র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের পক্ষ থেকে সারাদেশে নিখোঁজ যে ২৬২ জনের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, এর মধ্যে প্রতিবন্ধী, কারাবন্দি ও প্রবাসীও আছেন। অনেকে আছেন পরিবারের সঙ্গেই। তাদের মধ্যে ৬০ জনের বেশি ব্যক্তির খোঁজ ইতোমধ্যেই পাওয়া গেছে। এ নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে র্যাব।
কোনও ধরনের যাচাই বাছাই ছাড়াই র্যাব এ তালিকা কেন প্রকাশ করলো তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে র্যাবের দাবি, অফিসিয়াল তথ্য দিয়েই তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, যাচাই বাছাই করতে গেলে তাদের এক বছর সময় লেগে যেত।
রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারি ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ার ঈদগাহে হামলার পর জানা যায়, হামলাকারীরা ছয়-সাত মাস ধরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেশের নিখোঁজ নাগরিকদের তালিকা করে। এরপর গত ১৯ জুলাই র্যাবের অফিসিয়ার ফেসবুক পেজে ২৬২ জনের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়।
র্যাবের ওই তালিকা ধরে অনুসন্ধান চালান গণমাধ্যমকর্মীরা। দেখা যায়, অনেকে নিখোঁজ না হয়েও নিখোঁজের তালিকায় আছেন। এমনকি ওই তালিকায় প্রতিবন্ধী, কারাবন্দী, প্রবাসী এমনকি নিহত ব্যক্তির নামও উঠে এসেছে।
র্যাবের সরবরাহ করা তালিকায় রংপুরের ৯ জন নিখোঁজের কথা বলা হলেও, এর মধ্যে ছয়জনই নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন। একজন আট মাস ধরে কারাগারে আটক রয়েছেন এবং একজন মানসিক রোগী। তালিকার অপর এক ব্যক্তির কোনও হদিস পাওয়া যায়নি।
তালিকায় ১৬৩ নম্বরে থাকা নগরীর মনোহরপুর পশ্চিমপাড়া মহল্লার মাহবুবুর রহমানের ছেলে ইকবাল হোসেনও নিখোঁজ নন। তিনি গত বছরের ২৪ নভেম্বর থেকে রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে একটি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় আটক রয়েছেন।
অন্যদিকে, নিখোঁজ তালিকায় ১৬৪ নম্বরে থাকা নগরীর আলম নগর কলোনির ইকবাল আহাম্মেদের ছেলে সাদাফ ইকবাল নিজ বাড়িতে বাবা-মার সঙ্গেই অবস্থান করছেন।
তালিকায় ১৬৫ নম্বরে থাকা নগরীর পার্বতীপুর মহল্লার আল আমিনের ছেলে নজরুল ইসলাম নামের এক যুবক নিখোঁজ রয়েছে বলে তালিকায় থাকলেও ওই গ্রামে গিয়ে নজরুল ইসলাম নামে কাউকেই পাওয়া যায়নি।
এদিকে, র্যাবের নিখোঁজ তালিকায় ঝিনাইদহের ২৯ জনের নাম রয়েছে। তবে সেই নাম নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। ওই তালিকায় নিহত, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, প্রবাসী ও বাড়ি ফিরে আসা ব্যক্তিদের নাম রয়েছে। এছাড়া প্রকাশিত তালিকার মধ্যে মাত্র দুজনের নিখোঁজ থাকার প্রমাণ মিলেছে। এরা হলেন- ঝিনাইদহ শহরের উপশহরপাড়া মসজিদের মোয়াজ্জিন সোহেল রানা ও সদরের হলিধানী গ্রামের রাশেদুজ্জামান রোজ। তবে পুলিশের নিখোঁজের তালিকায় সোহেল রানার নাম থাকলেও রোজ নেই।
ঝিনাইদহ পুলিশ সুপার আলতাফ হোসেন জানান, বিভিন্ন সময় জেলায় ২৪ জন নিখোঁজের খবর তাদের কাছে ছিল। কিন্তু নিখোঁজ থাকা সবাই বাড়ি ফিরে এসেছে। কেউ আবার প্রবাসী।
এদিকে, র্যাবের তালিকায় ৬২ নম্বরে থাকা সোহেল ও ৬৩ নম্বরে থাকা মামুন রায়হান দুইজনই প্রতিবন্ধী।
২০৬ নম্বরে থাকা মহেশপুরের গোয়ালহুদা গ্রামের বাপ্পি ও ২৩২ নম্বরে থাকা একই গ্রামের ওয়াফিলকেও বাড়িতে পাওয়া গেছে।
