রাজধানীর পথে ঘাটে এখন মৌসুমি কসাইয়ের ছড়াছড়ি। রাজধানীজুড়ে গরুর হাটের মতোই যেন কসাইয়ের হাট বসেছে।
অলি-গলি থেকে শুরু করে গরুর হাটের আশপাশসহ বড় বড় বিপণি বিতান ও বাজারের এমন কোনও স্থান বাদ নেই যেখানে মৌসুমি কসাইয়ের আনাগোনা নেই। কোরবানি যারা করছেন তাদের কাছে একদিনের জন্যে কদরও রয়েছে মৌসুমি কসাইদের। কারো পেশা রিকশা চালানো, কারো পেশা মাটি কাটা, কারও আবার ক্ষেতে-খামারে কাজ করা, কেউই তারা পেশাদার কসাই নন। এমনকি ঢাকায়ও বসবাস করেন না তারা। কোরবানি উপলক্ষেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকায় এসেছেন।
ঈদের দিনের জন্যে চার হাজার থেকে শুরু করে ১০/২০ হাজার টাকার চুক্তি করে নিচ্ছেন মৌসুমি এসব কসাইরা। কথা বলে জানা গেছে, মৌসুমি কসাইদের বেশিরভাগ এসেছেন কুষ্টিয়া, যশোর, ঝিনাইদহ, রাজবাড়ী জেলা থেকে।
খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, মৌসুমি এসব কসাইরা কোরবানির গরু কাটা সংক্রান্ত কাজ করে দেওয়ার মূল্য নির্ধারণ করে থাকেন গরুর কেনা মূল্য জেনে নিয়ে। হাজার প্রতি দেড়শ’ টাকা করে মৌসুমি কসাইরা কাজের মূল্য নির্ধারণ করে রেখেছেন। অবশ্য কোরবানি যারা দেন তাদের কাছে প্রথমে দাম হাঁকান দুইশ’ টাকা করে। পরে দামদর করে একশ থেকে দেড়শ’ টাকার মধ্যে কোরবানির গরু কাটা সংক্রান্ত চুক্তি সারেন। কেউ আছেন গরু দেখে আনুমানিক মূল্য নির্ধারণ করেন। রাজধানীতে এসব মৌসুমি কসাইরা ছাগল কাটাকাটির কাজ তেমন নিতে চান না। মৌসুমি কসাই হওয়ার ফলে গরু কাটার যন্ত্রপাতি অর্থাৎ চাপাতি, ছুরি এসব তাদের থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে গৃহস্থই সরবারাহ করে গরু কাটার যন্ত্রপাতি।
মৌসুমি কসাইদের তুলনায় পেশাদার কসাইয়ের সংখ্যা একেবারেই কম। মালিবাগ বাজারে মাংসের দোকানে গিয়ে কথা হয় বাহাদুর নামে এক কসাইয়ের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে যত পেশাদার কসাই থাকেন, সবাই কোরবানির গরু কাটাকাটির চুক্তি দুই/তিন মাস আগে থেকে করে ফেলেছেন। আমরা যারা পেশাদার, কেউই খালি নাই। ঢাকায় অসংখ্য পশু কোরবানি হয়। প্রয়োজনের তুলনায় পেশাদার কসাইয়ের সংখ্যা কম থাকায় এখন অপেশাদার কসাইয়ের কদর বেশি। ’
মোহাম্মদপুর ২২৩ নাম্বার বাড়ির মালিক জাকারিয়া ৯০ হাজার টাকা দিয়ে কোরবানির গরু কিনেছেন। গরু কাটার জন্যে তাকে নিতে হয়েছে নজরুল ইসলাম নামের এক মৌসুমি কসাইকে। সর্বমোট নয় হাজার টাকা তার মজুরী দিতে হবে ঠিক হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সেও পেশাদার কসাই নয়। কোরবানি আসলে কাজ করতে করতে সে এখন অর্ধেক পেশাদার কসাই হয়েছে।’ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এরপর পারিবারিকভাবেও আবার সাহায্য করতে হবে কসাইদের।’
ঝিনাইদহ থেকে বিল্লাল হোসেনের নেতৃত্বে ৭ জনের একটি দল এসেছেন রামপুরা বাজারে। তাদের মধ্যে রাজন, শরীফুল, সাদ্দাম ও তরিকুল কসাই কাজে একেবারেই নতুন। তবে বিল্লাল জানেন কসাইয়ের কাজ। পেশাদার কসাই না হলেও গত আট বছর ধরে এ কাজ করতে করতে বিল্লাল এখন পাকা কসাই। অবশিষ্ট রাজন, শরীফুল, সাদ্দাম ও তরিকুল ক্ষেতে কাজ করে। তারা কসাইয়ের সহযোগী হিসাবে কাজ করবে বলে নিয়ে আসা হয়েছে তাদের। বিল্লার বলেন, ‘সাতটা গরুর কাজ পেয়েছি। সাত জন ভাগাভাগি করে সারাদিন ধরে শেষ করে ফেলব। আমাদের এই দলে সবাই পেশাদার হলে তিন থেকে চার ঘন্টার মধ্যে গরু কাটার কাজ শেষ হয়ে যেত।’
বিল্লাল আরও জানান, তার দল সাতটা গরু কাটার চুক্তি করেছে তার মধ্যে সর্বোচ্চ চুক্তি করা হয়েছে দশ হাজার টাকায়। তিনি বলেন, ‘জনপ্রতি ৫/৭ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারব। ’
