ন্যাড়া আর খোঁড়া পাহাড়ই ধসে পড়ছে

উদিসা ইসলাম
১৪ জুন ২০১৭, ১৬:৩৫আপডেট : ১৪ জুন ২০১৭, ২২:২৯

 

রাঙামাটিতে পাহাড় ধস অপরিকল্পিতভাবে পাহাড়ের মাটি, ঘাস-গাছ কেটে উজাড় করে ফেলার কারণেই  অতিবর্ষণে ধসে পড়ছে পাহাড়। মাটির পাহাড় ধসে যাচ্ছে মানুষের কারণেই।















বছরের পর বছর যে ঘাস-গাছ যত্নে মাটি ধরে রেখেছিল, সেসব গাছ উজাড় করে পাহাড় ন্যাড়া করে দেওয়া, আর অপরিকল্পিতভাবে মাটি কেটে রাস্তা ও বসতি বানানো পাহাড়গুলোই ধসে পড়ছে। পাহাড় ধসের কারণ নিয়ে গবেষণাকারী ও পার্বত্য এলাকার  আদি নিবাসীরা বলছেন, পাহাড়ের গায়ের ঘাস পাহাড়কে বাঁচিয়ে রাখে। সেসব ঘাস ছেটে ফেলে মানুষের বসবাসের উপযোগী করতে গিয়েই এধরনের ঘটনার সূচনা হয়েছে।  বৃষ্টিপাত হলেই পাহাড়ধস হতো না, যদি না মানবসৃষ্ট কারণগুলো প্রভাবক না হতো।
গবেষণায় বলা হচ্ছে, পাহাড়ের গাছপালা কেটে ফেলা, মাটি কেটে ফেলা, প্রাকৃতিক খাল বা ঝরনার গতি পরিবর্তন এবং পাহাড়ের ঢালুতে অতিরিক্ত ভার দেওয়া ধসের অন্যতম কারণ।
এর আগে পাহাড় ধসের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে ২০০৭ সালের ১১ জুন। সেদিনের টানা বর্ষণে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের হাটহাজারী, পাহাড়তলী, বায়েজীদ বোস্তামি, খুলশী এলাকায় পাহাড় ধসে ১২৭ জন নিহত এবং দুই শতাধিক মানুষ আহত হন। এরপর সরকার একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করে ধসের কারণ ও করণীয় নির্ধারণের নির্দেশ দেয়।
সেই ১১ সদস্যের কমিটির গবেষণার দায়িত্ব পাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পাহাড় ধসের কারণ প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট। বৃষ্টিপাত হলেই পাহাড় ধস হতো না, যদি না মানবসৃষ্ট কারণ তৈরি করা না হতো। পাহাড়ে যে ঘাস ও গাছ থাকে, সেগুলো কেটে ও আগুনে পুড়িয়ে ন্যাড়া করে দেওয়ার বারণে শুষ্ক মৌসুমে  ভেতরে ভেতরে  এতটাই ফাটল তৈরি হয় যে, ভারি বৃষ্টিপাত হলেই ফাটলের ভেতর পানি ঢুকে মাটির স্তর নড়ে যায় এবং পাহাড় ধসে পড়ে ।’
তিনি আরও বলেন, ‘ধস যখন জনপদে নামে তখন আমাদের চোখে পড়ে। কিন্তু গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছি, প্রচুর পাহাড় ধসে পড়ছে প্রতিবছর। পাহাড়গুলো যখন লিজ দেওয়া হয়, তখন সেটা থাকে বন আচ্ছাদিত। কিন্তু লিজ নেন যিনি তিনি তার বাণিজ্যিক লক্ষ্য পূরণে প্রথমেই সেই বন উজাড় করেন। আর জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে পাহাড় কেটে কেটে বসতি স্থাপন করা হয় অপরিকল্পিতভাবে।’ এর ওপরে ন্যাড়া আর নিচে খোঁড়া পাহাড়গুলোই ধসে পড়ছে উল্লেখ করে পাহাড়ে বসবাসকারীরা বলছেন, বিগত কয়েক যুগ ধরে পাহাড় কাটার পাশাপাশি প্রকৃতির যত্ন-আদরে পাহাড়ের গায়ে বেড়ে ওঠা নানা প্রজাতির বৃক্ষরাজিকে নির্বিচারে ধ্বংস করা হয়েছে। পাহাড় কেটে সমতল ভূমি তৈরি করে সেখানে মুনাফালোভী সিন্ডিকেট, তাদের ফায়দা হাসিলের চেষ্টায় ব্যস্ত।
খাগড়াছড়ির আইনজীবী সমারি চাকমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছোটবেলায় বনজ বৃক্ষ ঘেরা পাহাড় দেখেছি। এখন সব কৃত্রিম বাগান। বড় প্রাকৃতিক বাগান নেই। পাহাড়ে যেসব গাছ লাগানো হয়েছে, তা মাটি ধরে রাখার উপযোগী নয়। আর যেখানে সেখানে পাহাড় কেটে রাস্তা বানানো,বসতি স্থাপনের নজির গত বিশ-পঁচিশ বছরে ঘটেছে ব্যাপকহারে। ওপরে ন্যাড়া আর নিচে কেটে খোঁড়া বানানো পাহাড়গুলোই ভারি বর্ষণে ধসে পড়ছে। আগে দেখেছি, বসতি স্থাপনের উপযোগী কিনা তা দেখেশুনে  জায়গা নির্ধারণ করতেন পাহিড়িরা। এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বসতি স্থাপনের নজির এখন দেখা যায় না।’
