতে কর্মীদের বচসা, ঝগড়া করতে দেখা গেছে।’
এরইমধ্যে এলডিপির ইফতারে প্রবেশ নিয়ে দলের কয়েকজন নেতাকে মারধর করে ছাত্রদলের কয়েকজন উশৃঙ্খল নেতাকর্মী।
হেফাজতের ইফতার
গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর বারিধারা মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলামের ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। সেই ইফতার মাহফিলেও দেখা যায় বৈষম্য। সবার জন্য ছিল ছোলা, জিলাপি, বেগুনি, পানি আর তেহারি। তবে মঞ্চে থাকা অতিথিদের জন্য অতিরিক্ত ছিল ফল, শরবত, হালিম ও স্যুপ।
হেফাজতের এই ইফতার মাথফিলে মঞ্চে অতিথি ছিলেন, হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী, সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আব্দুল কাদের, হেফাজতের ঢাকা মহানগর যুগ্ম মহাসচিব ফজলুল করিম কাসেমী, বাহাউদ্দিন জাকারিয়া, মুফতি ফখরুল ইসলাম, মাওলানা আব্দুল কালাম প্রমুখ। কিন্তু মঞ্চের বাইরে ছিলেন বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসার ইমাম, শিক্ষক, সাংবাদিক, হেফাজত নেতা প্রমুখ।
তবে জাতীয় পার্টি একাধিক ইফতার করলেও গাড়িচালকদের ইফতার ছিল মূল মিলনায়তনের ভেতরেই। কাকরাইল ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে গিয়ে সবাইকে একসঙ্গে ইফতার করতে দেখা গেছে।
জামায়াতের ইসলামী হোটেল ওয়েস্টিন ও সোনারগাঁয় ইফতার আয়োজন করলেও শেষ মুহূর্তে আয়োজন বাতিল করে দলটি। বাম ধারার কয়েকটি দল ছোটখাট পরিসরে ইফতার আয়োজন করেছে। গণফোরাম হোটেল পূর্বাণীতে ইফতার আয়োজন করে। সেখানে খাবারে বৈষম্য দেখা যায়নি।
উত্তরা এক নং সেক্টর জামে মসজিদের খতিব মুফতি মাওলানা লুৎফুর রহমান বলেন, ‘ইফতারের তাৎপর্য অনেক। ইসলামে এ নিয়ে বৈষম্যের সুযোগ নেই। হয়তো কেউ খেয়াল করেননি। কিন্তু এটা সঠিক নয়। বরং, ভেতরে হোক, বাইরে হোক, সবার জন্য সমান আয়োজন থাকা মহোত্তম।’
গত ২৬ জুন ভারতীয় হাইকমিশন ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়। সেখানে রাজনৈতিক নেতাদের ঢল নামে। কিন্তু গাড়িচালকদের জন্য সেখানে কোনও ইফতারের আয়োজন ছিল না।
যৌথভাবে প্রতিবেদন তৈরি ও ছবি তুলেছেন: পাভেল হায়দার চৌধুরী, সালমান তারেক শাকিল, চৌধুরী আকবর হোসেন, নাসিরুল ইসলাম, সাজ্জাদ হোসাইন।
- ওসি কুনিও হত্যা মামলার চার্জশিট প্রস্তুত, অব্যাহতি পাচ্ছেন বিপ্লবসহ ৪ যুবদল নেতা
- মাইশা জানে না, বাবা নেই
এজে/








