ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ঘোষণা অনুযায়ী, সরকারি ছুটির দিনে হকাররা ফুটপাতে বসে ব্যবসা করতে পারবেন। তবে কর্মদিবসে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা থেকে তারা বসতে পারবেন ফুটপাতে। আর এজন্য কাউকে টাকা দিতে হবে না।
তবে অভিযোগ পাওয়া গেছে, লাইনম্যানরা আগের মতোই হকারদের কাছ থেকে চাঁদা তুলছে। চাঁদা না দিলে কোনও হকারকে ফুটপাতে বসতে দেওয়া হচ্ছে না। এ অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের শীর্ষস্থানীয় এক নেতাও।
ডিএসসিসি (ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেছেন, ‘গুলিস্তান-মতিঝিল হকারমুক্ত করা হয়েছে। নগরবাসী এখন শান্তিতে চলাফেরা করতে পারছে। চাঁদাবাজদের ছাড় দেওয়া হবে না। তারা যেই হোক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’
কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। শনিবার সকাল থেকে গুলিস্তান ও আশপাশের এলাকায় অনেক হকার বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করেন। ফুটপাত ছাড়িয়ে কেউ কেউ প্রধান সড়কে চলে আসায় যান ও মানুষের চলাচল বিঘ্নিত হলেও ভ্রুক্ষেপ ছিল না কারও।
গুলিস্তানে বেল্ট বিক্রেতা আবুল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছুটির দিন হোক বা কর্মদিবস, ফুটপাতে বসতে এখনও জনপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। না দিলে ফুটপাতে বসতে দেওয়া হয় না। তখন বাধ্য হয়ে প্রধান সড়কে চলে আসতে হয় আমাদের।’
মেঘলা বাস কাউন্টারের সামনে এক বোতল বিক্রেতা বলেন, ‘ফুটপাত বা সড়ক যেখানেই বসি না কেন, চাঁদা দিতে হচ্ছে। চাঁদা না দিলে এক সেকেন্ডও কেউ হকারি করতে পারবে না। সড়কে বসা হকারদের দৈনিক ৫০-১০০ টাকা দিতে হয়।’
কারা চাঁদাবাজি করছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগে জাহাঙ্গীর নামের এক লাইনম্যান এসে চাঁদার টাকা নিয়ে যেতো। সিটি করপোরেশনের মামলার পর কখনও জাহাঙ্গীর নিজে, কখনও তার লোকজন এসে চাঁদা নিয়ে যায়।’ তবে শনিবার দুপুরে অনেক খুঁজেও জাহাঙ্গীরের দেখা পাওয়া যায়নি।
শুধু গুলিস্তানে নয়, মতিঝিল, দিলকুশা, পুরানা পল্টন, জিপিও, বায়তুল মোকাররম, দৈনিকবাংলা মোড়, গোলাপশাহ মাজার, ফুলবাড়িয়াতেও ফুটপাতে চাঁদাবাজি চলছে।
বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি এমএ কাশেম শনিবার এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখনও লাইনম্যানরা সক্রিয় রয়েছে। তারা প্রতিদিনই ছদ্মবেশে চাঁদা তুলছে। ছুটির দিনেও হকাররা রেহাই পাচ্ছে না চাঁদাবাজি থেকে। প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এতদিন যারা চাঁদাবাজি করতো, এখনও তারাই করছে।’
জানা গেছে, ফুটপাতে চাঁদাবাজির অভিযোগে ৭২ জনের নাম উল্লেখ করে গত ৯ ফেব্রুয়ারি মতিঝিল, পল্টন ও শাহবাগ থানায় তিনটি মামলা দায়ের করেছে ডিএসসিসি। তিনটি মামলারই বাদী ডিএসসিসির সম্পত্তি কর্মকর্তা মুহাম্মদ সামসুল আলম।
তিন মামলার এজাহারে প্রায় অভিন্ন ভাষায় চাঁদাবাজদের সম্পর্কে বলা হয়েছে- ‘আসামিরা রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে দোকান বসিয়ে সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত জনচলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে প্রত্যেক দোকানির কাছ থেকে প্রতিদিন ১০০ থেকে ৪০০ টাকা চাঁদা আদায় করে আসছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এসব চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে গিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিভিন্ন সময় তাদের দ্বারা লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন এবং বর্তমানেও উল্লেখিত চাঁদাবাজ চক্র করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নানাভাবে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে চলেছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের দায়ের করা মামলাগুলোর অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। এ বিষয়ে হকার নেতা এমএ কাশেম বলেন, ‘এজাহারভুক্তরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা চাঁদাবাজিও করছে আগের মতো।’
এ ব্যাপারে মতিঝিল থানার এসআই শফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারি কাজে বাধা ও চাঁদাবাজিসহ কয়েকটি ধারায় মামলা দায়ের করেছে সিটি করপোরেশন। মতিঝিল থানায় ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের হয়েছে। এই মামলার এজাহারভুক্ত চারজনকে গ্রেফতার করেছিলাম। তারা জামিনে আছেন। বাকি ১২ জন কোর্টে আত্মসমর্পণ করে জামিন নিয়েছেন। দ্রুত এ মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ নিয়ে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে।’
গুলিস্তান, মতিঝিল সহ আশপাশের এলাকার ফুটপাতগুলো এক সময় ছিল হকারদের দখলে। গত ১৫ জানুয়ারি থেকে কয়েক দিন ডিএসসিসি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে হকারদের উচ্ছেদ করে। এরপর হকারদের জন্য সময়সূচি বেঁধে দেয় ডিএসসিসি। সূচি অনুযায়ী, কর্মদিবসে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা থেকে এবং ছুটির দিনে সকাল থেকে হকাররা ফুটপাতে বসতে পারবেন।
ওএফ/এএআর/এপিএইচ/








