‘নথি পর্যালোচনা করে দেখলাম, বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রে অনেক রাঘব-বোয়াল জড়িত ছিল’

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১৩:২৩, আগস্ট ১৫, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২২, আগস্ট ১৫, ২০১৭

 

রক্তদান কর্মসূচিতে প্রধান বিচারপতি

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, আমি নথি পর্যালোচনা করে দেখলাম, এই ষড়যন্ত্রের মধ্যে অনেক রাঘব বোয়ালসহ আরও অনেকে জড়িত ছিল।  কিন্তু ইনভেস্টিগেশনের ত্রুটির জন্য আমরা তাদের আর বিচারে সোপর্দ করতে পারি নাই। যদিও আমাদের রায়ে আমরা পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছি, এটা একটা ক্রিমিনাল কন্সপেরেসি, পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল এবং তাদেরকে বিচারের সোপর্দ করার জন্য।’ 

মঙ্গলবার (১৫ আগস্ট) সুপ্রিম কোর্ট মিলনায়তনে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে সুপ্রিম কোর্ট আয়োজিত স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচিতে এসব কথা বলেন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন,‘‘আজকে আমাদের ইতিহাসের একটি মর্মান্তিক দিন। বাংলার মানুষ স্বাধীনতার স্থপতিকে শুধু হারায়নি,  তারা ভবিষ্যত সবাইকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছিল।এই উপমহাদেশের দুজন জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়েছে।  একজন হলেন মহাত্মা গান্ধী, আরেকজন হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু এই দুই মহান নেতার মৃত্যুর কারণ কিন্তু দুটো।  মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করা হয়েছিল, তিনি পাকিস্তান এবং ভারতের মধ্যে যে রায়ট লেগেছিল এবং পশ্চমবঙ্গ, পাঞ্জাবে রক্তের বন্যা বয়েছিল,  উনি সরকারকে (নেহেরু- প্রধানন্ত্রী) বলেছিলেন রায়ট বন্ধ করতে।  সর্দার বল্লভের ভাই প্যাটেল ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। উনিও অনেক চেষ্টা করেছিলেন। রায়টের সময় পশ্চিমবঙ্গে শুধু ১০ লাখ লোক মারা যায়। এর মধ্যে দুই লাখের ওপরে মুসলমান মারা যায়। এরপর মহাত্মা গান্ধী আমরণ অনশনে বসলেন এবং বললেন, ‘এই রায়ট যদি বন্ধ না করা হয় আমি অনশন বন্ধ করবো না।’ ভারত সরকার তখন সজাগ হলো, রায়টটা বন্ধ হয় গেল। হিন্দু উগ্রবাদী মাথুরাম গডসে সহ্য করতে না পেরে গান্ধীকে হত্যা করলো।  এটা সম্পূর্ণভাবে সাম্প্রদায়িকতা, অন্ধ বিশ্বাস।’’

প্রধান বিচারপতি আরও বলেন,‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড হলো কাপুরুষোচিত। বঙ্গবন্ধু হয়তো কারও শত্রু বা কারও বিরাগভাজন হতে পারেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর চার বছরের ছেলে রাসেল, বঙ্গবন্ধুর দুই ছেলে সদ্য বিবাহিত ছিল। এদের সম্পূর্ণ পরিবারকে ধ্বংস করা হয়। শেখ রাসেল কিন্তু কোনও পলিটিক্সে ছিলেন না। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুর সমস্ত পরিবারকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা।এটার সঙ্গে পৃথিবীর কোনও হত্যার মিল পাওয়া যায় না। আমরা স্তম্ভিত হয়ে যাই যেরকমভাবে তারা হত্যা করেছিল। আরও কষ্টদায়ক হলো, বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে হত্যাকারীদের রাষ্ট্রের আইন দিয়ে বিচারের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আমি এই বিচার বিভাগের একজন সদস্য হিসেবে অত্যন্ত গর্ববোধ করছি, এই সুপ্রিম কোর্টই ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স বাতিল করে এই বিচারের রায় প্রশস্ত করেছিল।’

সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারে তার সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করে বলেন,‘এই মামলায় একটি গভীর ষড়যন্ত্র ছিল।  আমি আপিল বিভাগের যখন কনিষ্ঠ বিচারক, প্রকৃতপক্ষে আমি তখন অসুস্থ ছিলাম।  সিঙ্গাপুরে তখন ক্যানসারের ট্রিটমেন্ট চলছিল। ট্রিটমেন্টে থাকাকালে মামলাটির বিচারের জন্য বেঞ্চ গঠন করা নিয়ে সমস্যা হয়েছিল, তখন আমাকে অনুরোধ করা হয় যে, তাড়াতাড়ি চলে আসেন।  তখনও আমি জানি না, আমি বাঁচতে পারবো কিনা। যাই হোক, ট্রিটমেন্ট বাদ দিয়ে আমি চলে আসলাম। শপথ নিয়ে তারপর সিঙ্গাপুরে গিয়ে ট্রিটমেন্ট নিলাম।’

রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন নিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আজকে (মঙ্গলবার) আমি আর বক্তব্য দেবো না। আজকে আমাদের জাতির জন্য একটি দুঃখময় দিন। আমি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর থেকেই পরপর দুই বছর প্রথম আমরা রক্তদান কর্মসূচি পালন করেছি।  যাতে ওনার যে রক্ত ঝরেছিল, এই রক্ত যাতে আমাদের বিচারক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, যারা রক্তের অভাবে ট্রিটমেন্ট পাচ্ছে না, এটাকে যাতে পরিশোধ করা যায়।’

রক্তদান কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য দেন আপিল বিভাগের অন্যতম জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু জাতির জনককে নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নাই।  যখন ৭০ সালে নির্বাচন হয় তখন আমি বিএ ক্লাসের ছাত্র। তখন ইস্ট পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কোনও নেতা ছিল না এবং কল্পনাও করে নাই। সবাই এক নেতা। উনি ছিলেন বলেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। সেখানে আমি আজকে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি হতে পেরেছি। পাকিস্তান থাকলেও হাইকোর্টের হয়তো হওয়া যেত, কিন্তু পাকিস্তানে বিচারপতি হওয়া কল্পনার বাইরে ছিল। কাজেই বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করি, এই জন্যে স্মরণ করি যে, আমরা একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক এবং সেইসঙ্গে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারপতির আসনে আসীন আছি।’

/এমটি/ এপিএইচ/

লাইভ

টপ