জিও সায়েন্স অস্ট্রেলিয়ার এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পাহাড় ধসের পেছনে প্রাকৃতিক কারণ এবং মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। প্রাকৃতিক কারণ হলো, পাহাড়ের ঢালের যদি কোনও অংশে বেশি গর্ত থাকে, তখন অতিবৃষ্টিতে ভূমি ধস হতে পারে। এ ছাড়া ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং পাহাড়ের পাদদেশের নদী ও সাগরের ঢেউ থেকেও ধস হতে পারে। আর মনুষ্য সৃষ্ট কারণ হিসেবে গবেষণায় বলা হয়েছে, পাহাড়ের গাছ পালা কেটে ফেলা, মাটি কেটে ফেলা, প্রাকৃতিক খাল বা ঝরনার গতি পরিবর্তন ও পাহাড়ের ঢালুতে অতিরিক্ত ভার দেওয়া।
কক্সবাজার ও বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকায় বেড়ে ওঠা ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পাহাড়ে সেটেলমেন্ট দেওয়া এবং কারা এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে মূল ভূমিকা রেখেছে, কেন ঢাকা, ভোলা, বরিশালের মতো দূরের লোকেরাও পাহাড় লিজ পান, রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশাজীবীরা কিভাবে পাহাড়ে ভূমির মালিক হন- এসব প্রশ্ন বারবার করেও কোনও উত্তর পাওয়া যায় না। বাইরে থেকে এসে লিজ নিয়ে প্রথমেই পাহাড় উজাড় করে। আপাতত উন্নয়ন বন্ধ রেখে ‘জীবন সংরক্ষণ’ পদ্ধতি অনুসরণ করতে সরকারকে আগ্রহী করে তুলতে হবে। মনে রাখা দরকার নদী, পাহাড়, বন ধ্বংস করে বাঁচা যায় না। প্রকৃতি মানুষের সঙ্গে তাল মেলাবে না, মানুষকেই প্রকৃতির সঙ্গে অভ্যস্ত হতে হবে।’
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পাহাড় ধসে গত ১০ বছরে ৬ সেনা সদস্যসহ ৩ শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। ২০১১-২০১৩ সালে পাহাড় ধসে মৃত্যু হয়েছে ১৯ জন, ২০১৫ সালে কক্সবাজার শহরের রাডারের পাহাড় ধসে মা-মেয়েসহ ৫ জন এবং সর্বশেষ ২০১৬ সালে পাহাড় ধসে মারা যায় ১৭ জন মারা যায়।
দেশে এখনও পর্যন্ত ভয়াবহ পাহাড় ধসগুলো ঘটেছে ২০০০ সালের পরে।  ২০০৮ সালে বান্দরবান শহরের বালুচরা এলাকায় পাহাড় ধসে ১৩০ জনের প্রাণহানি ঘটে। পাহাড় ধসের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে ২০০৭ সালের ১১ জুন। সেদিনের টানা বর্ষণে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের হাটহাজারী, পাহাড়তলি, বায়েজীদ বোস্তামি, খুলশী এলাকায় পাহাড় ধসে ১২৭ জন নিহত এবং দুই শতাধিক মানুষ আহত হন।  ২০০৯ সালের ৬ মে বান্দরবানের গ্যালেঙ্গা এলাকায় প্রায় ৭০০ ফুট উঁচু পাহাড় ধসে সাঙ্গু নদীতে পড়ে যায়। এ দুর্ঘটনায় কোনও প্রাণহানি না ঘটলেও ২৫ ফুট প্রশস্ত সাঙ্গু নদীর অন্তত ১০ ফুটজুড়ে উঁচু বাঁধের সৃষ্টি হয় এবং নৌযান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৯ সালের ১৮ মে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের কালিঘাটি উপজেলার চা-বাগানসংলগ্ন পাহাড় বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ার তোড়ে ধসে পড়ে। ফলে একই পরিবারের ৫ জনসহ মোট ৬ জন ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন।
/ইউআই/ এপিএইচ/

আরও পড়ুন: কক্সবাজারে পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে ৩ লাখ মানুষ

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম