‘আমার ছেলের সঙ্গে মামলাটাও গুম করা হয়েছে’

Send
হাসনাত নাঈম
প্রকাশিত : ১৯:৩২, আগস্ট ৩০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৪৫, আগস্ট ৩০, ২০১৯

ছেলের ছবি হাতে শেখ আব্দুর রাশেদ২০১৬ সালে সাতক্ষীরা সদর থানা থেকে নিখোঁজ হয়েছেন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক শেখ মোখলেছুর রহমান জনি। তার বাবা শেখ আব্দুর রাশেদ বলেন, ‘হাইকোর্টে আমি কেস করেছিলাম। হাইকোর্ট তদন্ত করে তিন জনকে আসামি করেছেন। ওই তিন জনই আমার ছেলের গ্রেফতার ও গুমের ব্যাপারে জড়িত। কিন্তু আমার কেসটা স্টপ করা হয়েছে। কেসের নথি ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। যে উকিলের কাছে আমার কেস ছিল, সেও আমার কাগজগুলো এখন পর্যন্ত ফেরত দেয়নি। আমার ছেলেকে গুম করা হয়েছে, সঙ্গে মামলাটাকেও গুম করা হয়েছে।’

শুধু  জনির বাবা নন, গুমের কাহিনি শোনাতে এবং তাদের ফিরে পেতে প্রেস ক্লাবে হাজির হয়েছিলেন নিখোঁজ হওয়া পরিবারের সদস্যরা। শুক্রবার (৩০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর আলোচনা সভায় একত্রিত হয়েছিলেন তারা। প্রায় সবার হাতেই নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনের ছবি। কারও হাতে বাবার, কারও হাতে সন্তানের, আবার কারও হাতে স্বামীর ছবি। চোখে জল সবারই। কাঁদতে কাঁদতে তারা শোনালেন প্রিয়জনদের নিখোঁজ হওয়ার কাহিনি।

ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে আব্দুর রাশেদ বলেন, ‘আমার ছেলে একজন ডাক্তার। তার অপরাধ, সে দুঃখী মানুষের সেবা করে বেড়াতো। আমার ছেলেকে ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট রাতে গ্রেফতার করে। আমার বাড়ি তল্লাশি করে। পরদিন সকালে তাকে সাতক্ষীরা থানায় গিয়ে পাই। থানায় থাকা অবস্থায় এসআই হিমেল আমাকে তিন দিন একই কথা বলেছেন। আপনার ছেলে অপরাধী। তার তথ্য নেওয়া হচ্ছে। আপনার ছেলে যদি অপরাধী হয়, তাহলে আইনের আওতায় নেবো, আর নির্দোষ হলে ছেড়ে দেবো। তারপরে একদিন আমাকে ডেকে থানায় অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। আর বললো, তোর ছেলেকে যেটা বলতে বলেছি, সেটা তাকে স্বীকার করতে বল। আমি আমার ছেলেকে বলি−তুমি যেটা জানো, তোমার মধ্যে সত্যি যেটা আছে, সে সত্যি কথা বলবা। এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে গালিগালাজ করে বলে এই কথা বলতে নিয়ে আসলাম। আমাকে পিস্তল দেখিয়ে থানা থেকে বের করে দেওয়া হলো। চতুর্থ দিন গিয়ে দেখলাম আমার ছেলে সেখানে নাই। পুলিশ বললো ওপরের মহল তাকে নিয়ে গিয়েছে। আমার ছেলে কোনও দল করত না। আমার ছেলের একটাই অপরাধ—সে দুঃখী মানুষের সেবা করতো।’

স্বজনদের ছবি হাতে শিশুরাপ্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের গুমের পেছনে কাদের ইন্ধন আছে, তাদেরকে খুঁজে বের করা হোক। আমার ছেলেকে ফেরত দেওয়া হোক। আমার ছেলে জঙ্গি না, আমার ছেলে সন্ত্রাসী না।’

২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর রাতে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে ঢাকা মহানগরের ৩৮ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমন নিখোঁজ হন। তার বড় মেয়ে হাফসা ইসলাম রাইতা বাবাকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে বলে, ‘আমি এখন ক্লাস নাইনে পড়ি। আমার বাবা যখন নিখোঁজ হয়, তখন আমি ক্লাস ফোরে পড়ি। ছয় বছর হয়ে যাচ্ছে, আমার বাবার কোনও খোঁজ নাই। আমার বাবাকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। ৬ বছর বাবার ছবি হাতে নিয়ে বসে আছি। আমার আর ভালো লাগছে না।’

রাইতা আরও বলে, ‘এভাবে বাবার ছবি নিয়ে আর বসে থাকতে চাই না। ছয়টি বছর এই কষ্ট নিয়ে বয়ে বেড়াচ্ছি। বাবা কোথায় আছে জানি না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করছি, আমার বাবাকে ফিরিয়ে দিন।’

২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল বনানী থেকে নিখোঁজ হন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলী। তার ছেলে আবরার ইলিয়াস বলেন, ‘আমার বাবা ইলিয়াস আলীকে ২০১২ সালের এপ্রিলে গুম করা হয়। সরকার ও সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই আমার বাবাকে গুম করেছে। সাড়ে ৭ বছর হয়ে গিয়েছে, আমরা বাবার কোনও রকম খোঁজ-খবর পাইনি। তৎকালীন স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের বাসায় এসে বলে গিয়েছিলেন, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আমার বাবাকে ফেরত দেবেন। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়েছি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে গিয়েছি। কিন্তু কোথাও খোঁজ পাইনি। বর্তমানে তারা আমাদের এভোয়েড করে।’

স্বজনদের ছবি হাতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরাপ্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ঈদের দিন বলেন, আর খুশির দিন বলেন, এই দিনগুলো আমাদের দুঃখের দিন হয়ে দাঁড়ায়। আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই, আপনি কোনও  উত্তর দেন, গুম হওয়া মানুষদের বিষয়ে কথা বলুন।’

২০১২ সালের ৪ ফেরুয়ারি কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-ফিকাহ্ বিভাগের এলএলবি চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আল মুকাদ্দাসকে ঢাকার সাভার নবীনগরে র‌্যাব-৪ এর চেকপোস্টের সামনে থেকে হানিফ পরিবহনের একটি বাস থেকে র‌্যাব পরিচয়ে নামিয়ে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তার কোনও খোঁজ মেলেনি।

কাঁদতে কাঁদতে মুকাদ্দাসের বাবা আব্দুল হালিম বলেন, ‘পুলিশ, র‌্যাব, ডিবিসহ বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি। আমার কলিজার টুকরার বিরুদ্ধে যদি কোনও অভিযোগ থাকে তবে আমার সামনে আনেন, বিচার করেন। আমার কোনও আপত্তি থাকবে না। কিন্তু, তারা আমার ছেলেকে সামনে আনতে পারেনি। কান্নার মতো আমার শারীরিক অবস্থা নেই। তারপরও এই ৮ বছরে এমন কোনও রাত নেই যেদিন চোখের পানি না ফেলে ঘুমাতে গেছি। আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দেওয়া হোক।’

 

/এইচএন/এসটি/এমএমজে/

লাইভ

টপ
X