প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রবিবার স্মার্ট কার্ডের বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন। সোমবার থেকে ভোটারদের মাঝে আনুষ্ঠানিকভাবে এ স্মার্ট কার্ড বিতরণ শুরু হবে। এদিন রাজধানী ঢাকার দুইটি স্থান ও বিলুপ্ত ছিটমহল দাশিয়ারছড়ায় এ কার্ড বিতরণ শুরু হবে।
সোমবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দিন আহমেদ দাশিয়ারছড়ায় বিতরণ কাজের উদ্বোধন করবেন। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য ভোটারদের মাঝে বিতরণ হবে এ স্মার্ট কার্ড। আগামী বছর ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের সব নাগরিকদের মধ্যে স্মার্ট কার্ড সরবরাহ করা হবে।
রবিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কার্ড বিরতণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জানান, বিশ্বের সব থেকে উন্নতমানের এ ভোটার কার্ড দেশের নাগরিকদের সরবরাহ করে বাংলাদেশ একটি নতুন যুগে পর্দাপন করল। বহুবিদ কাজে ব্যবহৃত এ স্মার্ট কার্ড দিয়ে নাগরিকরা দেশে বিদেশে বিভিন্ন ধরনের সেবা গ্রহন করতে পারবেন। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায়ও একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হলো। অপরাধী সনাক্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে কার্ডটি।
নতুন এ স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) জন্য ভোটারদের নতুন করে দুটি তথ্য কমিশনকে দিতে হবে। এতে সব ভোটারদের ১০ আঙুলের ছাপ ও চোখের মণির ছবি দিতে হবে যেটা কার্ডের তথ্যভাণ্ডারে সংরক্ষিত হবে। নতুন এই দুটি তথ্য ছাড়াও ভোটার হওয়ার সময় প্রদত্ত আরও বেশকিছু তথ্যও সংরক্ষিত থাকবে। এগুলো হলো ব্যক্তির নাম, পিতার নাম, মায়ের নাম, স্থায়ী ঠিকানা, বর্তমান ঠিকানা, পেশা, বয়স, বৈবাহিক অবস্থা, জন্মতারিখ, রক্তের গ্রুপ, জন্ম নিবন্ধন সনদ, লিঙ্গ, জন্মস্থান, শিক্ষাগত যোগ্যতা, দৃশ্যমান শনাক্তকরণ চিহ্ন ও ধর্ম।
এছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট নম্বর, আয়কর সনদ নম্বর, টেলিফোন ও মোবাইল নম্বর, মা-বাবার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, স্বামী বা স্ত্রীর নাম ও পরিচয়পত্র নম্বর থাকলে এবং মা-বাবা, স্বামী বা স্ত্রী মৃত হলে সে-সংক্রান্ত তথ্য, অসামর্থ্য বা প্রতিবন্ধী হলে সেই তথ্যও উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এসব তথ্যই স্মার্টকার্ডে থাকবে। বর্তমানে প্রচলিত লেমিনেটেড জাতীয় পরিচয়পত্রের ওপরে ছয়টি দৃশ্যমান তথ্য লেখা থাকে। স্মার্টকার্ডে এ তথ্যগুলোর পাশাপাশি জন্মস্থান ও কার্ড প্রদানের সময়টি উল্লেখ থাকছে।
যেভাবে হবে কার্ড বিতরণ
প্রথম পর্যায়ে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং কুড়িগ্রাম জেলা; দ্বিতীয় পর্যায়ে খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রংপুর ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন; তৃতীয় পর্যায়ে ৬৪টি সদর উপজেলা এবং চতুর্থ পর্যায়ে বাকি সব উপজেলায় স্মার্টকার্ড বিতরণ করা হবে।
সোমবার ঢাকার উত্তরার ১ নম্বর ওয়ার্ডের ৬৩ হাজারেরও বেশি ভোটারের কাছে পরীক্ষামূলক স্মার্ড কার্ড বিতরণ শুরু হবে। আগামী ২২ অক্টোবর পর্যন্ত উত্তরা হাই স্কুল ও কলেজে এ বিতরণ কাজ চলবে। আর একইদিনে সোমবার ঢাকা দক্ষিণে রমনা থানার ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটাররা সিদ্ধেশ্বরী গার্লস হাই স্কুল ও কলেজ, ২০ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটাররা সেগুনবাগিচা হাই স্কুল এবং ২১ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটাররা উদয়ন স্কুল কেন্দ্রে কার্ড বিতরণ শুরু হবে। আগামী ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত এ তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ভোটাররা তাদের স্মার্ট কার্ড নিতে পারবেন।
রবিবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, ইতোমধ্যে ঢাকার দুটি থানার জন্য ৫৫ জন অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উত্তরায় ৩০ জন এবং রমনার জন্য ২৫ জন অপারেটর স্মার্টকার্ড বিতরণে কাজ করবেন।
পুরনো কার্ড ফেরত দিয়ে নতুন কার্ড স্মার্ট কার্ড পেতে হলে ভোটারদের পুরনো লেমিনেটেড জাতীয় পরিচয়পত্র ফেরত দিতে হবে। পুরনো কার্ড ফেরত না দিলে নতুন কার্ড পাওয়া যাবে না বলে নির্বাচন কমিশন সচিব সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন। কারও কার্ড হারিয়ে গেলে কেবলমাত্র জিডি বা অন্য কোন ডকুমেন্ট সরবরাহ করলেও নতুন কার্ড পাওয়া যাবে না। তবে যাদের লেমিনেটেড জাতীয় পরিচয় নেই তারা ভোটার হওয়ার সময় যে স্লিপ পেয়েছিলেন সেটা জমা দিলে স্মার্টকার্ড পাবেন। নির্ধারিত সময়ে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এবং মাইকিং, ব্যানার, ফেস্টুন দিয়ে প্রচারের মাধ্যমে সব স্থানের বিতরণের দিন তারিখ ও স্থান জানিয়ে দেবে নির্বাচন কমিশন।
যেসব কাজে কার্ডের ব্যবহার
স্মার্টকার্ড হবে ১০ অংকের। আগের মতো ১৩ কিংবা ১৬ ডিজিটের লম্বা লাইন থাকছে না। দেখতে অনেকটা ব্যাংকের এটিএম কার্ডের আদলেই তৈরি করা হচ্ছে এটি। স্মার্টকার্ডের ১০ ডিজিট ব্যবহার করে দেশের একজন নাগরিক তার মৃত্যু পর্যন্ত নাগরিকদের সব রকমের সুযোগ-সুবিধা নিতে পারবেন।
নতুন এনআইডি কার্ডধারী একজন নাগরিক দেশে যেসব সুবিধা পাবেন, তার মধ্যে রয়েছে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তি ও নবায়ন, আয়কর শনাক্তকরণ (TIN) নম্বরপ্রাপ্তি, পাসপোর্ট প্রাপ্তি ও নবায়ন, চাকরির আবেদন, স্থাবর সম্পত্তি কেনাবেচা, টিআইএন প্রাপ্তি, বিয়ে রেজিস্ট্রেশন, ব্যাংক হিসাব খোলা ও ঋণপ্রাপ্তি, শেয়ার-বিও অ্যাকাউন্ট, সরকারি বিভিন্ন ভাতা উত্তোলন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন উত্তোলন।
এছাড়াও সরকারি ভর্তুকি, সহায়তা ও সাহায্যপ্রাপ্তি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, বিমানবন্দরে আগমন ও বহির্গমন সুবিধা, শেয়ার আবেদন ও বিও অ্যাকাউন্ট খোলা, ট্রেড লাইসেন্সপ্রাপ্তি, যানবাহন রেজিস্ট্রেশন, বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রেশন, বিমা স্কিম, ই-গভর্নেন্স, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ, বিভিন্ন ধরনের ই-টিকিটিং, মোবাইল সংযোগ, হেলথকার্ড, ই-ক্যাশ, ব্যাংক লেনদেন ও শিক্ষার্থীদের ভর্তির কাজ ছাড়াও আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কাজ করা যাবে।
প্রচলিত এসব কাজের বাইরেও আরও অনেক কাজে স্মার্টকার্ড ব্যবহার করা যাবে বলে জানিয়েছেন এনআইডি অণুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুজ্জামান মো. সালেহ উদ্দিন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন ই-গেটিং পদ্ধতি চালু রয়েছে। সেখানে আমাদের এই কার্ডগুলো ব্যবহার করা যাবে। আবার ধরুন, ভবিষ্যতে সার্ক দেশগুলো ভিসা উঠিয়ে দিয়ে এই ই-গেটিং চালু করলো। তখন কিন্তু আমাদের এর জন্য নতুন করে প্রস্তুতি নিতে হবে না। আমাদের এই কার্ডই তখন গ্রহণযোগ্য হবে।’
ডায়াল ১০৫
জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত যেকোনও তথ্য জানাতে একটি হেল্প ডেস্ক খুলেছে এআইডি উইং। যেকোনও ফোন থেকে ১০৫ নম্বরে কল করে নাগরিকদের তথ্য জানাবে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন বিভাগের কর্মকর্তারা।
সহজে যাচাই করা যাবে তথ্য
স্মার্ট জাতীয়পত্রের তথ্য যাচাইয়ের জন্য একটি সফটওয়্যার তৈরি করছে কমিশন। এই সফটওয়্যার নাগরিকেরা বিনামূল্যে ডাউনলোড করতে পারবেন। এটা নিয়ে অফলাইনে ভোটারদের তথ্য যাচাই করা যাবে। এর ফলে কেউ চাইলে যেকোনও নাগরিকের ঠিকানাসহ মৌলিক কিছু তথ্য জেনে নিতে পারবেন।
এবিষয়ে এনআইডি অণুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুজ্জামান মো. সালেহ উদ্দিন জানান, আমাদের বাসা-বাড়িতে গৃহকর্মী নিয়োগ, বাসার কেয়ারটেকার বা গাড়ির চালক নিয়োগ করতে গিয়ে আমরা নানা ধরনের জটিলতায় পড়ি। ওইসব ব্যক্তিরা নিয়োগ কর্তার কাছে প্রচলিত ব্যবস্থায় যে তথ্য সরবরাহ করে সেটা সঠিক কিনা তা যাচাই করা সম্ভব হয় না। এজন্য বাসা চুরি হওয়াসহ আমাদের নানা ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। কিন্তু স্মার্ট পরিচয়পত্র থাকলে কেউ মিথ্যা তথ্য দিতে পারবে না। এক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রটি সফটওয়্যার মাধ্যমে যাচাই করে নেওয়া যাবে।
/ইএইচএস/এমও/