জিগাতলা বাসস্ট্যান্ডে দেখা হয় মধু নামে আরেক জন মৌসুমি কসাইয়ের সঙ্গে। গত শনিবার ৬০ জনের একটি দল নিয়ে যশোর থেকে ঢাকায় এসেছেন তিনি। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কোরবানির গরু কাটা সংক্রান্ত চুক্তি করেছে তার দলে থাকা অন্যরাও। মধু জানান, তার দল ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর, রামপুরা, গুলশান, আজিমপুর, বিজয়নগর এলাকায় ইতিমধ্যে একশ গরু কাটার চুক্তি করেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের দলে বিশ জন প্রায় ১০ বছর যাবত কোরবানির সময় গরু কাটাকাটি করি। তাই এখন অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে। বাকিরা তেমন অভিজ্ঞ নয়। আমরা এলাকায় ক্ষেতে খামারে কাজ করি। কেউ ফেরি করি। ঈদে একদিনে যেই টাকা পাই তাতে ১৫ দিনের আয় হয়ে যায়। তাই কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে আমরা ঢাকায় আসি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঈদের দিন খাওয়া-দাওয়ায় একটু কষ্ট হয় হোটেল বন্ধ থাকায়। তবে কোনও কোরবানিওয়ালা ভালো হলে আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করে রাখেন। ঈদের দিন সন্ধ্যায় অথবা পরের দিন সকালে চলে যাই। আমরা একেকজন ১০/১২ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করি। ’
কুষ্টিয়া থেকে এসেছেন আকুল শেখ নামে আরেক মৌসুমি কসাই। তিনি গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় এসেছেন ১০ জনের একটি দল নিয়ে। হাতিরঝিলে অবস্থান নিয়েছেন তারা। সেখানে বসে গরু কাটার চুক্তি করেন ঢাকার বাড়িওয়ালাদের সঙ্গে। তারাও ১৫টি গরু কাটার চুক্তি ইতিমধ্যে সেরে ফেলেছেন। আজকের মধ্যে আর দুই-একটা পেলে চুক্তি করবেন বলে জানান আকুল শেখ। তাছাড়া যা চুক্তি হয়েছে তাতে সেরে যাবে বলেও জানান তিনি।
জনপ্রতি ৭/৮ হাজার টাকা করে কামাই হবে এমনটাই আশা করেন আকুল শেখ। কসাইরা পেশাদার কিনা জানতে চাইলে বলেন, ‘হ্যাঁ। তবে পাশে দাঁড়ানো অল্প বয়সী দুই ছেলে ইমরান ও মিঠু বলেন, ‘আমরা কখনও কসাইয়ের কাজ করিনি। এবারের ঈদে আকুল শেখ কাকার সঙ্গে ঢাকায় এসেছি কসাইয়ের কাজ করতে। আল্লাহর রহমতে পারব।’
রামপুরার পূর্ব হাজিপাড়ার ৪০/৫ নাম্বার বাড়ির মালিক আব্দুর রহমান বলেন, ‘পেশাদার কসাই পাইনি গরু কাটার জন্যে। আবার আমাদের পরিবারের লোকও এ কাজে অভ্যস্ত নয়। তিনজন কসাইয়ের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে ৭ হাজার টাকায় গরু কেটে দেবে। জানি এরা পেশাদার কসাই নয়। তবুও বাধ্য হয়েই নিতে হয়েছে।
আব্দুর রহমান বলেন, ‘এরা অপেশাদার হওয়ায় অনেক সময় খাল (চামড়া) কেটে ফেলে, মাংস নষ্ট করে। তবু কী আর করা।’
রুস্তম এসেছেন কুমিল্লা থেকে। ৪ জনের একটি দল নিয়ে গত শুক্রবার তিনি ঢাকায় আসেন। ৫টি কোরবানির গরু কাটার কাজ ইতোমধ্যে পেয়ে গেছেন। হাতে আর কোনও কাজ নেবেন না বলে জানান। ঈদের দিন তার দলের আয় হবে সর্বমোট ৪৫ হাজার টাকা। এতেই সন্তুষ্ট তিনি। পেশাদার কসাই না অপেশাদার কসাই জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর যাবত ঢাকায় এসে কোরবানির গরু কাটার চুক্তি নিতে নিতে এখন আর অপেশাদার আছি বলা যায় না।’ ঈদের দিন সন্ধ্যায় ঢাকা ছাড়বেন বলে জানা তিনি।
পূর্ব রামপুরা ৭৬/৪ নাম্বার একটি বাসায় ভাড়া থাকেন মাহাবুব হোসেন নামে একজন। তিনি ঢাকায় কোরবানি করছেন। বাচ্চু নামে এক মৌসুমি কসাইয়ের সঙ্গে গরু কাটার চুক্তি করেন তিনি। জানান, ৫ হাজার টাকার চুক্তি হয়। তিনি বলেন, ‘আমি জানি বাচ্চু পেশাদার কসাই নয়। অপরাগ হয়ে তাকে নিতে হয়েছে।’
/এইচকে/