ওয়াফিলের বাবা ইয়াকুব হোসেন জানান, ১১ বছর বয়সে তার ছেলে ও বাপ্পি নামে তার এক বন্ধু নিখোঁজ হয়। পরে জানতে পারি ইংরেজি পরীক্ষা খারাপ হওয়ার কারণে বাপ্পি ও ওয়াফিল ছয়দিন পালিয়ে ছিল। এ ঘটনায় থানায় জিডি করা হয়। তিন বছর পর র্যাবের করা তালিকা দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছেন।
শৈলকুপার সাতগাছি গ্রামের মো. মজিবর খাঁ (২৮) বোয়ালিয়ার উজ্জল, ওয়াসিম আকরাম (২৫), উমেদপুরের মো. রবিউল ইসলাম (২৫), বাজারপাড়ার মো. রফিকুল ইসলাম (২২) ও কৃষ্ণপুর গ্রামের মো. তোতা (২৫) মিয়া নিখোঁজ নয় বলে তাদের পরিবার জানিয়েছে।
এদিকে, ঝিনাইদহের বিভিন্ন গ্রাম থেকে ১০ জনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিচয় দিয়ে তুলে নিয়ে যায়। দীর্ঘদিনেও তাদের কোনও সন্ধান মেলেনি। এই তালিকায় তাদের নাম আসেনি।
র্যাবের সরবরাহ করা নিখোঁজ তালিকায় ৬০ নম্বরে থাকা চাঁপাইনবাবগঞ্জের মোস্তফা কামাল (২৬) গত ১৩ জুলাই বাড়ি ফিরে এসেছেন। ঈদের আগের দিন গরু কিনতে গিয়ে অপহরণের শিকার হন বলে জানান তিনি।
র্যাবের প্রকাশ করা নিখোঁজের তালিকায় নাম উঠলেও নিখোঁজ নন রাশেদ গাজী নামের এক যুবক। তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন।
র্যাবের দেওয়া ওই তালিকায় ২১৫ নম্বর ক্রমিকে থাকা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মো. রহমতুল্লাহ রাজশাহীর কারাগারে রয়েছেন বলে স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
এদিকে, নিখোঁজের তালিকায় থাকা মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার শ্রীনগর সরকারি কলেজের ছাত্রী নুরুন্নাহার ইরা (১৯) জানান, গত ১৯ জুন তিনি কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে চলে যান। পালিয়ে বিয়ে করে গত এক মাস ধরে তিনি ঢাকায় ছিলেন। মঙ্গলবার কিছু পত্র-পত্রিকায় তার নিখোঁজের খবর ছাপা হলে এবং তার জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার আশঙ্কা করা হলে ওইদিন বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে নিজেই শ্রীনগর থানায় এসে হাজির হন।
র্যাবের নিখোঁজ তালিকায় থাকা নরসিংদীর শাহাজ উদ্দিন (১৯) নিজ বাড়িতেই আছেন। অপরজন কমর উদ্দিন (৩০) প্রবাসে কর্মরত।
কমর উদ্দিন কাজ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। আড়াইমাস আগে ছুটিতে দেশে এসেছিলেন তিনি। সেসময় পাসপোর্ট সংক্রান্ত কাজে ঢাকায় যাওয়ার পর সেখান থেকে বাড়িতে না ফিরে বেড়াতে যান খুলনার এক বন্ধুর বাড়িতে। তার বাড়ি না ফেরার ঘটনায় ও মোবাইল ফোন বন্ধ পেয়ে বড় ভাই কামাল হোসেন রাজধানীর তেজগাঁও থানায় জিডি করেছিলেন। ওই জিডি ধরেই নিখোঁজ তালিকায় তার নাম আসে।
নিখোঁজ না থাকলেও তালিকায় নাম আসা প্রসঙ্গে র্যাবের মুখপাত্র মুফতি মাহমুদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এসব নিখোঁজের ঘটনা সব অফিসিয়াল ডকুমেন্ট। সেভাবেই তালিকা তৈরি করা হয়েছে। আমাদের তালিকা সঠিক।’
তালিকা প্রকাশে আরও যাচাই বাছাই করা যেত কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যে যাচাই-বাছাইয়ের কথা বলা হচ্ছে, তা করতে হলে আমাদের একবছর সময় লেগে যেত।’
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘দেশের অনেক প্রতারক জিডি নিয়ে প্রতারণা করে। যারা অনেক ঋণী হয়ে আছে এলাকায়, তারা স্বজনদের দিয়ে থানায় একটা জিডি করে নিজেই পালিয়ে যায়। আবার পরিবারের সদস্য নিখোঁজ হওয়ার পর ফিরে এলে তাদের বিষয়ে আর কোনও তথ্য থানায় দেয় না।’
মুফতি মাহমুদ বলেন, ‘যারা নিখোঁজ নেই, তারা নিখোঁজ না। এটা সহজ। আমরা অফিসিয়াল তথ্য দিয়ে এই তালিকা প্রকাশ করেছি।’
- ‘সরকারি খুতবা’ প্রত্যাখ্যান, আন্দোলনের হুমকি হেফাজতের নারায়ণগঞ্জ শাখার
- ইসলামিক ফাউন্ডেশনের জুমার খুতবায় যা আছে
/বিটি/এজে/







